kalerkantho


দায় নিয়ে পদত্যাগ ড. আতিউরের

♦ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে
♦ দুই ডেপুটি গভর্নর বরখাস্ত
♦ তদন্ত শুরু করেছেন ড. ফরাসউদ্দিন
♦ অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্তে সিআইডি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দায় নিয়ে পদত্যাগ ড. আতিউরের

রিজার্ভ চুরির দায় নিয়ে ‘স্বেচ্ছায়’ পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তাঁর পদত্যাগের পরপরই সাবেক অর্থসচিব ও সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. ফজলে কবিরকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

আগামী ১৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে কাজে যোগ দেবেন তিনি। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার রিজার্ভ চুরির এ ঘটনায় দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকে গতকাল বরখাস্ত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলমকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আর্থিক খাতের এত উচ্চপদে একসঙ্গে এত বড় পরিবর্তন এর আগে কখনো হয়নি।

আর ঘটনার এক মাসেরও বেশি সময় পর গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মো. জুবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। মুদ্রাপাচার প্রতিরোধ ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে অজ্ঞাতপরিচয়দের আসামি করে মামলাটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন। এটি তদন্ত করবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রিজার্ভ চুরির সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখতে গতকাল থেকেই কাজ শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি। তবে বেহাত থাকা আট কোটি ১০ লাখ ডলার বা ৬৩৫ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপের ওপর।

গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন ড. আতিউর রহমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো গভর্নরের এটাই প্রথম পদত্যাগের ঘটনা। সেখানে যাওয়ার আগে গুলশানের বাসভবনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চাইলে তিনি পদত্যাগ করবেন। আর পদত্যাগ করার পর বাসায় ফিরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংককে আমি নিজের সন্তানের মতো গড়ে তুলেছি। রিজার্ভ খোয়া যাওয়ার নৈতিক দায় থেকে আমি পদত্যাগ করেছি। ’

রিজার্ভ চুরির ঘটনা ছাড়াও আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থমন্ত্রীর অভিযোগ হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ঘটনার এক মাস পরও সরকারকে কিছুই জানানো হয়নি। এই না জানানোর কারণ সম্পর্কে আতিউর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমি বুঝতে পারিনি। তাই নিজে বোঝার জন্য একটু সময় নিয়েছি। ’

তাঁর পদত্যাগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন আতিউর রহমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে গভর্নর আতিউর রহমান সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করে পদত্যাগপত্র পেশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী এ পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আতিউর রহমানের এই পদত্যাগ একটি সাহসী পদক্ষেপ, যা নৈতিক মনোবল ও সৎ সাহসের বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আতিউর রহমানের সংবাদ সম্মেলনের আগেই তাঁর পদত্যাগের কথা নিশ্চিত করে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, গভর্নর পদত্যাগ করেছেন। নতুন গভর্নর হিসেবে ড. ফজলে কবিরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি ১৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে যোগদান করবেন। দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গঠিত ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিটি কাজ শুরু করেছে।

সোমবার দেশে ফেরার পরই অর্থমন্ত্রী গভর্নরকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন। তবে গভর্নর তা করেননি। দেশে ফিরে অর্থমন্ত্রীকে ফোন করেন আতিউর। তখন মুহিত বলেন, আপনি পদত্যাগ করলে বাংলাদেশ ব্যাংক আরো ভালো চলবে। মূলত তখন থেকেই পদত্যাগের প্রস্তুতি নেন গভর্নর। আর রবিবার বিকেলে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সময়ই গভর্নর পদ থেকে আতিউর রহমানকে সরানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন অর্থমন্ত্রী। তখন থেকেই কাকে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া যায়, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে পরামর্শ করে এগোতে থাকেন তিনি। আতিউর রহমান পদত্যাগ না করলে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার চিন্তাও ছিল অর্থমন্ত্রীর। সে কারণেই গতকাল সকাল ১১টায় সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন তিনি। ততক্ষণেও আতিউর রহমানের পদত্যাগের খবর না পাওয়ায় সংবাদ সম্মেলনটি পিছিয়ে দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে করার কথা জানান মন্ত্রী। আর এই সময়ের মধ্যে গভর্নর পদত্যাগ করায় সংবাদ সম্মেলনটিই বাতিল করে দেন তিনি।

