kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাংলাদেশি ১৫ লাখ শ্রমিক নিয়োগ আটকে গেল

মালয়েশিয়া আর বিদেশি শ্রমিক নেবে না

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশি ১৫ লাখ শ্রমিক নিয়োগ আটকে গেল

বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভা। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদিকে উদ্ধৃত করে দ্য স্টার অব মালয়েশিয়া পত্রিকার অনলাইনে গতকাল শনিবার বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ স্থগিতের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

এর ফলে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগের চুক্তি হলেও তা আটকে গেল। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ শ্রমিক নিতে সমঝোতা স্মারকে সই করে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। এর পরদিন বিদেশি শ্রমিক নেওয়া স্থগিতের ঘোষণা দেয় মালয়েশিয়া সরকার। তবে দেশটি বিদেশি শ্রমিক নেওয়া স্থগিত করলেও চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশি নতুন শ্রমিকদের যাওয়ার বিষয়ে ঢাকার কর্মকর্তারা বরাবরই আশাবাদী ছিলেন।

আহমদ জাহিদ হামিদিকে উদ্ধৃত করে দ্য স্টার অব মালয়েশিয়া অনলাইনে  জানানো হয়, ‘এর ফলে বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ শ্রমিক নিয়োগের প্রক্রিয়াও আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত হয়ে গেছে। ’ গতকাল আহমেদ জাহিদ হামিদি আরো বলেন, ‘যেসব শ্রমিকের ওয়ার্ক পারমিট (কাজের অনুমতি) নেই বা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, তাদের ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করতে হবে। চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ’ প্রসঙ্গত, এর আগে গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ওয়ার্ক পারমিটের বৈধতার জন্য বিদেশি শ্রমিকদের সময় বেঁধে দেয় দেশটি। তবে শ্রমিকরা বরাবরই বিষয়টিকে এড়িয়ে চলেছে। এর ফলে দ্বিতীয়বারের মতো সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

নতুন করে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ না করার ব্যাপারে মালয়েশিয়ার সরকার যে সমালোচনা ও চাপের মুখে পড়েছে এর জবাবে জাহিদ হামিদি বলেন, ‘যারা কর্মী নিয়োগ করতে পারছে না, তারা স্থানীয় কর্মী নিয়োগে মালয়েশিয়ান এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, ফেডারেশন অব মালয়েশিয়ান ম্যানুফ্যাকচারার্স ও মালয়েশিয়ান ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ’ তবে সে দেশে যারা শ্রমিক নিয়োগ করতে চায় তারা সেখানে অবৈধভাবে বসবাসরতদের নিয়োগ দিতে পারবে। পাশাপাশি বিদেশি শ্রমিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি লেভি আরোপের নিয়মও এ সময় স্থগিত থাকবে বলে জানান জাহিদ হামিদি। কারণ মালয়েশিয়ার বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে এ বিষয়টি নিয়েই আপত্তি তোলা হাচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার। বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ বাংলাদেশি দেশটিতে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সালে ‘জি টু জি’ পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নিতে শুরু করে মালয়েশিয়া। সে অনুযায়ী শুধু সরকারিভাবে মালয়েশিয়ার  ‘প্লান্টেশন’ খাতে শ্রমিক পাঠানো হচ্ছিল। কিন্তু ‘প্লান্টেশন’ খাতে কাজ করতে আগ্রহীর সংখ্যা কম হওয়ায় ওই উদ্যোগে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। পরে মালয়েশিয়ার জনশক্তির জন্য বাংলাদেশ ‘সোর্স কান্ট্রির’ তালিকায় এলে সেবা, উৎপাদন, নির্মাণসহ পাঁচটি খাতে কাজের জন্য বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ কর্মী নিতে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করে মালয়েশিয়া।

তবে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে ঢাকা-কুয়ালালামপুর সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশিসহ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ কর্মী মালয়েশিয়ায় যাওয়ার যে সম্ভাবনার কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, তা মুখ থুবড়ে পড়ে।

এ বিষয়ে জানতে কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে গতকাল মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি আমরা টেলিভিশনের শিরোনাম দেখে জানতে পেরেছি। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় এখনো কোনো কিছুই জানে না। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী বর্তমানে চট্টগ্রামে রয়েছেন। সেখান থেকে ঢাকায় আসার পর বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারেন, তবে এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি এক প্রকার স্থগিত হয়ে গেছে। গতকাল দেশটির সংসদে আলোচনার কারণে বিষয়টি আবার উঠে এসেছে, এর বেশি কিছু নয়। ’

মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বেসরকারি জনশক্তি রপ্তানি খাতের নেতারা। জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) প্রেসিডেন্ট মো. আবুল বাশার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে পাঁচ লাখের মতো কর্মী বিদেশে যাচ্ছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশে যাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় খুব কম শ্রমিকই যায়। তাই মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। তবে সরকারকে অন্যান্য দেশে আরো বেশি কর্মী প্রেরণে উদ্যোগ নিতে হবে। এতে মালয়েশিয়ার প্রভাব অনেকাংশে কমানো যাবে। ’

মালয়েশিয়া থেকে সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আসার আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত নয় বলে মনে করেন সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আলী হায়দার চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে এ বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। আশা করি দুই দেশের সরকার বিষয়টি সুরাহা করবে। তবে চুক্তি বাতিল বা বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা হবে খুবই দুঃখজনক। ’

মালয়েশিয়া সরকারের অবস্থান তাঁদের কাছে এখনো স্পষ্ট নয় জানিয়ে বায়রার এ নেতা বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে যারা জনশক্তি আমদানির সঙ্গে জড়িত, তারাও বিভ্রান্তিতে পড়েছে। আমাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলাপে তারা জানিয়েছে, সরকারের এ সিদ্ধান্ত তারাও বুঝতে পারছেন না। ’ 

জনশক্তি খাতের বিশেষজ্ঞ ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘সরকারকে শুধু গণমাধ্যমের খবরের ওপর নির্ভর করলে হবে না। একটি দেশের সঙ্গে অন্য দেশের চুক্তি কোনো সহজ বিষয় নয়। এখানে দ্বিপক্ষীয় সুসম্পর্কের একটি ব্যাপার রয়েছে। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নিশ্চিত হতে হবে। ’


মন্তব্য