kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


অজেয় মির্জা লতিফ বাহিনী

অসীম মণ্ডল, সিরাজগঞ্জ   

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অজেয় মির্জা লতিফ বাহিনী

মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সিরাজগঞ্জ ছিল মহকুমা। যমুনা নদীতীরের এ জনপদ ছিল পাবনা জেলার অধীন। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জবাসীর মধ্যে স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল ষাটের দশকেই। এরই ধারাবাহিকতায় একাত্তরে ছাত্র, কিষান, মজুর থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নেমে পড়েন মুক্তির সংগ্রামে।

সিরাজগঞ্জে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম সম্মুখযুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহকুমা  প্রশাসক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম শামসুদ্দীন। সিরাজগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যাঁর নাম চির অম্লান থাকবে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বারবার চেষ্টা চালিয়েও ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ শহর দখল করতে পারেনি। ২৪ এপ্রিল হানাদার বাহিনী ঈশ্বরদী থেকে বিহারি ও স্বাধীনতাবিরোধী ছাত্রসংঘের বাহিনী নিয়ে ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ ট্রেনে সিরাজগঞ্জে আসার পথে ঘাটিনা সেতুর কাছে বাধাপ্রাপ্ত হয়। মুক্তিবাহিনীর একটি অগ্রবর্তী দল বাঘাবাড়ী ও নগরবাড়ী ঘাটে প্রতিরোধ ব্যূহ তৈরি করে। টানা তিন দিন চলে যুদ্ধ। একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ভারী অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে মুক্তিবাহিনী পিছু হটে। এ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন এ কে এম শামসুদ্দীন।

দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সিরাজগঞ্জের প্রথম সম্মুখযুদ্ধটি সংঘটিত হয় কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাটে। এরপর গ্রামগঞ্জে হানাদারদের সঙ্গে অসংখ্য প্রতিরোধ ও সম্মুখযুদ্ধ হয়। এর মধ্যে ভাটপিয়ারীর যুদ্ধ, বরইতলার যুদ্ধ, শৈলাবাড়ীর যুদ্ধ, বেলকুচি ও তাড়াশ থানা রেইড, ব্রহ্মগাছার যুদ্ধ ও তাড়াশের নওগাঁ যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রথম সম্মুখযুদ্ধ : সিরাজগঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম সম্মুখযুদ্ধটি সংঘটিত হয় বর্তমান কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাটে। এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা প্রয়াত আব্দুল লতিফ মির্জা। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল পলাশডাঙ্গা যুব শিবির নামের বিশাল বাহিনী। পলাশডাঙ্গা বাহিনী সিরাজগঞ্জ থেকে পাবনা হয়ে নাটোর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটিয়েছিল। ভদ্রঘাটে স্থাপন করা হয়েছিল ‘পলাশডাঙ্গা যুব শিবির ক্যাম্প’। ১১ সেপ্টেম্বর হানাদার বাহিনী ওই ক্যাম্পে হামলা চালায়। মুক্তিবাহিনী তাৎক্ষণিক শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একপর্যায়ে তা সম্মুখযুদ্ধে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানিরা বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মুখে পিছু হটে। এরপর ২২ সেপ্টেম্বর রায়গঞ্জ থানার ব্রহ্মগাছা ইছামতি নদীতে পলাশডাঙ্গা মুক্তিবাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে হানাদাররা আক্রমণ চালায়। এ যুদ্ধেও পরাস্ত হয় হানাদাররা। আর এই যুদ্ধে অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান অরুন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আব্দুল হাই তালুকদার, সোহরাব আলী সরকার, শফিকুল ইসলাম শফি, বাঘা মোহাম্মদ, আখতার, আলী ইমাম দুলু, আব্দুর রহিম, মনিরুল কবীর প্রমুখ।

