kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মানচিত্রের ওপারে কবি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মানচিত্রের ওপারে কবি

‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব’—জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষাকে উদ্বেলিত করা অজস্র কবিতার স্রষ্টা কবি রফিক আজাদ অবশেষে চলে গেলেন মানচিত্রহীন কোনো দেশে। গতকাল শনিবার দুপুর আড়াইটায় বাঙালি জাতিসত্তার মহান এ সাহিত্যিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ বহু আত্মীয়স্বজন ও ভক্ত-অনুরাগী রেখে গেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত এই কবির মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। একনজর দেখার জন্য হাসপাতালে ছুটে যান শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর গভীর শোক প্রকাশ করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।

বিএসএমএমইউয়ে উপস্থিত জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কবি তারিক সুজাত জানান, সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আগামীকাল সোমবার কবির মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। সকাল ১০টায় মরদেহ নেওয়া হবে শহীদ মিনারে। সেখান থেকে বাংলা একাডেমিতে নেওয়া হবে। জোহরের নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা হবে। এরপর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে কবিকে সমাহিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

কবিপত্নী রাজধানীর তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ দিলারা হাফিজ বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হোক, আমরা শুধু এটাই চাই। ’ পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কবি রফিক আজাদের দুই ছেলে অভিন্ন আজাদ ও অব্যয় আজাদ কানাডায় থাকেন। তাঁরা বাবাকে দেখতে দেশে এসেছিলেন। অভিন্ন আজাদ বাবাকে দেখে ১০ মার্চ কানাডা চলে যান। তাঁরা দেশে আসার পর দাফন সম্পন্ন হবে। কবির ভাইয়ের মেয়ে ড. নীরু সামসুন্নাহার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মরদেহ সোমবার পর্যন্ত বারডেমের হিমঘরে রাখা হবে। ’

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবি রফিক আজাদ গত ১৪ জানুয়ারি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত রোগে আক্রান্ত হন। এর আগে থেকে তিনি হৃদযন্ত্র, ডায়াবেটিস, কিডনি ও ফুসফুস-সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছিলেন। পরে তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে আরেকটি বেসরকারি হাসপাতাল হয়ে তাঁকে পুনরায় আনা হয় বিএসএমএমইউতে। এরপর এই হাসপাতালেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ছিলেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল মজিদ ভূইয়া জানান, উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় বিদেশে নিয়ে যাওয়ার মতামত দিয়েছিল বিশেষজ্ঞ টিম। কিন্তু কবির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।

গতকাল বিকেল ৩টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল হাসান খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বেদনার সঙ্গে জানাচ্ছি, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক আজাদ চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর ২টা ১৩ মিনিটে ইন্তেকাল করেছেন। তিনি আমাদের এখানে ৫৮ দিন ছিলেন। অনেক রোগে ভুগছিলেন তিনি। সর্বশেষ তাঁর স্ট্রোক হয়। ’

এদিকে প্রিয় কবির মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে ভিড় জমায় দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি সৈয়দ শামসুল হক, কবি আসাদ চৌধুরী, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, আনোয়ারা সৈয়দ হক, কাদের সিদ্দিকী, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কবি নাসির আহমেদ, কবি তারিক সুজাতসহ নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষ।

একাত্তরে টাঙ্গাইলে আবদুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কাদেরিয়া বাহিনীর হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এই কবি। সহযোদ্ধাকে হারিয়ে বিহ্বল কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘আমার সঙ্গে রণাঙ্গনে ছিলেন রফিক আজাদ। বহুজন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেলেও তিনি যাননি, রণাঙ্গনেই ছিলেন। ’

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘রফিক আজাদ আমাদের যৌবনের কবি। আমরা যখন যুদ্ধে গিয়েছি তখনো তিনি কবি, যখন ফিরে এসেছি তখনো তিনি কবি। আমৃত্যু তিনি মুক্তিযোদ্ধা। ’

