kalerkantho

25th march banner

তামিম-ঝড়ে সুপার টেনে

বাংলাদেশ : ২০ ওভারে ১৮০/২
ওমান : ১২ ওভারে ৬৫/৯
ফল : বাংলাদেশ ৫৪ রানে জয়ী (ডি/এল পদ্ধতিতে)
ম্যাচসেরা : তামিম ইকবাল

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তামিম-ঝড়ে সুপার টেনে

প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি ও এক হাজার রান তামিম ইকবালের। ছবি : মীর ফরিদ

মাঠে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে ১১ জন। সবার ঠোঁট নড়ছে। সবার হৃদয় কাঁপছে। প্রত্যেকের চোখের তারায় ঝলসানো প্রতিজ্ঞা আঁকা। প্রত্যেকের মুখের পেশিতে স্বপ্নপূরণের কবিতা লেখা। ‘আমার সোনার বাংলা’র সঙ্গে কণ্ঠ মেলানো ওই ক্রিকেটারদের এই ভাবনা পড়ে নিতে একটুও অসুবিধা হয় না তো! ১৬ কোটির প্রতিনিধি তাঁরা, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সূর্যসন্তান। ওই ক্রিকেটপাগল মানচিত্রের স্বপ্নপূরণের দায় যখন ওঁদের ১১ জনের, আবেগ কেন ছুঁয়ে যাবে না!

সেই আবেগের জাহাজে ভেসে কাল স্বপ্নপূরণের বন্দরে ঠিকই নোঙর করে বাংলাদেশ। রাজসিক আধিপত্যে ওমানকে উড়িয়ে জায়গা করে নেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্বে। বৃষ্টি, ইনজুরি, আইসিসি—কোনো কিছুই রুখতে পারে না মাশরাফির দলকে। কোনো কিছুই দাবিয়ে রাখতে পারে না বাঙালির ক্রিকেট-বীরদের।

ওই ১১ ক্রিকেট-বীরের মধ্যে মহাবীরের তকমা এখন সেঁটে তামিম ইকবালের গায়ে। কী অবিশ্বাস্য সময় এখন পার করছেন তিনি! বাছাই পর্বের প্রথম ম্যাচে অপরাজিত ৮৩ রান করে নেদারল্যান্ডসকে হারানোর পথ তৈরি করেন। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৭ রান করে তাড়িয়ে দেন বৃষ্টিতে দৈর্ঘ্য কমে আসা ম্যাচের অনিশ্চয়তার মেঘ। আর কাল ‘ফাইনাল’-এ রূপান্তরিত ম্যাচে তো সেঞ্চুরিই! টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে দেশের জার্সিতে প্রথম সেঞ্চুরির জন্য এর চেয়ে ভালো মঞ্চ আর কোথায় পেতেন তামিম!

অথচ টানা পঞ্চম ম্যাচে টস হারার পর বাংলাদেশকে কাল যখন শুরুতে ব্যাটিং করতে হয়, তখন কত দুশ্চিন্তা! ধর্মশালার আকাশের চেয়ে বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমের চিন্তার মেঘ কম না। বৃষ্টিতে কমে আসা ম্যাচে পরে ব্যাটিং করা দলের সুবিধা যে থাকে সব সময়! কাল ওমানের বিপক্ষে পাওয়ার প্লের ছয় ওভারে মাত্র ২৯ রান ওঠায় দুশ্চিন্তা বেড়ে যায় আরো। খেয়ালি প্রকৃতি তখন যদি বৃষ্টি ঝরায়, তাহলে? বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বপ্ন যে ধুয়েমুছে যাওয়ার আশঙ্কা!

