kalerkantho


চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধার সম্ভব

অভিজ্ঞ দুই আইনজীবী নিয়োগ দিচ্ছে সরকার

আবুল কাশেম ও শেখ শাফায়াত হোসেন   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধার সম্ভব

ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কের স্টপ পেমেন্ট অর্ডার না মেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে সহায়তা করা হয়েছে এবং এ কারণে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে রিজাল ব্যাংকের বিরুদ্ধে স্টপ পেমেন্ট অর্ডার অগ্রাহ্য করার অকাট্য তথ্য-প্রমাণ থাকতে হবে, আর তা আছেও।

কাজেই ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকের কাছ থেকে বাংলাদেশের খোয়া যাওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর পরিমাণ পাঁচ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আর স্টপ পেমেন্ট আদেশের আগেই আরো যে দুই কোটি ৩০ লাখ ডলার তুলে নিয়েছে হ্যাকাররা, সেটাও জাতিসংঘের ‘দ্য স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় মামলা করে জয়ী হয়ে উদ্ধার করা সম্ভব বলেও বিশেষজ্ঞরা আশা করেন।

লোপাট হওয়া রিজার্ভ ফিরিয়ে আনতে সরকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দুজন আইন বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ইতিমধ্যে ওই দুই আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। আইনজীবী দুজনও এতে সম্মতি দিয়েছেন। দু-এক দিনের মধ্যেই তাঁরা কাজ শুরু করবেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

গরিবদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখায় বছর দেড়েক আগে ‘গুসি’ শান্তি পুরস্কার দেওয়া ফিলিপাইনের ব্যাংকারদের কারসাজির কারণেই রিজার্ভের অর্থ খোয়াতে হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে গভর্নর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে ড. আতিউর রহমানকে।

২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর ম্যানিলায় গিয়ে ওই পুরস্কার নিয়েছিলেন আতিউর রহমান, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাইজেশন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি। সেই ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট, তাঁর বন্ধু, জুপিটার স্ট্রিট শাখার ম্যানেজার আর একদল হ্যাকারের কারসাজিতেই আট কোটি ১০ লাখ ডলার রিজার্ভ খোয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

রিজার্ভ চুরির এ ঘটনায় বাংলাদেশে যতটা তোলপাড় হয়েছে, ফিলিপাইনেও তার চেয়ে কম হয়নি। ইতিমধ্যেই রিজাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো তান ও জুপিটার স্ট্রিট শাখার ম্যানেজার মায়া সান্তোস দেগুইতো স্বীকার করেছেন, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি স্টপ পেমেন্ট অর্ডার পাওয়ার পরও তাঁরা তা অগ্রাহ্য করে উল্টো অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নিতে সহায়তা করেন। এটি প্রমাণিত হলে বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির এ ঘটনায় এ দুই কর্মকর্তার সঙ্গে অভিযুক্ত হবে রিজাল ব্যাংকও। এ বিষয়ে অকাট্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে অন্তত ৮ ফেব্রুয়ারি স্টপ অর্ডার পাওয়ার পর পর্যন্ত রিজাল ব্যাংকে যে পাঁচ কোটি ৮০ লাখ ডলার জমা ছিল, সে পরিমাণ অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে অভিযুক্ত ব্যাংকটি। বাকি দুই কোটি ৩০ লাখ ডলার ৯ ফেব্রুয়ারির আগেই তুলে নিয়ে অন্যত্র সরিয়েছে হ্যাকাররা। ওই অর্থ কোথায় গেছে, তা-ও জাতিসংঘের ‘দ্য স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় মামলা করে জয়ী হতে হবে। তবে এটি বেশ কঠিন ও লম্বা প্রক্রিয়া বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, রিজার্ভের চুরি হওয়া অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে থাকলে তা ফেরত পাওয়া ছিল সবচেয়ে সহজ। তবে এটা যদি প্রমাণ করা যায় যে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের স্টপ অর্ডার পাওয়ার পরও রিজাল ব্যাংক তা অনুসরণ না করে গ্রাহকদের টাকা সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে, সে ক্ষেত্রে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ও ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক আলোচনার ভিত্তিতে রিজাল ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অকাট্যভাবে রিজাল ব্যাংকের অবহেলা অথবা রিজার্ভ চুরির সঙ্গে ব্যাংকটির সম্পৃক্ততা প্রমাণ করতে হবে।

বিশিষ্ট ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, স্টপ পেমেন্টের বিষয়ে সুইফট কোডসহ ব্যাংকিং কিছু প্রটোকল বা নিয়ম-নীতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় দিয়ে ফোন, ই-মেইল বা এসএমএসের মাধ্যমে জানাতে হয়। সঠিক ফরম্যাটে স্টপ পেমেন্ট অর্ডার গিয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তা পালন করতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক স্টপ পেমেন্ট অর্ডার উপেক্ষা করেছে, এটি প্রমাণিত হলে তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব রিজাল ব্যাংকের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি তথা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

মামুন রশীদ বলেন, লোপাট হওয়া অর্থ উদ্ধারে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কের সহায়তাও বাংলাদেশ ব্যাংক নিতে পারে। নিউ ইয়র্কের ব্যাংকটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে তার আওতায় সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। এরই মধ্যে ব্যাংকটি অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশকে সহায়তা করার আগ্রহ দেখিয়েছে।

