kalerkantho


শাহজালালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা

দায়িত্ব পাচ্ছে ব্রিটিশ বেসরকারি সংস্থা

আশরাফুল হক রাজীব ও সরোয়ার আলম   

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দায়িত্ব পাচ্ছে ব্রিটিশ বেসরকারি সংস্থা

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ব্রিটিশ বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। এ ক্ষেত্রে চারটি ব্রিটিশ সংস্থার মধ্যে যেকোনো একটিকে বাংলাদেশ সরকার বেছে নিতে পারে।

সংস্থাগুলো হচ্ছে জিএসএ, রেডলাইন অ্যান্ড কন্ট্রোল রিস্কস, রেসট্রাটা পিলগ্রিমস গ্রুপ অ্যান্ড এডাম স্মিথ ইন্টারন্যাশনাল এবং ওয়েস্ট মিনস্টার এভিয়েশন সিকিউরিটি সার্ভিসেস। গত রবিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সার্বিক  নিরাপত্তা বিধানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও ইউকে ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টের মধ্যে বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়।

আর বাংলাদেশ সফররত যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা প্রতিনিধিদল গতকাল সোমবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে তারা ইতিমধ্যে নেওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আগামীকাল বুধবার প্রতিনিধিদলটি দেশে ফিরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তাদের প্রতিবেদন দেবে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাজ্য শিগগির নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে।

গতকাল সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্ল্যাক। বৈঠকে নিরাপত্তা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পরে বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা সাপেক্ষেই শাহজালালে বিদেশি নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

২০ মার্চের মধ্যে এই নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেওয়া প্রস্তাব মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নের জন্য রবিবারই একটি উচ্চ পর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিও গঠন করা হয়েছে ইউকে ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টের চাহিদা অনুযায়ী। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননকে স্টিয়ারিং কমিটির প্রধান করা হয়েছে। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কমিটিতে রয়েছেন। গতকাল কমিটি জরুরি বৈঠক করেছে। রাশেদ খান মেননের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ব্রিটিশ কম্পানির নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার পরামর্শক সেবা নেওয়ার জন্য আগামীকালের মধ্যে একটি কারিগরি প্রকল্প প্রস্তাব (টিপিপি) প্রণয়ন করবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এই পরামর্শক সেবা নিতে হবে জরুরিভিত্তিতে। এ কারণে পরামর্শক সেবা প্রকল্পকে সরকারি ক্রয় নীতি থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। বোমরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কারিগরি প্রকল্প প্রস্তাব পেলে তা সরকারি ক্রয় নীতি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রস্তাব পাঠাবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। পরামর্শকসেবা ক্রয় প্রস্তাব ২০ মার্চের মধ্যে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।  

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শাহজালালের নিরাপত্তার দায়িত্ব আউটসোর্সিং করা হচ্ছে না। আমরা আমাদের বিমানবন্দরের দায়িত্বও তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি না। আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক দিন ভালো করে, অন্য দিন খারাপ করে। এটা টেকসই করতে হবে। টেকসই করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দরকার। বিদেশি সংস্থা নেওয়া হলে তারা আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণও দেবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা তদারকির জন্য ব্রিটিশ বেসরকারি সংস্থার নাম আলোচনাক্রমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বৈঠকে ব্রিটিশ হাইকমিশনারও উপস্থিত ছিলেন। তিনিই বলেছেন, আমরা চাইলে তিনি কিছু ব্রিটিশ বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার নাম দিতে পারেন। পরে আমরাই আগ্রহ করে এসব নাম সংগ্রহ করেছি। এসব বিদেশি সংস্থার প্রোফাইল দেখে সব কিছু পর্যালোচনা করা হবে। আমাদের মনমতো হলেই আমরা তাদের সেবা নেব। আশা করি ৩০ মার্চের মধ্যেই আমরা নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে পারব। ’

জানা যায়, যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিদল গতকাল সকাল থেকে শাহজালালে বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করে। কার্গো ভিলেজে গিয়ে তারা স্ক্যানিং মেশিন, সিসি ক্যামেরা, সিভিল এভিয়েশন ও বিমান স্টাফদের পরিচয়পত্র, হ্যাঙ্গার গেট দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া ও স্ক্যানিং মেশিন দিয়ে কিভাবে পণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় তা পর্যবেক্ষণ করে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সিসি-৩ অডিটর ডিনেসও সুলেভান। পরে তাঁরা বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা সিভিল এভিয়েশনের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, শাহজালালের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ১০ মার্চের পর থেকে যেভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে তাতে প্রতিনিধিদল সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, ৩১ মার্চের আগেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হতে পারে।