প্রকৃতি অপ্রসন্ন হয়নি। আর ওমানের বোলারদের আধিপত্যের শিকল ভাঙতেও সময় নেননি তামিম। সপ্তম ওভারে দুই বাউন্ডারিতে বেরিয়ে আসেন খোলস ছেড়ে। এরপর সময় এগোয় যত, ম্যাচটি ততই হয়ে পড়ে কেবল বাংলাদেশের। শুধুই তামিমের। কী পেসার, কী স্পিনার—কোনো বোলারই আর তাঁর বুনো উদ্দামতা সামাল দিতে পারেন না। ড্রাইভ, কাট, পুলের বাহারি শটে ধর্মশালার রাঙানো প্রকৃতিকে আরো যেন রাঙিয়ে দেন তামিম।

ওদিকে ২২ বলে ১২ রান করা সৌম্য সরকার আউট। তামিমের তাতে কিছু যায় আসে না। আর এরপর সাব্বির রহমান এসে কী সঙ্গটাই না দেন তাঁকে! আগে ব্যাটিং করায় দ্রুত রান তোলার চাপ তাই কখনোই অনুভূত হয় না বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমে। তামিম-সাব্বিরের ৯৭ রানের জুটি ম্যাচ থেকে এক রকম ছিটকেই ফেলে ওমানকে।

তামিম ফিফটিতে পৌঁছেন ৩৫ বলে। তখনো স্বপ্নের আকাশে ডানা মেলে না সেঞ্চুরির ঘুড়ি। বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যান কখনো টি-টোয়েন্টিতে তিন অঙ্ক স্পর্শ করতে পারেননি বলে স্বপ্ন দেখায় ভয় ছিল বড্ড। কিন্তু অভয় দেয় তামিমের ব্যাট। নব্বইয়ের ঘরে পৌঁছে যান আরেকটি চোখজুড়ানো ছক্কায়। আরেকটি মন ভোলানো চারে সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ। মাত্র ৬০ বলে ১০টি চার ও পাঁচটি ছক্কার মণিহারে সাজানো সেই ইনিংসে জয়ের মহানায়ক তিনি। ওদিকে সাব্বিরও দারুণ পার্শ্বনায়কের ভূমিকা নেন ৪৪ রানের ইনিংসে। তাতে করে ২০ ওভারে ১৮০ রানের চূড়ায় পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। এই চূড়া জয়ের সামর্থ্য কী করে থাকে ওমানের!

তখনো কিছুটা হলেও প্রকৃতির হাতে ছিল বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ভাগ্য। প্রথম পাঁচ ওভারে বিনা উইকেটে ৩৮ রান যদি করতে পারে ওমান, এরপর বৃষ্টিতে আর খেলা না হয়—তাহলে ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে অবিশ্বাস্যভাবে জিতে যায় ওমান। কিন্তু অত নিষ্ঠুর কী করে হয় প্রকৃতি! আর মাশরাফি-ব্রিগেডও ইনিংসের শুরুতে উইকেট তুলে নেবে না কেন! বোলিং অ্যাকশনের সন্দেহের জালে পড়া তাসকিন আহমেদই এনে দেন প্রথম ব্রেক থ্রু। এরপর আল-আমিন হোসেনের আরেক শিকার। ওমানের ইনিংসের সাত ওভার শেষে বৃষ্টি হানা দিল যখন, দুই উইকেটে ৪১ রান তাদের। হিসাবের মারপ্যাঁচে ১৯ রানে এগিয়ে বাংলাদেশ।

এরপর বৃষ্টি কিছুক্ষণ খেলে ক্রিকেট নিয়ে। ১৬ ওভারে ১৫২ রানের পরিবর্তিত লক্ষ্য পায় ওমান। কিছুক্ষণ পরের আরেক বৃষ্টির ঝাপটায় ১২ ওভারে ১২০ রান। কিন্তু এসব নিতান্তই কাগুজে হিসাব। বাংলাদেশের স্বপ্নঘুড়ির ভোঁকাট্টা হওয়ার আশঙ্কা ততক্ষণে মিলিয়ে যায় হিমালয়ের ওপারে। সাকিব আল হাসানের চার শিকারে ৯ উইকেটে ৬৫ রানে থমকে যায় ওমান। ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ম্যাচটি জেতে ৫৪ রানে।

ধর্মশালার স্টেডিয়ামের আকাশে-বাতাসে তখনো কান পেতে শোনা যায় ‘আমার সোনার বাংলা’র সেই সুর, যে সুর ততক্ষণে ১১ ক্রিকেট-বীরের হৃদয় থেকে ছড়িয়ে পড়েছে দূরদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ১৬ কোটি ক্রিকেটপ্রাণে।


মন্তব্য