kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


নিরাপত্তাবলয়ে শাহজালাল

কার্গো ভিলেজে ব্রিটিশ নিরাপত্তা বিশ্লেষক

সরোয়ার আলম   

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নিরাপত্তাবলয়ে শাহজালাল

বাংলাদেশ থেকে বিমানে সরাসরি পণ্য পরিবহনে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পরিপ্রেক্ষিতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি স্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের সংখ্যা ধাপে ধাপে বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে কার্গো ভিলেজে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা।

গতকাল রবিবার দুপুরে শাহজালালে গিয়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, পাস ছাড়া কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। কাঁচামাল প্যাকিজিং করে কার্গোতে নিয়ে যাচ্ছে শ্রমিকরা। বাংলাদেশ বিমান ছাড়া বেশির ভাগ

এয়ারলাইনসে করেই লন্ডন ও অস্ট্রেলিয়ায় পণ্য পাঠানো হচ্ছে। আর নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রতিদিন প্রায় ২৩ লাখ টাকা লোকসান দিচ্ছে বাংলাদেশ বিমান। পুরনো স্ক্যানিং মেশিনগুলো বাদ দিয়ে নতুন মেশিন কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৯০ কোটি টাকার নিরাপত্তা সরঞ্জামও কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে সিভিল এভিয়েশন। নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করতে গতকাল বিকেলে যুক্তরাজ্য থেকে আসা নিরাপত্তা বিশ্লেষক ডেনিসও সুলেমান কার্গো ভিলেজ পরিদর্শন করেছেন এবং সিভিল এভিয়েশন ও বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও বৈঠক করেছে।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, আগে থেকেই শাহজালালে নিরাপত্তা ছিল। যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় নিরাপত্তার অজুহাত তোলায় নতুন করে নিরাপত্তা সাজানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে যৌথ বাহিনীর টহল শুরু হয়েছে। যেসব স্থানে নিরাপত্তার ঘাটতি আছে তা পর্যবেক্ষণ করে নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের উন্নয়ন দেখে একটি মহল সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা চক্রান্ত করছে। এটাও (নিষেধাজ্ঞা) ওই মহলের চক্রান্ত কি না তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘শাহজালালের নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি নেই। এর পরও অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আমরা হার্ডলাইনে যাচ্ছি। নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কিছুতেই দেশের সুনাম নষ্ট হতে দেওয়া হবে না। ’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অস্ট্রেলিয়ায় পর যুক্তরাজ্যও ঢাকা থেকে সরাসরি বিমানে পণ্য পরিবহনে নিষিধাজ্ঞা আরোপ করায় সরকারের হাইকমান্ড দফায় দফায় বৈঠক করে। তারা সিভিল এভিয়েশন ও বাংলাদেশ বিমানের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। শাহজালালে কোন কোন স্থানে নিরাপত্তার ঘাটতি আছে তা অনুসন্ধান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে নির্দেশনা পেয়ে কয়েক ধাপ নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। যেসব স্ক্যনিং মেশিনে সমস্যা আছে তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উন্নতমানের মেশিনসহ প্রায় ৯০ কোটি টাকার নিরাপত্তা সরঞ্জাম আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। স্ক্যানিং মেশিন পরিচালনার জন্য অন্তত এক ডজন প্রশিক্ষক ও পরামর্শক নিয়োগ এবং স্থায়ী জনবল বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সিভিল এভিয়েশন। এই নিয়ে গতকাল সকালে সিভিল এভিয়েশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেন।

এ প্রসঙ্গে সিভিল এভিয়েশনের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিমানবন্দরের স্ক্যানিং তল্লাশির সক্ষমতা বাড়ানোসহ যাত্রী ও কার্গোর নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার তা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশের স্ক্যানিং টেকনোলজির আলোকে আমরা সেদিকে যাচ্ছি। নিরাপত্তা আরো বাড়াতে তিন সেট এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (ইডিএস), ৮ সেট ডুয়েল ভিউ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন, ১৪ সেট ডুয়েল ভিউ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন ফর কেবিন উইথ ট্রে রিটার্ন সিস্টেম, ৯ সেট আন্ডার ভেহিকল স্ক্যানিং মেশিন ও ১৪ সেট এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডিটেক্টর (ইডিটি), ছয় সট লিকুইড এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম ও একটি ডাবল ক্যাব পিকআপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম শিগগির বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে। শাহজালালে কঠোর নিরাপত্তা দেওয়া হবে তাতে সন্দেহ নেই। নিরাপত্তার জন্য কিছু প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সামনে আরো নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।

গতকাল দুপুরে শাহজালালের কার্গো ভিলেজে দেখা যায়, প্রতিটি স্তরে কয়েক ধাপ নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। অনুমতি ছাড়া কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। স্ক্যনিং মেশিনগুলোর সামনে দুজন করে অপারেটর রাখা হয়েছে। একবারের জায়গায় দুই বার পরীক্ষা করে মালামাল উড়োজাহাজে তোলা হচ্ছে। শ্রমিকরা কাঁচামাল প্যাকেজিং করছে। রুহুল আমিন নামে এক শ্রমিক জানান, বাংলাদেশ বিমান ছাড়া সব কটি এয়ারলাইনসে করে লন্ডন ও অস্ট্রেলিয়ায় কাঁচামাল পাঠানো হচ্ছে। প্রতিটি কাঁচামাল কঠোরভাবে স্ক্যানিং ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় কার্গোতে করে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ বিমান বছরে ৮৪ কোটি টাকা আয় করে। সেই হিসেবে প্রতিদিনের আয় ২৩ লাখ টাকা। অথচ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় বিমান ২৩ লাখ টাকা গচ্চা দিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিমানের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, শাহজালালে নিরাপত্তার ঘাটতি নেই। কী কারণে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তা বুঝতে পারছি না। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। গতকাল বিকেলে যুক্তরাজ্য থেকে আসা নিরাপত্তা বিশ্লেষক ডেনিসও সুলেমান কার্গো ভিলেজ পরিদর্শন করেছেন। তিনি সিভিল এভিয়েশন ও বিমানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। স্ক্যানিং মেশিনগুলো পর্যালোচনা করেছেন। আগামী দুই দিন তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করবেন। দেশে ফিরে তিনি নিরাপত্তা নিয়ে রিপোর্ট দেবেন। গতকাল তাঁর পরিদর্শনের সময় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক : বিমানবন্দরের নিরপত্তাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা এবং ঢাকা থেকে সরাসরি যুক্তরাজ্যে কার্গো ফ্লাইটের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে গতকাল দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্রিটেনের হাইকমিশনার এলিসন ব্লাকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে নেতৃত্ব দেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। আরো উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহম্মেদ সিদ্দিকি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান, পররাষ্ট্রসচিব শহুদুল হক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব খোরশেদ আলম চৌধুরী, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম সানাউল হক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান, মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবুল হাসনাত জিয়াউল হক ও মন্ত্রীর একান্ত সচিব এ টি এম নাসির মিয়া।

সভায় নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়ন ও কার্গো কমপ্লেক্সকে ঢেলে সাজাতে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদল স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ প্রদান করে। এক প্রস্তাবের আলোকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এই কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী ২০ মার্চ এ কমিটির সঙ্গে একটি রিভিউ বৈঠক হবে।


মন্তব্য