kalerkantho


সোনাইমুড়ীতে সংঘর্ষে ২ হিজবুতসহ নিহত ৩

বাড়িতে আগুন, আহত অর্ধশতাধিক

নোয়াখালী প্রতিনিধি   

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সোনাইমুড়ীতে সংঘর্ষে ২ হিজবুতসহ নিহত ৩

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে গ্রামবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষে হিজবুত তাওহীদ নামের একটি ধর্মীয় সংগঠনের দুই সদস্যসহ তিনজন নিহত হয়েছে। গ্রামবাসী, পুলিশসহ আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক।

সংঘর্ষের সময় গ্রামবাসী হিজবুত তাওহীদ সদস্যদের দুটি ঘর ও বাজারে তাদের কার্যালয় পুড়িয়ে দিয়েছে।

গতকাল সোমবার দুপুরে উপজেলার চাষিরহাট ইউনিয়নের পোড়করা গ্রামে কয়েকজন হিজবুত তাওহীদ সদস্যের বাড়িতে গ্রামবাসী হামলা চালানোর পর এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। পুলিশ পাহারা দিয়ে হিজবুত তাওহীদের সদস্যদের পরিবারের নারী-পুরুষসহ ১১০ জনকে সোনাইমুড়ী থানায় নিয়ে এসেছে।

নিহত তিনজন হলেন সোলাইমান খোকন (২৮), ইব্রাহীম খান রুবেল (৩৬) ও মজিবুল হক। তাঁদের মধ্যে প্রথম দুজন হিজবুত তাওহীদের সদস্য। তবে তাঁদের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। মজিবুল পোড়করা গ্রামের বাসিন্দা।

নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুজ্জামান হতাহতের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেননি।

তিনি জানান, তিনজনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে দুই প্লাটুন র‌্যাব ও দুই প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছে বলে তিনি জানান।

পোড়করা গ্রামের লোকজন জানায়, গ্রামের কয়েকটি পরিবারের লোকজন হিজবুত তাওহীদের সদস্য। আগে কেবল নুরুল হক নামের একজন ও তাঁর পরিবার এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ করে এমন অভিযোগে দুই বছর আগে পরিবারটি উচ্ছেদ করা হয়। পরে আবার তারা আবার গ্রামে এসে বসবাস শুরু করে। এরপর আরো কয়েকটি পরিবার এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয়। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তারা সেখানে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং ভোজের আয়োজন করে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগঠনটির আরো সদস্য সেখানে জড়ো হয়। ওই অনুষ্ঠানে তারা নিজেদের সংগঠন ও ইসলাম নিয়ে বক্তব্য দেয়। এ ছাড়া নিজেদের জন্য আলাদা মসজিদ করার ঘোষণা দেয়।

হিজবুত তাওহীদ সদস্যদের মসজিদ করার বিরোধিতা এবং তাদের কার্যকলাপ ইসলামসম্মত নয় অভিযোগ করে তাদের কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবিতে গতকাল সোমবার সকালে এলাকাবাসী সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেয়।

এদিকে মসজিদ নির্মাণ বিষয়ে হিজবুত তাওহীদের সদস্যরা সকালে নুরুল হক ওরফে নুরুল হক মেম্বারের বাড়িতে বৈঠক করে। এই খবর পেয়ে এলাকাবাসী স্মারকলিপি দেওয়ার পর সংঘবদ্ধ হয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হিজবুত তাওহীদের সমর্থক নুরুল হকের বাড়িতে হামলা চালায়। একপর্যায়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে হিজবুত তাওহীদের সদস্যদের সংঘর্ষ শুরু হয়। গ্রামবাসীর হামলায় হিজবুত তাওহীদের সদস্য সোলাইমান, ইব্রাহীম ও মজিবুল নিহত হন। এ সময় গ্রামবাসী ওই বাড়ির দুটি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়।

খবর পেয়ে পুলিশ এসে ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। তখন গ্রামবাসী, পুলিশ ও হিজবুত তাওহীদ সদস্যদের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে পুলিশের কয়েকজন সদস্যসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খবর পেয়ে জেলা শহর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

হিজবুত তাওহীদ সদস্য আলমগীর জানান, তাঁরা নুরুল হকের বাড়িতে বসে একটি মসজিদ নির্মাণ বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। ওই সময় একদল লোক ‘আল্লাহু আকবার’ বলে বাড়িতে ঢুকে তাঁদের ওপর হামলা চালায় এবং আগুন দেয়। ওই লোকদের হামলায় তাঁদের তিনজন সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া তাঁদের একটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং লুটপাট করা হয়েছে। হামলায় অনেক নারীও আহত হয়েছে।

হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে দাবি করে আলমগীর জানান, অনেক লোকজনকে তাঁরা খুঁজে পাচ্ছেন না। আলমগীর দাবি করেন, তাঁরা ইসলামসম্মত নয় এমন কোনো কাজ করেননি।

অন্যদিকে চাষিরহাট বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী ও পল্লী চিকিৎসক আবুল কাশেম দাবি করেন, হিজবুত তাওহীদের অনৈসলামিক কার্যক্রম এলাকাবাসী পছন্দ করত না। তার ওপর এখন তারা সেখানে তাদের মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। ওই বাড়িতে তাদের ভক্ত টাঙ্গাইলের হুমায়ুন খান পন্নীর সমর্থকদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে এ ধরনের হামলা করেছে বলে তিনি দাবি করেন। চাষিরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হানিফ জানান, মূলত হিজবুত তাওহীদ সদস্যদের মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা ও তাদের ‘ইসলামবিরোধী’ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে এলাকাবাসী প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে।

সোনাইমুড়ী থানার ওসি কাজী হানিফুল ইসলাম জানান, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও হামলার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিজেরাও আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়েছে। পরে সন্ধ্যায় হিজবুত তাওহীদের সদস্যদের পরিবারের ১১০ জনকে পুলিশ নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়েছে। রাত ১০টার দিকে গ্রামবাসী থানায় হামলার চেষ্টা করে। তখন পুলিশ ফাঁকা গুলি করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে কারো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।


মন্তব্য