kalerkantho


আসমা-রেশমাদের অন্য রকম যুদ্ধ

কাজী হাফিজ   

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আসমা-রেশমাদের অন্য রকম যুদ্ধ

১৯৭১ সালের ১৪ আগস্টকে সামনে রেখে হানাদার বাহিনী যখন পাকিস্তানের ২৪তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং একই সঙ্গে বাঙালি নিধনে ব্যস্ত, ঠিক তখন ঢাকার ১/৩ দিলু রোডের বাসায় রাত জেগে তিন বোন তৈরি করছিলেন একটার পর একটা বাংলাদেশের পতাকা। সবুজ লুঙ্গি, লালসালু আর হলুদ ছিট কাপড় সেই পতাকার উপকরণ।

সবুজের মাঝে লাল সূর্য—আর সেই সূর্যের মাঝে হলুদ মানচিত্র। উদ্দেশ্য, ১৪ আগস্টের সূচনালগ্নেই তাঁরা তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের সহযোগিতায় ঢাকায় উড়িয়ে দেবেন প্রিয় বাংলাদেশের পতাকা। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁরা তৈরি করেন প্রায় ২০০ পতাকা। বেলুনে বেঁধে ঢাকার আকাশে সেগুলো উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিছু পতাকা বিভিন্ন ভবনের শীর্ষেও গর্বের সঙ্গে উড়তে থাকে। ওই তিন বোনের নাম আসমা, রেশমা ও সায়মা। আসমা সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী। আর রেশমা মিউজিক কলেজের প্রথম আর ছায়ানটের পঞ্চম বর্ষে। ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের দুই দিন আগেও শহীদ মিনারে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে রেশমার ছিল সক্রিয় উপস্থিতি। সহশিল্পীদের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা জোগাতে গেয়েছেন, ‘বিপ্লবের রক্তরাঙা ঝাণ্ডা ওড়ে আকাশে’, ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’—এসব অমর সংগীত।

জুনের প্রথম সপ্তাহে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসিক গেরিলা অপারেশন শুরু হয়, তখন আসমা-রেশমাদের বাসার রান্নাঘরটি হয়ে ওঠে তাঁদের অন্যতম অস্ত্রাগার। তাঁদের ড্রইংরুম ছিল অপারেশন পরিকল্পনার অন্যতম স্থান। মুক্তিযোদ্ধা ভাই ও তাঁদের সহযোদ্ধাদের কাছে তাঁদের তখন জোর দাবি, ‘তোমরা যদি অস্ত্র হাতে লড়তে পারো তাহলে আমরা কেন পারব না?’

তাঁদের নাছোড় দাবির মুখে বাড়িতেই শুরু হয় অস্ত্রের প্রশিক্ষণ। কিন্তু এক সময় বিপর্যয় ঘটে। অস্ত্রভাণ্ডারের খবর জেনে যায় হানাদার বাহিনী। ২৯ আগস্ট রাতে তাঁদের বাসায় তাণ্ডব চালায় হানাদাররা। বাধ্য হয়েই রাত না পোহাতেই দুই বোন তাঁদের বাবাকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ি জমান ভারতের আগরতলায়। ছোট বোন সায়মাকে রেখে যান মায়ের কাছে।

এরপর দেশের স্বাধীনতার জন্য শুরু হয় তাঁদের অন্যরকম এক যুদ্ধ। গ্রেনেড, রাইফেল, এক্সপ্লোসিভ নয়—তাঁরা হাতে তুলে নেন সেবার সরঞ্জাম। নিয়োজিত হন যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্থ করে তুলে তাঁদের নৈতিক ও মানসিক সমর্থন জুগিয়ে মনোবল চাঙ্গা করে আবারও রণক্ষেত্রে পাঠানোর মহৎ দায়িত্বে।

আগরতলার বিশ্রামগঞ্জে বিখ্যাত সেই ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল’-এ ঠিকানা হয় তাঁদের। তাঁদের সঙ্গে সেখানে ঢাকার বকশীবাজারের ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষিকা জাকিয়া খাতুন, বেগম সুফিয়া কামালের দুই মেয়ে সুলতানা কামাল ও সাঈদা কামাল, বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী মিনু হক, মেজর আখতারের স্ত্রী খুকু আহমেদ, মেজর হায়দারের বোন ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম বীরপ্রতীক, ডা. ডালিয়া সালাউদ্দিন, অনুপমা দেবনাথ, কেকা করিম, পদ্মা, নিলীমাসহ বাংলাদেশের আরো অনেক সাহসী নারী ওই গর্বিত দায়িত্ব পালন করেন।