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘কবি রফিক আজাদ শুধু লেখালেখির কারণে নয়, চাকরির সূত্রেও বাংলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর ছন্দের গাঁথুনি ছিল অসাধারণ, গল্পকথক হিসেবেও ছিলেন অনন্য। ’

কবির মরদেহ গোসল করানোর সময় আহাজারি করছিলেন কবিপত্নী দিলারা হাফিজ। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমি যাব কোথায়? কিভাবে বাঁচব?’ এ সময় তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন কবি সৈয়দ শামসুল হকসহ অন্যরা। পিতৃবিয়োগে শোকাহত অব্যয় আজাদ বলেন, ‘বাবা বলতেন, তাঁর কোনো খেদ নেই। তিনি কোনো আক্ষেপ রেখে যাননি। আমাদেরও কোনো আক্ষেপ নেই। ’

রাষ্ট্রপতির শোক : রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ কবি রফিক আজাদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক শোক বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘রফিক আজাদের মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনের যে ক্ষতি হলো তা পূরণ হওয়ার নয়। বাংলা কবিতার জগতে রফিক আজাদের অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে। ’

প্রধানমন্ত্রীর শোক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথিতযশা কবি ও মুক্তিযোদ্ধা কবি রফিক আজাদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক শোক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।

স্পিকারের শোক : স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী কবি রফিক আজাদের মৃতুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘কবি রফিক আজাদ ছিলেন দেশের একজন বরেণ্য কবি ও বীর মুক্তযোদ্ধা। তিনি মানবতার কবি। আজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। ’

এ ছাড়া সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন পৃথক পৃথক বার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে।

১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার ঘুনি গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম কবি রফিক আজাদের। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে শুরু করেছিলেন শিক্ষকতা। এরপর বাংলা একাডেমিতে যোগ দিয়ে একাডেমি প্রকাশিত পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে ১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সাপ্তাহিক ‘রোববার’ সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন তিনি। কাজ করেছেন বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন, উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে।

সারা জীবন শুধুই কবিতা লিখেছেন তিনি। কিন্তু শেষ বয়সে লিখেছিলেন আত্মজৈবনিক গদ্যরচনা ‘কোনো খেদ নেই’। বইটির পরতে পরতে যাপিত জীবন নিয়ে নির্মল ও নির্মোহ সত্য উচ্চারণ করে কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন—তাঁর কোনো খেদ নেই, আক্ষেপও নেই। আজন্ম যোদ্ধা ছিলেন তিনি।

রফিক আজাদের জনপ্রিয় অনেক কবিতার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ‘ভাত দে হারামজাদা’। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে তাঁর এ কবিতা। এই কবিতার জন্য তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতার বিরাগভাজন হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবির ‘স্বাধীনতা’য় হস্তক্ষেপ করেননি বলে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন রফিক আজাদ।

রফিক আজাদের প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে অসম্ভবের পায়ে (১৯৭৩), সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে (১৯৭৪), নির্বাচিত কবিতা (১৯৭৫), চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া (১৯৭৭), পাগলা গারদ থেকে প্রেমিকার চিঠি, প্রেমের কবিতাসমগ্র, বর্ষণে আনন্দে যাও মানুষের কাছে, বিরিশিরি পর্ব, রফিক আজাদের শ্রেষ্ঠ কবিতা, রফিক আজাদ কবিতাসমগ্র, হৃদয়ের কী বা দোষ, কোনো খেদ নেই, প্রিয় শাড়িগুলো প্রভৃতি।

কবি রফিক আজাদ ভাষা ও সাহিত্যকর্মে অবদানের জন্য ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ২০১৩ সালে একুশে পদক অর্জন করেন। এ ছাড়া হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৭), কবিতালাপ পুরস্কার (১৯৭৯), আলাওল পুরস্কার (১৯৮১), ব্যাংক পুরস্কার (১৯৮২), সুহৃদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৯), কবি আহসান হাবীব পুরস্কার (১৯৯১), কবি হাসান হাফিজুর রহমান পুরস্কার (১৯৯৬) এবং ১৯৯৭ সালে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা লাভ করেন।


মন্তব্য