নওগাঁ যুদ্ধ : একাত্তরে উত্তরবঙ্গে যে কয়টি যুদ্ধ সংঘটিত হয় তার মধ্যে অন্যতম সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ যুদ্ধ। ১১ নভেম্বরের এ যুদ্ধে নিহত হয় হানাদার বাহিনীর শতাধিক সেনা। অন্যদিকে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। এ যুদ্ধে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব আলী সরকার স্মৃতিচারণ করে জানান, সেদিন ভোর না হতেই ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ২৫০ সেনা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হান্ডিয়াল নওগাঁ মাজারের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থান নেয়। আগাম খবর পেয়ে চলনবিলের বুকে ভাসমান নৌকায় অবস্থান নেন মুক্তিযোদ্ধারা। হানাদাররা হামলা চালালে মুক্তিযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রুসেনাদের ওপর। দীর্ঘ চার ঘণ্টা যুদ্ধের পর সকাল ১০টার দিকে শত্রুপক্ষ কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ করেই আকাশে উড়ে আসে দুটি জেট ফাইটার বিমান। তবে পরমুহূর্তেই সেগুলো চলে যায়। জানা যায়, কোণঠাসা হয়ে পড়া সেনারা বেতার বার্তা পাঠালেও তাতে উল্লেখ করা পজিশন ভুল থাকায় হান্ডিয়াল নওগাঁর পরিবর্তে তৎকালীন মহুকুমা নওগাঁয় গিয়ে জেট ফাইটার দুটি ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে। দুপুর ১২টার দিকে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিবাহিনী হানাদারদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। উপর্যুপরি আক্রমণে নিহত হয় শতাধিক শত্রুসেনা। অবশেষে ওরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। আটক করা হয় ক্যাপ্টেন সেলিমসহ ৯ পাকিস্তানি সেনাকে। এ ছাড়া পালিয়ে যাওয়ার সময় আসলাম নামের আরো এক সেনাকে আটক করে এলাকাবাসী। এদিন বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী এলাকায় প্রায় ৭০ জন রাজাকারকে পিটিয়ে মারে।

শৈলাবাড়ী যুদ্ধ : শৈলাবাড়ীতে যে যুদ্ধটি হয় সেটিই ছিল সিরাজগঞ্জে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের শেষ যুদ্ধ। মুক্তিবাহিনীর উপর্যুপরি আক্রমণে একের পর এক পর্যুদস্ত পাকিস্তানি বাহিনী এ যুদ্ধেও পরাজিত হয়। এরপর ১৪ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ ছেড়ে রাতে তারা পালিয়ে যায়। সিরাজগঞ্জ শহর হয় শত্রুমুক্ত।

১০ ডিসেম্বর সকালে সহস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধা মিত্রবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়াই সিরাজগঞ্জ শহর শত্রুমুক্ত করার শপথ নেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বীর যোদ্ধা আমির হোসেন ভুলুকে প্রধান করে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় বিএলএফের কমান্ডার মোজাফ্ফর হোসেনকে। ১১ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় আরসিএল গান ফায়ারিংয়ের মাধ্যমে আক্রমণের সূচনা হয়। শৈলাবাড়ী স্কুল ক্যাম্প থেকে হানাদার বাহিনীও পাল্টা আক্রমণ চালায়। তিন দিনের মরণপণ যুদ্ধ শেষে ১৩ ডিসেম্বর সকালে দখলদার বাহিনী পিছু হটে। এ যুদ্ধে চারজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। অন্যদিকে দখলদার বাহিনীর ১৮ সেনা অফিসার নিহত হয়। শৈলাবাড়ী ক্যাম্পের পতন ঘটিয়ে মুক্তিবাহিনী এগোতে থাকে শহর অভিমুখে। পালিয়ে যাওয়ার পথে হানাদার বাহিনী রানীগ্রাম রেললাইনের ওপর বাংকার থেকে গুলি চালালে শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার আহসান হাবিব ও মোকবুল হোসেন কালু। এ ছাড়া বাহিরগোলা সড়কে প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হন বীর যোদ্ধা সুলতান মাহমুদ।


মন্তব্য