রেশমা আমিন একাত্তরে তাঁদের ছায়ানটের অনুষ্ঠান, রাত জেগে পতাকা তৈরি ও অস্ত্র প্রশিক্ষণের বর্ণনাতে বলেন, “আমরা চার বোন এক ভাই। বড় বোন নাজমা আকবর তখন তাঁর নেভি অফিসার স্বামীর সঙ্গে খুলনায় থাকতেন। আব্বা-আম্মার সঙ্গে তখন আমরা তিন বোন—আসমা, আমি আর সবার ছোট সায়মা বাসায় ছিলাম। আমাদের একমাত্র ভাই হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক তখন পুরোপুরি যোদ্ধা। কখনো ঢাকায় অপারেশনে কখনো আগরতলায়। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে নানার বাড়ির কেউ বাসায় ভাইয়ের খোঁজ করলে বলতাম, সে দাদার বাড়িতে। আবার দাদার বাড়ি থেকে কেউ এলে বলতাম, সে নানার বাড়িতে। আমাদের আব্বা ইঞ্জিনিয়ার হাফিজুল আলম নিজেই রান্নাঘরে ওদের অস্ত্র রাখার বড় হাউসটি তৈরি করে দিয়েছিলেন। যেদিন বাসায় রেইড হয় তার কয়েক দিন আগে আমাদের বড় বোনও খুলনা থেকে এসেছিলেন। বাসায় অস্ত্রের মধ্যে এলএমজি, এসএমজি, চাইনিজ কারবাইন, ৩০৩ রাইফেল, ৩০ কেজির মতো এক্সপ্লোসিভ এবং বেশ কয়েকটি মিনি মাইনও ছিল। সন্ধ্যার দিকেই একজন মুক্তিযোদ্ধা আমাদের এই মর্মে সতর্ক করে দেন, তাঁদের একজন ধরা পড়েছে। তাঁকে পাকিস্তানি আর্মি মুখ খুলতে বাধ্য করাতে পারে। এর কিছুক্ষণ পরই মগবাজারে আজাদদের বাসায় রেইড হয়। সেখানে পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে ফাইট করে প্রায় কাপড়-চোপড়বিহীন অবস্থায় আমাদের বাসায় চলে আসেন কাজী কামাল বীরবিক্রম। এসেই পাগলের মতো বলতে থাকেন, ‘আমার অস্ত্র দরকার। ওদের সঙ্গে আমি লড়ব। ’ আমার মা তাঁকে বুঝিয়ে শান্ত করেন এবং দ্রুত নিরাপদ কোনো স্থানে চলে যেতে বলেন। কাজী কামাল চলে যাওয়ার পরপরই আমাদের বাড়ির গেটে পৌঁছে যায় আর্মির কনভয়। ওরা এসেই জিজ্ঞেস করে, ‘বাবুর্চিখানা কিধার?’ আমরা বুঝতে পারি, সব তথ্য ওদের জানা হয়ে গেছে। আব্বাকে এর আগেই পাশের একটি বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওরা রান্নাঘর থেকে ওই সব অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের পর আমাদের ফুপা ও ফুপাতো ভাইকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর ভোররাতেই আব্বার সঙ্গে আমি আর আসমা আগরতলার উদ্দেশে রওনা হয়ে যাই। ”

সেবিকা জীবন সম্পর্কে রেশমা স্মৃতিচারণায় বলেন, ‘আমরা প্রথমে আগরতলার জিপি হাসপাতালে ডা. সুজিত দের বাসায় উঠি। আমাদের পৌঁছার সংবাদ শুনে সেখানে খালেদ মোশাররফ আসেন। পাকিস্তানি আর্মির রেইডে ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষয়ক্ষতি, কাদের ধরে নিয়ে গেছে—সেসব সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানতে চান। এরপর ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্রামগঞ্জে পাঠানো হয় আমাদের দুই বোনকে। প্রথম দিনই দেখি গুরুতরভাবে জখম একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সেখানে চিকিত্সার জন্য আনা হয়েছে। ইলেকট্রিসিটি নেই। হারিকেন ও হ্যাজাক বাতি জ্বালিয়ে চলছে অপারেশন। আমাদের নার্সিং ট্রেনিং ছিল না। পাটোয়ারী নামে সেনাবাহিনীর একজন মেডিক্যাল অ্যাসিসট্যান্ট আমাদের ইনজেকশন পুশ করা, ব্লাড প্রেসার মাপা, জ্বর মাপা, জ্বরের চার্ট তৈরি, ড্রেসিং—ইত্যাদি শিখিয়ে দেন। আমরা যখন যাই তখন ওই হাসপাতাল ছিল ৫০ বেডের। পরে তা ২০০ বেডে উন্নীত করতে হয়। ’

রেশমা বলেন, ‘আমার যদ্দুর স্মরণ আছে, মেজর ডা. আখতার, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. মবিন চৌধুরী—এরাই বাংলাদেশ হাসপাতাল চালু করেন। সেখানে আরো ছিলেন, ডা. মোরশেদ চৌধুরী, ডা. সামসুদ্দীন, ডা. ফারুক, কর্নেল ডা. কাশেম, ডা. নাজিম, ব্রি. জে. মালেক—এঁরা। ’

‘হাসপাতালে প্রতিদিনই রণাঙ্গন থেকে আহত ও বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সেখানে ভর্তি করা হতো। এঁদের শুশ্রূষার পাশাপাশি নৈতিক ও মানসিক সমর্থন জুগিয়ে আবারও রণাঙ্গনে পাঠানোর দায়িত্বও পালন করতাম আমরা। ’

রেশমা আরো বলেন, ‘এই মুহূর্তে ফরিদপুরের একটি ছেলের কথা মনে পড়ছে। ১৩-১৪ বছর বয়স। পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে যুদ্ধে তার পায়ে গুলি লাগে। ১৫ দিন হাসপাতালে থাকার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে সে আবার ক্যাম্পে ফিরে যায়। কিন্তু কদিন পরই শুনি স্টেনগান পরিষ্কার করার সময় অসাবধানতাবশত গুলিবিদ্ধ হয়ে ছেলেটির মৃত্যু হয়। তার স্টেনগান ভুলক্রমে আনলক ছিল। বিষয়টি সে লক্ষ করেনি। কেবল ওই ছেলেটিই নয়, তার মতো অনেককেই সেই সময় আমরা হাতে অস্ত্র তুলে নিতে দেখেছি। ’


মন্তব্য