kalerkantho


সামনে পাকিস্তান সঙ্গে আত্মবিশ্বাস

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সামনে পাকিস্তান সঙ্গে আত্মবিশ্বাস

কত কিছু হয়ে যায় এই ২৬ বছরে! ভেঙে টুকরো টুকরো হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। মধ্যপ্রাচ্যে বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। ফুটবলবিশ্ব শাসনের জন্য আবির্ভাব হয় লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো নামের আশ্চর্য দুই প্রতিভার। ক্রিকেটের জনপ্রিয়তাও ওয়ানডের রঙিন দুনিয়া পেরিয়ে প্রবেশ করে টি-টোয়েন্টির রাঙানো ভুবনে। কিন্তু ১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর আর কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে খেলার সুযোগ পায় না বাংলাদেশ।

২৬ বছর পর আজ আবার ক্রিকেটের সেই নন্দনকাননের ক্যানভাসে পড়ছে লাল-সবুজের আঁক। হৃদয়ের রং পোশাকে ধারণ করে মাঠে নামবে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। আর সেটিও কোন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে? পাকিস্তান। আর সেটিও কোন মাসে?

মার্চ। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের মতো পাকিস্তানের বিপক্ষে আরেকবার গর্জে ওঠার অপেক্ষায় এখন বাংলাদেশের ক্রিকেট-মারণাস্ত্র। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অভিযানের মূল পর্ব জয় দিয়ে শুরু করার জন্য মরিয়া মাশরাফি-ব্রিগেড।

গত ২৬ বছরে পৃথিবী যেমন বদলেছে অনেকটা, তেমনি ওই রূপান্তর ইডেন গার্ডেনসেরও। এখন আর ম্যাচের দিন লাখখানেক দর্শকের গর্জনে কাঁপে না কলকাতার আকাশ-বাতাস। আধুনিকায়নের ছোঁয়ায় সেটি রূপান্তরিত হাজার ষাট দর্শক ধারণক্ষমতায়। তাতে ক্রিকেট-রোমান্টিকদের দীর্ঘশ্বাস না পড়ে পারে না। কিন্তু আরেকবার ইডেনে খেলার সুযোগ পেয়ে বাংলাদেশের অত কিছু ভাবার সুযোগ কোথায়! বরং উপলক্ষটা স্মরণীয় করে রাখার চেষ্টাতেই এখন সমস্ত মনোযোগ মাশরাফির দলের।

‘আসলে এখানে এত দিন না খেলা দুর্ভাগ্যজনক কিংবা সৌভাগ্যের কথা কিছু বলব না। আমি মনে করি আমরা ইডেন গার্ডেনসে খেলার ভালো একটি সুযোগ পেয়েছি। আমাদের খেলোয়াড়রা সবাই রোমাঞ্চিত। এখানে প্রায় ৯০ হাজার দর্শক থাকে। কালকের ম্যাচে হয়তো ততটা হবে না। এটা বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি ভেন্যু। আমরা চাই ভালো খেলতে ও স্মরণীয় করে রাখতে’—কালকের ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে এক নিঃশ্বাসে বলে যান বাংলাদেশ অধিনায়ক। এই ভেন্যুর মতো ঐতিহ্যের ছাপ না থাকলেও বিশ্বসেরা স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে মাশরাফি তো বলেন ঢাকার শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের নামও, ‘বিশ্বের বড় বড় স্টেডিয়ামগুলোয় খেলার আলাদা গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে। লর্ডস, মেলবোর্নের মতো মাঠে বাংলাদেশ খেলেছে। সঙ্গে আমাদের শেরে বাংলা স্টেডিয়াম তো আছেই। আর এবার খেলছে ইডেন গার্ডেনসে। এটি আমরা স্মরণীয় করে রাখতে চাই। ’

লর্ডস-মেলবোর্ন-ইডেনের সঙ্গে বাংলাদেশ অধিনায়কের উচ্চারণে এভাবেই ব্র্যাকটেবন্দি ‘হোম অব ক্রিকেট’-এর নাম। বদলে যাওয়া বাংলাদেশের আরেক প্রস্থ প্রমাণ হয়ে থাকে তা। যেমন প্রমাণ পাকিস্তানের সংবাদ সম্মেলনে তাদের কোচ ওয়াকার ইউনিসের দিকে ধেয়ে যাওয়া প্রশ্নে। দুই দলের সাম্প্রতিক ফলের কারণে এই ম্যাচে সম্ভাবনার পাল্লা ফিফটি-ফিফটি কি না, এমন রুক্ষ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। কী আশ্চর্য, খেলোয়াড়ি জীবনে বিষমাখানো বাউন্সারের জন্য বিখ্যাত ওয়াকারকে এমন প্রশ্নেও তাতানো যায় না, ‘দেখুন, প্রতিটি দলেরই তো উন্নতি করার অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশের এই উন্নতি ওদের এবং বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য ভালো ব্যাপার। গত ১৮ থেকে ২৪ মাস ধরে ওরা সত্যি খুব ভালো খেলছে। আমরা সেটি বিশ্বকাপে দেখেছি, আমাদের, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের বিপক্ষে সিরিজেও দেখেছি। বাংলাদেশকে তাই আমাদের সমীহ করতে হবে। ’

