kalerkantho

26th march banner

অনুরোধ উপেক্ষা করে অর্থ ছাড় দেয় রিজাল

আরো অর্থ ফেরত পেতে পারে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অনুরোধ উপেক্ষা করে অর্থ ছাড় দেয় রিজাল

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক থেকে বাংলাদেশের আট কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির পর ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) মাকাতি সিটির জুপিটার স্ট্রিট শাখায় স্থানান্তর করা হয়। এরপর চার দিন ডলারগুলো পড়ে ছিল সেই অ্যাকাউন্টগুলোতে। এই সময়ের মধ্যে ওই ডলারের লেনদেন আটকানোর আদেশ গিয়েছিল নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে। চুরির বিষয়টি টের পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও ওই অর্থ হস্তান্তর স্থগিত রাখতে রিজাল ব্যাংককে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সব আদেশ-অনুরোধ উপেক্ষা করেই ৯ ফেব্রুয়ারি ছাড় করা হয় সব অর্থ। গতকাল মঙ্গলবার ফিলিপাইনের সিনেট কমিটির শুনানিতে এ তথ্য বের হয়ে আসে। চূড়ান্তভাবে এ তথ্য প্রমাণিত হলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং রীতি অনুযায়ী বাংলাদেশকে অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে রিজাল ব্যাংক।

ফিলিপাইনের সিনেটে সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত ও তদন্ত করতে একটি কমিটি রয়েছে। সংক্ষেপে এ কমিটিকে ব্লু রিবন কমিটি বলা হয়।

ব্লু রিবন কমিটির প্রধান সিনেটর তেওফিস্তো গুংগোনা জানান, ৫ ফেব্রুয়ারি সন্দেহজনক অর্থ আসার পর ৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় নিউ ইয়র্ক ফেডারেল ব্যাংক থেকে ওই অর্থ আটকানোর আদেশ (স্টপ পেমেন্ট) আসে। চীনা নববর্ষ উপলক্ষে সেদিন ব্যাংকে ছুটি ছিল। শুনানিতে সিনেটর তেওফিস্তো রিজাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো তানের কাছে জানতে চান, ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে ব্যাংক খোলা ছিল। ‘স্টপ পেমেন্ট’ আদেশটি আপনার দেখার কথা। সেটি গ্রাহ্য করা হয়নি বলেই সব অর্থ তুলে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও রিজাল ব্যাংককে অর্থ হস্তান্তর আটকাতে একই ধরনের অনুরোধ করেছিল। অথচ রিজাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই অনুরোধের জবাব দেয় ৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ৮টায়। ততক্ষণে দিনের কাজ শেষ এবং বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া অর্থ রিজাল ব্যাংক থেকে তোলা হয়ে গেছে।

সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান আরো জানান, ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে ব্যাংক খোলার পরপরই নিউ ইয়র্ক ফেডারেল ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘স্টপ পেমেন্ট’ আদেশ মানা হলে পাঁচ কোটি ৮০ লাখ ডলার রক্ষা পেত। সিনেটরের এই বক্তব্যের জবাবে রিজাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ব্যাংকের গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যান। শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন রিজাল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখার ব্যবস্থাপক মাইয়া সান্তোস-দেগুইতো। তেওফিস্তো তাঁর কাছেও একই বিষয়ে জানতে চেয়ে বলেন, ৯ ফেব্রুয়ারিই আট কোটি ১০ লাখ ডলার তোলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ‘স্টপ অর্ডারটি’ তিনি (ব্যবস্থাপক) পেয়েছিলেন কি না? তবে ব্যবস্থাপকও ব্যাংকের গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে পুরো বিষয়টি এড়িয়ে যান।

ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) সহায়তা চেয়ে বাংলাদেশ গত ১১ ফেব্রুয়ারি চিঠি দিয়েছিল। ঢাকা থেকে একই অনুরোধ নিয়ে দুই কর্মকর্তা ফিলিপাইনে যান ১৬ ফেব্রুয়ারি। অথচ ফিলিপাইনের কর্তৃপক্ষ সন্দেহভাজন অ্যাকাউন্টগুলো জব্দ করেছে ২৯ ফেব্রুয়ারি, দেশটির গণমাধ্যমে অর্থ চুরির সংবাদ প্রকাশের পর। তখন মাত্র ৬৮ হাজার ডলার জমা ছিল অ্যাকাউন্টগুলোতে। ঘটনা ঘটে যাওয়ার তিন সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও নিউ ইয়র্কের অনুরোধ সত্ত্বেও ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

গতকাল সিনেট কমিটির শুনানিতে এএমএলসির পক্ষ থেকে বলা হয়, রিজাল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে খোলা চারটি অ্যাকাউন্ট থেকে সন্দেহজনক ওই অর্থের লেনদেন হয়। ওই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ হস্তান্তর স্থগিত করতে অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু ওই শাখার ব্যবস্থাপক মাইয়া সান্তোস-দেগুইতো সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে অর্থ ছাড় করেছেন। তবে দেগুইতো দাবি করেছেন, ব্যাংকটির চেয়ারম্যান লরেঞ্জো তানের নির্দেশেই তিনি এ কাজ করেছেন।

