খুলনার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ-334636 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


খুলনার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



খুলনার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পরই খুলনায় ছাত্রলীগের কর্মীরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তারা বুঝতে পারে যুদ্ধ অনিবার্য। এ ছাড়া পাকিস্তানিদের হটানো যাবে না। যুদ্ধ করেই দেশ স্বাধীন করতে হবে।

২৫ মার্চের কালরাতের নারকীয় হামলার কথা জানার পর খুলনায় শেখ কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আক্রমণ করে। ২৬ মার্চ ছয়-সাতজনের একটি দল খুলনা সার্কিট হাউসে ও ইউনাইটেড ক্লাবে পাকিস্তানি সেনা অবস্থানে ঝটিকা হামলা চালায়। তাদের মধ্যে সিরাজুল আলম খানের অনুসারী বেশি ছিল। ৩ মার্চ শহরের বন্দুকের দোকান থেকে লুট করে নেওয়া অস্ত্র ছিল তাদের হাতিয়ার। ঝটিকা আক্রমণে পাকিস্তানি সেনাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি; তবে তারা হকচকিত হয়ে পড়ে।

প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বুঝতে পেরে পাকিস্তানিরা আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ছাত্র-যুবকদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। যেখানে-সেখানে ছাত্র-যুবকদের ধাওয়া করা, মারধর করা, ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়।

এই পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার জন্য অনুসারীদের নিয়ে রূপসা নদীর ওপারে গিয়ে অবস্থান নেন কামরুজ্জামান টুকু। পরিত্যক্ত ভবন ‘জাহানারা মঞ্জিল’-এ ক্যাম্প গড়ে তোলে তাঁর দল। সেখানে বসে মুক্তিসেনাদের রিক্রুট করা এবং অস্ত্র, গোলাবারুদ জোগাড় শুরু করেন তাঁরা। ওই সময় টুকুর সঙ্গে পরিচয় হয় মেজর জলিলের। তিনি বরিশাল থেকে বিদ্রোহ করে বাগেরহাটে আসেন। সেনাবাহিনীর একজন মেজরের সঙ্গে পরিচয়ের পর তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত আক্রমণের পরিকল্পনা করতে থাকেন, তাঁরা সুযোগ খুঁজতে থাকেন।

মেজর জলিলের পরামর্শে খুলনার এই মুক্তিপাগল তরুণ-যুবকরা খুলনা বেতার কেন্দ্র দখলের সিদ্ধান্ত নেন। তরুণদের দলে যোগ দেন সেনাবাহিনী থেকে সদ্য অবসর নেওয়া সুবেদার মেজর জয়নুল আবেদীন। সংগত কারণেই দলটির মনোবল বেড়ে যায়।

এরই মধ্যে ওই দলে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়ে ১৬০-এ দাঁড়ায়। তাঁদের নিয়ে আক্রমণের ছক কষা হয়। সুবেদার মেজর জয়নুল আবেদীন কমান্ডার মনোনীত হন, আর শেখ কামরুজ্জামান টুকু সমন্বয়কারী। রেডিও সেন্টারে আক্রমণের জন্য মনোনীত দলের অধিনায়ক হন সেনাবাহিনীর নায়েক সিদ্দিক। পুরো দলে দুজন সেনা সদস্য ও কয়েকজন আনসার সদস্য ছিলেন, বাকিরা সবাই সাধারণ তরুণ-যুবক। ৩ এপ্রিল রূপসা নদী পাড়ি দিয়ে গল্লামারীতে এসে বেতার কেন্দ্রে আক্রমণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। ওই অভিযানই খুলনার প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধ।

ওই বেতার কেন্দ্র এখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের অংশ। বিশ্ববিদ্যালয় চালু হওয়ার পর ভবনটি সংস্কার করা হয়। একাত্তরে এটি ছিল একতলা ভবন, এখন দোতলা। পাকিস্তানি সেনাদের নির্মমতা, হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী এই ভবন।

মুক্তিযোদ্ধারা ভেবেছিলেন, বেতার কেন্দ্র দখল করে স্বাধীনতার ঘোষণা ছড়িয়ে দিলে মন্দ হয় না। মেজর জলিলের নির্দেশনা তরুণদের উজ্জীবিত করে। ১৬০ জনের দলটিকে কয়েকটি উপদলে ভাগ করে লক্ষ্য পূরণের জন্য নিয়োজিত করা হয়।