তা সমীহ না করে উপায় কী পাকিস্তানের! বাংলাদেশের কাছে ১৬ বছর অজেয় ছিল তারা। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের পর থেকে অত দীর্ঘসময় তাদের কাছে হারেনি। পরের গল্পেই অবাক বাঁকবদল। গত বছর ওয়ানডে সিরিজে পাকিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে হারায় বাংলাদেশ। টি-টোয়েন্টি সিরিজের একমাত্র ম্যাচেও অভিন্ন পরিণতি। এরপর এই তো কিছুদিন আগে এশিয়া কাপে আবারও মাশরাফির দলের সামনে নতজানু পাকিস্তান। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচের ফল ধরলে তাই ৫-০ ব্যবধানে এগিয়ে বাংলাদেশ। পাকিস্তান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো দল গ্রুপে থাকার পরও বাংলাদেশের সেমিফাইনাল খেলার সম্ভাবনা তাই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

হোক না। তবু পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বৈরথের আগে নিজেদের গায়ে ফেভারিটের তকমা সেঁটে দিচ্ছেন না মাশরাফি, ‘আমি মনে করি আমাদের চেয়ে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। তবে শেষ এক কিংবা দুই মাস আমরা অনেক অনুশীলন করেছি, এশিয়া কাপ খেলেছি। সেখানে ভালো খেলেছি। আমি মনে করি আমাদের পরিকল্পনা বেশ ভালো। বেশ কয়েকজন তরুণ ক্রিকেটার আছে। তবে ইতিহাস বলছে পাকিস্তান ফেভারিট। ’ কিন্তু সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচে বাংলাদেশও যে ইতিহাস লিখছে নতুন করে! সপ্তাহ দুয়েক আগে এশিয়া কাপেও তো পাকিস্তানকে হারায় তারা। এবার ভিন্ন কন্ডিশনে খেলা হলেও মাশরাফির দলকে নিয়ে ভীষণ সতর্ক পাকিস্তান কোচ ওয়াকার, ‘এখানকার কন্ডিশন অবশ্যই বাংলাদেশের চেয়ে আলাদা। তবে ভালো ক্রিকেট খেললে কন্ডিশনে খুব একটা কিছু যায়-আসে না। বাংলাদেশ খুব ভালো ক্রিকেট খেলছে। আমাদের তাই সতর্ক থাকতে হবে। ওদের হারাতে হলে আমাদের খুব ভালো খেলতে হবে। ’

শুধু পাকিস্তানের বিপক্ষে না, বছর দেড়েক ধরেই বাংলাদেশ ক্রিকেটে গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। সর্বশেষ এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলে আসার পর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব পেরিয়েছে তারা। বৃষ্টিভেজা আবহাওয়াও আটকাতে পারেনি মাশরাফির দলকে। ওই হিমশীতল ধর্মশালা থেকে প্রচণ্ড গরমের কলকাতায় এসে পড়া বাংলাদেশের জন্য একটি চিন্তা বটে। তবে এর চেয়ে বড় দুশ্চিন্তা মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে। ইনজুরির কারণে প্রথম পর্বের কোনো ম্যাচ খেলতে পারেননি। তবে কাল নেটে যেভাবে বোলিং করেছেন এই বাঁহাতি পেসার, তাতে ঝুঁকি নিয়ে আজ তাঁকে খেলানো হতেও পারে। ওদিকে চেন্নাইয়ে বোলিং অ্যাকশনের পরীক্ষা দিয়ে কাল সন্ধ্যায় কলকাতায় দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আরেক পেসার তাসকিন আহমেদ। আজকের ম্যাচে তাঁর খেলা নিয়ে সংশয় নেই কোনো।

ওদিকে পাকিস্তান জেরবার শহীদ আফ্রিদি বিতর্কে। ১৯ ডিসেম্বর এই ইডেন গার্ডেনসে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথে তাতিয়ে দিচ্ছে তা। স্থানীয়রা সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন হাজারো কণ্ঠে আজ বাংলাদেশকে পাগলপারা সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে। আর সীমান্তের ওপার থেকে লাল-সবুজের কোটি প্রাণের সমর্থন তো থাকছেই মাশরাফির দলের জন্য।

ক্রিকেটের অপরূপ উদ্যান ইডেন গার্ডেনসে পাকিস্তানের বিপক্ষে আরেক মার্চের আরেক যুদ্ধ বলে কথা!


মন্তব্য