ফিলিপাইনের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ এই অর্থপাচারের ঘটনা তদন্তে নেমেছে ব্লু রিবন কমিটি। গতকালের শুনানিতে সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান তেওফিস্তো গুংগোনা জানান, রিজাল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখা থেকে অর্থ উত্তোলনের সময় ব্যাংকের সিসি টিভি ক্যামেরা বন্ধ ছিল।

সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে জমা রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের যে আট কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনে গেছে, এর মধ্যে ৩০ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় এক ব্যক্তির (যিনি চীনা অথবা তাইওয়ানি বংশোদ্ভূত) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবে এই অর্থ একসঙ্গে নয়, বরং কয়েক দিন ধরে পর্যায়ক্রমে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের প্রতিষ্ঠান ফিলরেম সার্ভিস থেকে ফিলিপাইনি মুদ্রায় ভাঙানো হয়েছিল।

সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান আরো জানান, ওই ব্যক্তির (চীনা বা তাইওয়ানি) মাধ্যমে যাওয়া অর্থের মধ্যে ২৯ মিলিয়ন ডলার জমা হয়েছিল ব্লুমবারি রিসোর্ট করপোরেশন পরিচালিত ‘সোলারি ক্যাসিনো রিসোর্টের’ অ্যাকাউন্টে। মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্লুমবারি করপোরেশনের মালিক এনরিক র‌্যাজন ফিলিপাইনের পঞ্চম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি। বাকি ২১ মিলিয়ন ডলার ইস্টার্ন হাওয়াই লেইসার নামের উত্তর ফিলিপাইনের একটি ক্যাসিনোতে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই অর্থ ক্যাসিনো হয়ে হংকংয়ে পাচার হয়েছে।

অভিযুক্ত ব্যাংক ব্যবস্থাপক মাইয়া সান্তোস-দেগুইতো সিনেটের শুনানিতে সব প্রশ্নের জবাব ‘এক্সিকিউটিভ সেশন’-এ দিতে চেয়েছেন। এক্সিকিউটিভ সেশনের আওতায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় মামলার সঙ্গে জড়িতরা ছাড়া অন্য কেউ উপস্থিত থাকতে পারেন না।

শুনানিতে তেওফিস্তো গুংগোনা ব্যাংক ব্যবস্থাপককে (সান্তোস-দেগুইতো) জিজ্ঞেস করেন, তাঁর শাখায় মাইকেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার লাগ্রোসাস, এনরিকো তিয়োডোরো ভাসকুয়েজ ও আলফ্রেড সান্তোস ভারজারা নামের চারজন বছরখানেক আগে যে চারটি অ্যাকাউন্ট খোলেন, যার মাধ্যমে ওই ৮১ মিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি কী জানেন? এত দিন কোনো লেনদেন না হলেও হঠাৎ করে কয়েক মিলিয়ন ডলার একটা অ্যাকাউন্টে চলে আসার পরও এটিকে তাঁর কাছে সন্দেহজনক কিছু মনে হয়নি কেন? ওই চার অ্যাকাউন্ট খোলার ফরমে তিনি (ব্যবস্থাপক) স্বাক্ষর করেছিলেন কি না? এর উত্তরে দেগুইতো বলেন, তিনি ‘এক্সিকিউটিভ সেশনে’ এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে চান। তবে সিনেট কমিটি তাঁকে এক্সিকিউটিভ সেশনের সুযোগ দেবে কি না তা নিশ্চিত না করলেও এ ঘটনার জন্য তাঁকে অভিযুক্ত করেছে।

প্রসঙ্গত, রিজার্ভ চুরির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর শুরুর দিকে পালাতে চেয়েছিলেন সান্তোস-দেগুইতো। কিন্তু গোয়েন্দা জালে আটকা পড়ে তাঁর সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

শুনানির শুরুতেই পুরো প্রক্রিয়াকে ‘এক্সিকিউটিভ সেশন’-এর আওতায় আনার ব্যাপারে সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি এর সঙ্গে একমত নই। প্রথমত ওই পাচার হওয়া অর্থের মালিক বাংলাদেশ সরকার, আর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে গোপনীয়তার কোনো অনুরোধ করা হয়নি। বস্তুত তাঁরা পর্যবেক্ষক হিসেবে এখানে উপস্থিত রয়েছেন। তাঁরা ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে ওই অর্থ উদ্ধারে সহযোগিতার জন্য অনুরোধ করেছেন। তাই অর্থের প্রকৃত মালিক যিনি, তাঁর ক্ষেত্রেই এক্সিকিউটিভ সেশনের ওই আইন প্রযোজ্য। ’

শুনানিতে এএমএলসি চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আমান্দো তেতাংচো, রিজাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান লরেঞ্জো তান, ফিলিপাইন ন্যাশনাল ব্যাংক (পিএনবি), ইস্ট ওয়েস্ট ব্যাংক এবং বানকো ডি ওরো (বিডিও)-এর কর্মকর্তা ও দুই ক্যাসিনোর কর্তৃপক্ষ উপস্থিত ছিল।

প্রসঙ্গত, গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টার পর ‘হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে’ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০১ মিলিয়ন ডলার বা ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার অর্থ চুরি যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে দুই কোটি ডলার যায় শ্রীলঙ্কায়, যা পরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আর ফিলিপাইনে যাওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে মাত্র ৬৮ হাজার ডলার এ পর্যন্ত ফেরত এসেছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।


মন্তব্য