দেশে ফেরার পরই গভর্নর বুঝতে পেরেছিলেন, অর্থমন্ত্রী তাঁর পদত্যাগ অথবা অব্যাহতি চান। সোমবার এর ইঙ্গিত দিয়ে মুহিত বলেছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা হবে। অর্থমন্ত্রী ও সরকারের ভাবনা বুঝতে পেরে গতকাল সকালে আর অফিসে যাননি আগের দিন ভারত থেকে আসা গভর্নর। তবে বরখাস্ত হওয়া দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানা সকাল থেকেই প্রতিদিনের মতো অফিস করেছেন। অন্য দুই ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী ও আবু হেনা মোহা. রাজী হাসানের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন চাকরি খোয়ানো দুই ডেপুটি গভর্নর। এস কে সুর চৌধুরী ও আবু হেনা মোহা. রাজী হাসানের সঙ্গে নাজনীন সুলতানার চাকরির মেয়াদ গত ২২ জানুয়ারি শেষ হয়েছিল। গভর্নর আতিউর রহমানের সুপারিশেই মন্ত্রণালয় ৬২ বছর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়িয়ে তাঁদের পুনর্নিয়োগ দেয় গত ৭ ফেব্রুয়ারি। ফলে আবু হেনা দুই বছর সাত মাস, এস কে সুর চৌধুরী প্রায় দুই বছর ও নাজনীন সুলতানা প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস বাড়তি মেয়াদ পান। আর আবুল কাশেমের চাকরির মেয়াদ শেষ হয় ২০১৫ সালের ৭ জুলাই। ওই বছরের ১৯ আগস্ট তাঁকে আরো এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলমকে সরিয়ে দেওয়ার কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তবে গত রাত পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে কোনো আদেশ জারি করা হয়নি। বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। গতকাল সকাল ৯টার দিকে তিনি কার্যালয়ে এসে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও উপহার পাওয়া একটি ল্যাপটপ নিয়ে সাড়ে ১০টার দিকে নিজের গাড়িতে উঠে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান। সেখানে ‘সবার জন্য আবাসন’ নিশ্চিত করা নিয়ে পূর্বনির্ধারিত একটি বৈঠক ছিল। সকালে এসে ফাইল গোছানো ও ড্রয়ার থেকে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র গাড়িতে তোলা দেখেই তাঁর দপ্তরের কর্মকর্তাদের মনে প্রশ্ন জাগে। তবে তাঁদের ধারণা ছিল, আসলাম আলমকে হয়তো গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। দুপুরের পর ওএসডি হওয়ার খবর পান আসলাম আলম। তখন তিনি তাঁর দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডেকে বলেন, বুধবার থেকে আমি আর এখানে অফিস করব না। আপনারা ভালো থাকবেন। বিকেলে আসলাম আলমের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা মূল্যমানের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়, এর মধ্যে আট কোটি ১০ লাখ ডলার বা ৬৩৫ কোটি টাকা ওই দিনই ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকের (আরসিবিসি) জুপিটার স্ট্রিট শাখার ছয়জনের ব্যাংক হিসাবে ঢোকে। সেখান থেকে মাত্র ৬৮ হাজার ডলার ফেরত পাওয়া গেছে। বাকি অর্থ জুয়ার আসর হয়ে হংকংসহ বিভিন্ন দেশে চলে গেছে। আর শ্রীলঙ্কায় যাওয়া দুই কোটি ডলার থেকে এক কোটি ৯৯ লাখ ডলার ফেরত পাওয়া গেছে ‘ফাউন্ডেশন’ শব্দটির ইংরেজিতে বানান ভুল থাকার কারণে।

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের ইনকোয়ারার পত্রিকা প্রথম বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপে, যা বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো জানতে পারে ৭ মার্চ। এরপর অর্থমন্ত্রী এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো দায় নেই উল্লেখ করে ফেডারেল ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা বলেছিলেন। তারপর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছিল। তবে বিদেশ থেকে ফেরার পর গত রবিবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. আসলাম আলম বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে চার ডেপুটি গভর্নরের কাছ থেকে রিজার্ভ চুরির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে তা অর্থমন্ত্রীকে জানান। তখন অর্থমন্ত্রী বুঝতে পারেন যে, সংবাদপত্র থেকে জানার পর বাংলাদেশ ব্যাংক মুহিতকে যে তথ্য জানিয়েছে, তা ছিল মিথ্যা। বাস্তবে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফেডারেল ব্যাংকের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এতে অর্থমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন গভর্নরের ওপর। ওই দিনই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে গভর্নর পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন।

রিজার্ভ খোয়া যাওয়ার এই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলেও এর সঙ্গে জড়িতদের এখনো চিহ্নিত করতে পারেনি দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সোমবার পর্যন্ত র‌্যাব যে ১৫ জনকে নজরদারিতে রেখেছিল, তাঁদেরকে ঘিরেই চলছে র‌্যাবের তদন্ত। র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুতই গ্রেপ্তার করা হবে।


মন্তব্য