গতকাল সচিবালয়ে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা সাপেক্ষেই শাহজালালে বিদেশি নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁর মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ইতিবাচক সম্মতি দিয়েছে। আশা করছি বিদেশি নিরাপত্তা কম্পানির হাতে শাহজালালালের নিরাপত্তার দায়িত্ব ২০ মার্চের মধ্যেই দিয়ে দেওয়া যাবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতেই বিমানের নিরাপত্তা ভার তুলে দেওয়া হবে। তারা দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তাদের নিরাপত্তা বিধানের কাজটি করবে। তা করা সম্ভব হলে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের আর কোনো চিন্তায় থাকতে হবে না। ’

ঢাকা থেকে যুক্তরাজ্যে সরাসরি বিমানযোগে পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘এটা দীর্ঘকালের জন্য চলতে পারে না। যা ঘটেছে, তা সাময়িক। শিগগির এর সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা করছি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ব্রিটিশ সরকারও একমত হয়েছে। ’

বৈঠকে আলোচনার বিষয়বস্তু উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আগ্রহী উদ্যোক্তাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প স্থাপনে সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে কথা হয়েছে। কার্গো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ইস্যু জোরদার এবং এ ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিয়েও কথা হয়েছে। ভিসা জটিলতার সুরাহা নিয়েও আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। ঢাকা থেকে যাতে সহজ প্রক্রিয়ায় ব্রিটিশ ভিসা পাওয়া যায়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আমরা হাইকমিশন পর্যায়ে আলোচনা করেছি। ’ 

এদিকে শাহজালালের নিরাপত্তা ত্রুটির কারণ দেখিয়ে গত ৮ মার্চ ঢাকা থেকে সরাসরি কার্গো ফ্লাইটের যুক্তরাজ্যে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে নানামুখী আলোচনার মধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের পর গতকাল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব খোরশেদ আলম চৌধুরীকেও সরিয়ে দিয়েছে সরকার। তাঁকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য করা হয়েছে। সচিবের তুলনায় পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ‘ডাম্পিং পোস্ট’ হিসেবে প্রশাসনে বিবেচিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, খোরশেদ আলম চৌধুরী বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকা অবস্থায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। বিভিন্ন সময় তিনি মন্ত্রণালয় ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের চলমান বিরোধে দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করেছেন। তিনি মন্ত্রণালয়ে থাকার সময় মন্ত্রণালয়ের পক্ষে কথা বলেছেন। আবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে গিয়ে পর্ষদের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, মন্ত্রণালয় ও বিমানের পরিচালনা পর্ষদের রেষারেষিতে তিনি কার্যকর ভূমিকা নিতে পারতেন। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য বিশেষায়িত সংস্থা এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স গঠনের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাদের প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি। এই বিশেষায়িত সংস্থা গঠনের বিষয়েও সচিবের কোনো বিশেষ তৎপরতা দেখা যায়নি।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সানাউল হককে এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সরিয়ে দেওয়ার পর আলোচনা হচ্ছে এরপর কাকে সরানো হবে। কারণ বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন আহমদের সঙ্গে গত ছয় বছর ধরে মন্ত্রীদের বনিবনা হচ্ছে না। জি এম কাদের, ফারুক খানের পর বর্তমান বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সঙ্গেও তাঁর বনিবনা হচ্ছে না। মন্ত্রী বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের বিষয়ে সংসদেও বক্তৃতা দিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মন্ত্রী কয়েক দিন ধরেই বিমানের চেয়ারম্যান বদলের জন্য সংশ্লিষ্টদের বলেছেন বলে জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ৩০ মার্চের মধ্যে বিমানের এজিএম হবে। এরপর বিমানের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে। বিমানের বর্তমান চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন আহমদের স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন এনামুল বারী, জিয়াউদ্দিন আহমদ এবং রফিকুল ইসলামের মধ্যে যেকোনো একজন। তাঁদের মধ্যে প্রথম দুজন বিমানবাহিনীতে চাকরি করেছেন।

 


মন্তব্য