সরকারি ব্যাংকের ছায়া গ্রামীণে-334632 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৮ জিলহজ ১৪৩৭


সরকারি ব্যাংকের ছায়া গ্রামীণে

আবুল কাশেম   

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সরকারি ব্যাংকের ছায়া গ্রামীণে

সরকারের অন্যান্য ব্যাংকের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ছাপ পড়তে শুরু করেছে গ্রামীণ ব্যাংকে। এক বছরের ব্যবধানে কর ও সংস্থান-পরবর্তী মুনাফা তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। মূলধন ঘাটতি, কুঋণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিগত বছরের তুলনায় ব্যাংকটিতে প্রতারণা, জালজালিয়াতি ও তহবিল তছরুপের ঘটনা বেড়েছে, যা উদ্বেগজনক। সরকারের বেশির ভাগ ব্যাংকগুলোতে দুর্বলতার যে ভয়াবহ চিত্র রয়েছে, তার ছাপ পড়তে শুরু করেছে ক্ষুদ্রঋণের এ প্রতিষ্ঠানটিতেও। নোবেলজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের এসব রূপ ধরা পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে।

ব্যাংকটিতে দ্রুত প্রধান নির্বাহী (এমডি) পদে স্থায়ী নিয়োগের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রামীণ ব্যাংকের বিপুল আমানত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিদর্শন স্থিতি তারিখে সদস্য ও অসদস্যদের কাছ থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকা। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির আমানতের মধ্যে অসদস্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের স্বার্থহানির শঙ্কা প্রকাশ করেছে।

‘গ্রামীণ ব্যাংকের বিভিন্ন ধরনের আমানত গ্রহণ এবং এর ওপর লেনদেন অনেকটা বাণিজ্যিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের মতো হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিধিমালা ও সার্কুলারের আওতাবহির্ভূত থাকায় আমানতকারীর স্বার্থহানির সম্ভাবনা রয়েছে’—বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. মুহম্মদ ইউনূস ২০১১ সালে পদত্যাগের পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদটি ফাঁকা রয়েছে। গত বছর ফেব্রুয়ারি থেকে ঋণগ্রহীতা সদস্যদের ৯ পরিচালক পদও শূন্য। ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে পদত্যাগপত্র জমা দেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান খোন্দকার মোজাম্মেল হক। সরকার তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করলেও তখন থেকেই তিনি কোনো বোর্ডসভায় যান না। আর ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঋণগ্রহীতা সদস্যদের ৯ পরিচালকের পদ শূন্য হওয়ার পর থেকে কোনো ধরনের পর্ষদ সভা হয়নি গ্রামীণ ব্যাংকে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছর আগে যেসব সুপারিশ করেছিল, সেগুলোও বাস্তবায়ন হচ্ছে না পর্ষদ সভা না হওয়ার কারণে।

এমডি নিয়োগ ও পরিচালক নিয়োগ বিধিমালা নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা রয়েছে। এসব মামলা নিষ্পত্তি না হলে এমডি কিংবা পরিচালক—কোনোটাই নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয় বলে বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলম। তাঁরা বলেছেন, সরকার গ্রামীণ ব্যাংকে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করছে না। গ্রামীণ ব্যাংক নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী চলছে।

গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বিশদ পরিদর্শন শুরু করে। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্থিতিভিত্তিক ব্যাংকটির দুই হাজার ৫৫৪টি শাখার মধ্যে ১৪৪টি শাখার তথ্যের ভিত্তিতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক বছর আগের (২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর) স্থিতিভিত্তিক প্রতিবেদনের সঙ্গে নতুন প্রতিবেদনের তুলনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এই এক বছরে অনেক সূচকেই অবনতি ঘটেছে গ্রামীণ ব্যাংকের।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ২০১৪ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল ৪৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আগের বছর মুনাফার পরিমাণ ছিল ১৩৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির নিট মুনাফা কমেছে ৮৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। আগের বছরের তুলনায় ঋণ ও অগ্রিম খাতে অধিক পরিমাণে সংস্থান রাখা এবং আমানতের ওপর সুদ ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় বাড়ার কারণে ব্যাংকটির নিট মুনাফার পরিমাণ কমেছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।  এই এক বছরে গ্রামীণ ব্যাংকের বিদেশি ঋণ বা তহবিলের পরিমাণও কমেছে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরভিত্তিক হিসাবে এর পরিমাণ ছিল ১৪০ কোটি টাকা, যা পরের বছর ১৩৪ কোটিতে নেমে এসেছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা আয়ের তুলনায় ব্যয় কমানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে গ্রামীণ ব্যাংকের অবলোপন করা অনাদায়ী কুঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩৭৫ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গ্রামীণ ব্যাংকের কুঋণের পরিমাণ এক হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের (১০ হাজার ১৭৩ কোটি) ১৫.৫০ শতাংশ। আগের বছর একই সময়ে অবলোপন করা কুঋণের পরিমাণ ছিল এক হাজার ২০২ কোটি টাকা, যা ওই বছরের মোট ঋণ ও অগ্রিমের ১৩.২৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ‘এত বিপুল পরিমাণ ঋণকে অবলোপন করে কুঋণে স্থানান্তর ব্যাংকের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকে অনিয়মের ৪৫১টি ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত অর্থের পরিমাণ ২৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এখান থেকে আদায় হয়েছে পাঁচ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। বাকি ২১ কোটি সাত লাখ টাকা অনাদায়ী রয়েছে। আগের বছর একই সময়ে এ ধরনের ৪৬২টি ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থের পরিমাণ ছিল ২২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘আগের বছরের তুলনায় তহবিল তছরুপের সঙ্গে জড়িত অর্থের পরিমাণ বেড়েছে, যা উদ্বেগজনক।’

এক বছরের ব্যবধানে গ্রামীণ ব্যাংকের নিট ইন্টারেস্ট মার্জিন (নিম) কমে গেছে প্রায় ১ শতাংশ হারে। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকটির মোট সুদ আয় দুই হাজার ৭০৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা। একই সময়ে মোট সুদ ব্যয় এক হাজার ৫০০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, সুদ খাতে ব্যাংকটির নিট আয় হয়েছে এক হাজার ২০৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ওই সময় ব্যাংকটির উপার্জনক্ষম সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ২০১৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের নিম ছিল ৭.৬২ শতাংশ, যা পরের বছর কমে ৬.৬৩ শতাংশে নেমেছে।

২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনটি ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে গ্রামীণ ব্যাংকে পাঠানো হয়। প্রতিবেদন পাওয়ার দুই মাসের মধ্যে পর্ষদ সভা প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পাওয়ার পর ২০১৫ সালের ৫ এপ্রিল গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ১০৪তম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৩০ মার্চ গ্রামীণ ব্যাংক ওই পর্ষদ সভা স্থগিত করে। অদ্যাবধি এ-সংক্রান্ত কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।’

মন্তব্য