মামুন রশীদ বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে চলে যাওয়া অর্থ উদ্ধার করা বেশ কঠিন। এ ক্ষেত্রে ইউনাইটেড নেশনস স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি প্রটোকলের আওতায় আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে ফিলিপাইন থেকে অর্থ হংকং বা অন্য দেশে চলে গেছে, সেই দেশের আদালতে মামলা করতে হবে। সেই মামলায় জয়ী হলে তখন অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে।

ব্যবসাসংক্রান্ত উপদেশ ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ফিনএক্সেলের চেয়ারম্যান ও অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি লিগ্যাল অ্যাডভাইজার নই। কিন্তু ব্যাংকিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকায় আইনগত প্রক্রিয়াটা জানি। এখানে বিভিন্ন পক্ষ আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক আছে, ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আছে, রিজাল ব্যাংক আছে। অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়াটি নির্ভর করবে তদন্তের ফলোআপের ওপর। আমরা জানি, কোন ব্যাংকে টাকাটা গেছে; সেখান থেকে কোন কোন অ্যাকাউন্টে টাকাটা ট্রান্সফার হয়েছে। ’

বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ‘ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে যদি স্টপ অর্ডার দিয়ে থাকে আর রিজাল ব্যাংক সেই অর্ডার অগ্রাহ্য করে টাকা ট্রান্সফার করে, তাহলে সেটা তাদের কাছে জানতে চাইতে হবে। এ ক্ষেত্রে রিজাল ব্যাংকের যদি ত্রুটি থাকে, তবে টাকা উদ্ধারের আশা আমি ছেড়ে দেব না। তবে এটা নির্ভর করবে ফলোআপের ওপর, তদন্তের ফলাফলের ওপর। ’

গতকাল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, নতুন গভর্নর যোগদান করার পরই অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আগামী ১৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার পর নতুন গভর্নর ড. ফজলে কবির যোগ দেবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সঙ্গে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করা আছে। ওই স্মারক অনুযায়ী এক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০০৮ সালে এই সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর থেকে এই এমওইউর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ফিলিপাইনের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে এবং তথ্য আদান-প্রদান চলছে।

রিজার্ভ চুরি হওয়ায় বাংলাদেশ যতটা বেকায়দা ও অস্বস্তিতে, প্রায় একই রকম অস্বস্তিতে পড়েছে ফিলিপাইনও। কারণ, জাতিসংঘের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ‘এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ (এপিজি) অন মানি লন্ডারিং’-এর সদস্য ফিলিপাইন আগে থেকেই অর্থপাচার বিবেচনায় ধূসর (গ্রে) তালিকায় রয়েছে। এপিজির সদস্যদের তাদের আইনি সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়ে অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে চুরি হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারলে দেশটি ধূসর তালিকা থেকে আরো নিচের ধাপে বা কালো তালিকাভুক্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক লেনদেনে বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে ফিলিপাইন। সে কারণে দেশটির সিনেট গ্লুরিবন কমিটি গুরুত্ব সহকারে রিজাল ব্যাংকের অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তাকে নিয়ে শুনানির আয়োজন করেছে। আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। ফিলিপাইন সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি স্পষ্টই ঘোষণা দিচ্ছেন, রিজার্ভ চুরির এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করবেন তাঁরা। ফিলিপাইন যে অর্থ পাচারকারীদের স্বর্গক্ষেত্র নয়, তা প্রমাণ করতেই এ কাজটি করা হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির দায়িত্বশীলরা।

সিনেট গ্লুরিবন কমিটির প্রধান সিনেটর তেওফেস্তো গুইংগুনা জানান, ৫ ফেব্রুয়ারি সন্দেহজনক অর্থ আসার পর ৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টার সময় নিউ ইয়র্ক ফেডারেল ব্যাংক থেকে স্টপ পেমেন্ট আদেশ আসে। তখন চুরি হওয়া রিজার্ভের পাঁচ কোটি ৮০ লাখ ডলার রিজাল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখায় চার ব্যক্তির অ্যাকাউন্টেই জমা ছিল। সেদিন ছিল চীনা নববর্ষ উপলক্ষে ফিলিপাইনের ব্যাংকে ছুটির দিন। পরদিন ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে রিজাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও শাখা ম্যানেজার ওই আদেশ দেখেও অর্থ জব্দ না করে তুলে নিতে সহায়তা করেন। গত মঙ্গলবার ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত শুনানিতে সিনেটর আরসিবিসি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো তানকে জিজ্ঞেস করেন, ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে ব্যাংক খোলা ছিল; স্টপ পেমেন্ট আদেশটি আপনার দেখার কথা। সেটি গ্রাহ্য করা হয়নি বলেই সব টাকা তুলে নিতে পেরেছে প্রতারকরা। তিনি আরো জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকও আরসিবিসিকে অর্থ আটকানোর একই ধরনের অনুরোধ করেছিল। অথচ আরসিবিসি কর্তৃপক্ষ ওই অনুরোধের জবাব দেয় ৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ৮টায়। ততক্ষণে দিনের কার্য শেষ এবং বাংলাদেশের চুরি হওয়া রিজার্ভ ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়ে গেছে। একই প্রশ্ন করা হয় ম্যানেজার মায়া দেগুইতোকেও। তাঁরা দুজনেই ব্যাংকের গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে জবাব এড়িয়ে যান।

 


মন্তব্য