দুটি উপদলকে নিয়োজিত করা হয় লক্ষ্যস্থলে (বেতার কেন্দ্র) আক্রমণের জন্য। একটি উপদলকে কিলোমিটার দেড়েক আগে বেতার কেন্দ্রে যাওয়ার প্রধান সড়কে (সেখানে এখন সিটি কলেজের ছাত্রাবাস) মোতায়েন করা হয়। তাদের মূল দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রের উদ্দেশে পাকিস্তানি সেনারা এগোলে তাদের প্রতিহত করা। এটির নেতৃত্বে ছিলেন সুবেদার মেজর জয়নুল আবেদীন। সাহায্যকারী আরো কয়েকটি উপদল ছিল।

কামরুজ্জামান টুকু গোটা অভিযানের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রধান দায়িত্ব ছিল এলাকাবাসীকে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো, যাতে মুক্তিসেনাদের সমর্থন-সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ হয় তারা। সেদিন তিনি গল্লামারী ব্রিজের ওপর সঙ্গীদের নিয়ে অবস্থান নেন।

একাত্তরে গল্লামারীর চারদিকে ছিল ঝোপঝাড়, গাছপালা। ব্রিজের ওপারে ছিল ইট বিছানো রাস্তা। সেটি সোজা বেতার ভবনে গেছে। বেতার ভবনের দেড় একর জায়গা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছিল। ৩ এপ্রিল রাত ১১টার দিকে পরিকল্পনা মতো অগ্রবর্তী দুটি দল বেতার ভবনের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে গিয়ে অবস্থান নেয়। সেখানে প্রচুর পাকিস্তানি সেনা ছিল, তাদের সংখ্যা মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবনায় ছিল না। উপরন্তু তাদের কাছে ছিল ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ। আর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ছিল থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল। তবে তাঁদের মনোবল ছিল অসীম।

যুদ্ধ শুধু মনোবলের বিষয় নয়। যুদ্ধ হচ্ছে কৌশল, অস্ত্র ও যথাযথ প্রয়োগের সমন্বিত রূপ। এদিক দিয়ে সংগত কারণেই পাকিস্তানি সেনারা এগিয়ে ছিল।

সার্চলাইট দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা দেখতে পায়, কারা যেন বেতার কেন্দ্রের দিকে আসছে। শুরু হয় আক্রমণ। এ অবস্থার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। যাই হোক, বিষয়টি সামলে নিয়ে তাঁরাও পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেন। মুক্তিযোদ্ধা হাবিব কাঁটাতারের বেড়া টপকে ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি বুলেটবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর কয়েকবারের চেষ্টায় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা কাঁটাতারের বেড়া টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন। পাকিস্তানি সেনারা ভবনের ভেতর থেকে, ছাদ থেকে তাঁদের ওপর গুলি চালাতে থাকে। দুই পক্ষের মধ্যে একটানা গুলিবিনিময় হয় ভোর পর্যন্ত।

বেতার কেন্দ্র আক্রান্ত হয়েছে জানতে পেরে পাকিস্তানি সেনা কনভয় বেতার ভবনের দিকে রওনা হয়। পথে তারা সুবেদার মেজর জয়নুল আবেদীনের বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ২০ জনের দলটির সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের ঘণ্টা তিনেক মরণপণ লড়াই হয়। প্রবল আক্রমণের মুখে মুক্তিযোদ্ধাদের টিকে থাকা কঠিন ছিল। তবু হতোদ্যম হননি তাঁরা; বীরদর্পে লড়াই করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা পাকিস্তানি সেনাদের পরাস্ত করার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। বেতার কেন্দ্রের কাছে অবস্থান নেওয়া অগ্রবর্তী বাহিনী ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে, বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। আর জয়নুলের বাহিনীকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে বিপর্যস্ত করে তুলে পাকিস্তানিরা। কামরুজ্জামান টুকু দুই অবস্থানের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আর যোগাযোগ রাখতে পারেননি। ৪ এপ্রিলের সূর্য উঁকি দেওয়ার মুহূর্তে জয়নুল আবেদীন শহীদ হন। নেতাকে হারিয়ে সহযোদ্ধারা বিচ্ছিন্ন্ন হয়ে পড়েন।

জয়নুল বাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙে গেলে সেনা কনভয় দ্রুত বেতার কেন্দ্রের দিকে এগোতে থাকে। এ খবর পেয়ে কামরুজ্জামান টুকু অগ্রবর্তী বাহিনী এবং তাঁর বাহিনীকে পিছু হটার নির্দেশ দেন। ততক্ষণে বেতার কেন্দ্র এলাকায় শহীদ হয়েছেন হাবিব এবং মান্নান (আনসার সদস্য)। বিচ্ছিন্ন উপদলগুলো ফিরে যায় রূপসার ক্যাম্পে। ওই ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধাদের উপলব্ধি হয়, যুদ্ধজয়ের জন্য প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।

মন্তব্য