চৌগাছার হাতাহাতি যুদ্ধ-334982 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


চৌগাছার হাতাহাতি যুদ্ধ

ফখরে আলম, যশোর   

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চৌগাছার হাতাহাতি যুদ্ধ

একাত্তরের ২১ ও ২২ নভেম্বর চৌগাছার জগন্নাথপুর গরীবপুর রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সম্মুখযুদ্ধের একপর্যায়ে ‘হাতাহাতি যুদ্ধ’ হয়েছিল। এই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পাকিস্তানি সেনারা যশোর সেনানিবাসে  এসে আশ্রয় নেয়। একপর্যায়ে ৬ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে তারা সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যায়। ওই দিনই যশোর শত্রুমুক্ত হয়। এরপর একে একে আরো অনেক এলাকা মুক্ত করে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে যৌথ বাহিনী। স্বাধীনতার পর জগন্নাথপুরের নামকরণ হয় মুক্তিনগর। এই মুক্তিনগর রণাঙ্গন দেখতে আসে বিভিন্ন দেশের সেনা কর্মকর্তা ছাড়াও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

যশোর-চৌগাছা সড়কের মশিয়ারনগর মোড়ে গেলে চোখে পড়ে তীর চিহ্নিত একটি স্থায়ী সাইনবোর্ড। তাতে লেখা, ‘এই দিকে মুক্তিনগর যুদ্ধক্ষেত্র’। পাশে আরেকটি সাদা পাথরে খোদাই করে লেখা রয়েছে, ‘স্বাধীনতার যুদ্ধক্ষেত্র’। রাস্তাটির নাম ‘স্বাধীনতা সড়ক’। এই রাস্তা ধরে দেড় কিলোমিটার এগোলেই ‘মুক্তিনগর শহীদ সরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়’। বিদ্যালয় মাঠের এক পাশে লাল ইটের গাঁথুনির ভেতর সাদা পাথরের স্তম্ভে লেখা, ‘বাংলার রণক্ষেত্র ১৯৭১’। দুই পাশের দুটি পাথরে উত্কীর্ণ রয়েছে কবি শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবিতাটি। সামনে সেই ঐতিহাসিক রণাঙ্গন জগন্নাথপুর গ্রামের বিরাট মাঠ। মুক্তিনগর শহীদ সরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাচিনুর রহমানসহ কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১০ কিলোমিটার দূরে বয়রা সীমান্তে কপোতাক্ষ নদ পার হয়ে মিত্রবাহিনী জগন্নাথপুরে এসেছিল। এখানে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মিত্রবাহিনী লড়েছিল বিমান, ট্যাংক, কামান ও মেশিনগানের সাহায্যে। এই রণাঙ্গনে মিত্রবাহিনী হানাদার বাহিনীর তিনটি স্যাবার জেট বিমান ও ১৩টি চীনা স্যাফে ট্যাংক ধ্বংস করে দিয়েছিল। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের গুলি-গোলা ফুরিয়ে গেলে স্কুল মাঠে শুরু হয় হাতাহাতি। জগন্নাথপুর ছাড়াও গরীবপুর, জাহাঙ্গীরপুর, পাশাপোল, দশপাখিয়া, বুড়িন্দিয়া, বাড়িয়ালী গ্রামেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামবাসী দা, শাবল, কোদাল, বাঁশের লাঠি নিয়ে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি সেনাদের ওপর। বাড়ির বউ-ঝিরা ওদের ঝাঁটাপেটাও করে। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের কয়েক শ সেনা মারা যায়। কলকাতা থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গ্রন্থ ‘বাংলা নামে দেশ’-এ এই যুদ্ধ সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ‘পাকিস্তানি সৈন্যদের সাতটি ট্যাংক ধ্বংস হয়। পাকিস্তানিরা জঙ্গিবিমান নিয়ে আসে। দুটি জঙ্গিবিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। বন্দি করা হয় দুই পাইলটকে। তিনটি স্যাফে ট্যাংক আটক করা হয়। যুদ্ধে ৭৬ জন পাকিস্তানি সৈন্য মারা যায়।’

যুদ্ধের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান চৌগাছা রণাঙ্গন। স্বাধীনতার পর থেকে দেশ-বিদেশের সামরিক-বেসামরিক বিভিন্ন ব্যক্তি এই রণাঙ্গন দেখতে আসেন। ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী এই রণাঙ্গন পরিদর্শন করেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘আমি এই মাঠে যুদ্ধ করেছি। আর আমাদের স্যার নবম ডিভিশনের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল দলবীর সিং একাত্তরে বয়রা সীমান্ত দিয়ে এসে ঝিকরগাছার পথ ধরে যশোর শহরে পৌঁছেন। আমি এই যুদ্ধের কথা কোনো দিন ভুলব না।’

গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি লিয়াকত আলী সেদিনের যুদ্ধ সম্পর্কে বলেন, ‘ভারতীয় সৈন্যরা বিমান হামলা চালিয়ে এখানে খান সেনাদের দুটি ট্যাংক ধ্বংস করে দেয়। ট্যাংক দুটি অনেক দিন এখানেই পড়ে ছিল। আমি কত ওই ট্যাংকে উঠে খেলা করেছি। স্বাধীনতা সড়ক ধরেই সীমান্ত পার হয়ে ভারতীয় সৈন্যরা এই দেশকে স্বাধীন করার জন্য এসেছিল। এই পথ ধরে হেঁটে, খচ্চর ও জিপ গাড়ি চেপে মিত্রবাহিনী আর মুক্তিযোদ্ধারা সামনে এগিয়ে গিয়ে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে। বাংলাদেশে এমন যুদ্ধ আর অন্য কোথাও হয়নি।’

মন্তব্য