ফিলিপাইনে ছয় হ্যাকার শনাক্ত-334625 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১২ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৪ জিলহজ ১৪৩৭


ফিলিপাইনে ছয় হ্যাকার শনাক্ত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ফিলিপাইনে ছয় হ্যাকার শনাক্ত

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে জমা রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮১ মিলিয়ন ডলার ‘হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে’ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ছয়জনকে শনাক্ত করে তদন্তে নেমেছে ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি)। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধের নাম করে এঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই ডলারগুলো ফিলিপাইনে স্থানান্তর করা হয় বলে দেশটির দৈনিক ইনকোয়ারারের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এদিকে আলোচিত এ ঘটনার মধ্যেই জানা গেল, বিশ্বে সাইবার হামলার শিকার হওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ২০তম অবস্থানে আছে।

ফিলিপাইনে শনাক্ত ছয় ব্যক্তি হলেন—মাইকেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার লাগ্রোসাস, আলফ্রেড সান্তোস ভারজারা, এনরিকো তিয়োডোরো ভাসকুয়েজ, উইলিয়াম সো গো ও কাম সিন অং (কিম অং)। এঁদের মধ্যে পাঁচজনেরই অ্যাকাউন্ট রয়েছে ফিলিপাইনের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনে (আরসিবিসি)। ওই অ্যাকাউন্টগুলোতেই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলার ঢুকেছিল। এরপর ওই অর্থ তুলে নিয়ে ক্যাসিনোর মাধ্যমে হাতবদল করে ‘সাদা টাকা’ হিসেবে হংকংয়ে পাচার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও এর পক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ এখনো তদন্তকারীদের হাতে আসেনি।

ইনকোয়ারার জানিয়েছে, ফিলিপাইনের একটি আদালত ওই পাঁচ ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ ছয়জনের সংশ্লিষ্টতার সব অ্যাকাউন্ট ছয় মাসের জন্য জব্দ করার আদেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া উইলিয়াম সো গোর কম্পানি সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিংয়ের সব ব্যাংক হিসাবও জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কের বিরুদ্ধে মামলা করার উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতিমধ্যে মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মামলাটি নিউ ইয়র্কে করা হবে। এ জন্য আইনজীবী খোঁজা হচ্ছে। এ জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এ ঘটনা তদন্তে এফবিআইয়ের সহযোগিতা চাইবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় দেশের সংঘবদ্ধ চক্রের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অর্থ লোপাটের ঘটনাটি অনানুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), সিআইডি ও র‌্যাব। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার ডিবিসহ সিআইডি ও র‌্যাবের দুটি টিম বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে জমা রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের মোট ১০১ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার ‘হ্যাকড’ করে ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তর করা হয়। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় ২০ মিলিয়ন বা দুই কোটি ডলার আর ফিলিপাইনে যায় ৮১ মিলিয়ন বা আট কোটি ১০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক বুধবার দাবি করেছে, এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কায় যাওয়া দুই কোটি ডলার উদ্ধার করা গেছে। আর ফিলিপাইনের আট কোটি ১০ লাখ ডলার উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি যাওয়া অর্থের একাংশ শ্রীলঙ্কায় জব্দ করা হয়েছে—বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন দাবি অস্বীকার করেছেন লঙ্কান সরকারের এক কর্মকর্তা। তিনি বলছেন, এ ধরনের কোনো অর্থই শ্রীলঙ্কায় ঢোকেনি। গতকাল লঙ্কা বিজনেস অনলাইনের (এলবিও) একটি প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। শ্রীলঙ্কা সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এলবিওকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি অবগত হয়েছি। আমরা তা তদন্ত করছি।’ তিনি বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে ওই টাকা শ্রীলঙ্কায় প্রবেশ করেনি। তাই আমরা খুঁজে দেখছি কী ঘটেছে। এ মুহূর্তে এর চেয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো সম্ভব নয়।’

১০১ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়ার পরপরই হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের আরো ৮৭০ মিলিয়ন বা ৮৭ কোটি ডলার সরানোর চেষ্টা করেছিল, তবে তাতে সফল হয়নি। স্পেলিং (বানান) ভুলসহ কিছু কারণে এই অর্থ সরাতে হ্যাকাররা ব্যর্থ হয় বলে ইনকোয়ারারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফটের সংকেতলিপি (কোড) থেকে অর্থ স্থানান্তরের ৩৫টি পরামর্শ বা অ্যাডভাইস পাঠানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে। সেখান থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোট পাঁচটি পরামর্শ কার্যকর হয়েছিল। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেছেন, ঋণ পরিশোধের নামে ওই পরামর্শ বা অ্যাডভাইসগুলো পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম বন্ধের পর।

ইনকোয়ারারের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর ১৫ মে আরসিবিসিতে মার্কিন ডলারের ব্যাংক হিসাব চালু করেন সন্দেহভাজন ক্রুজ, লাগ্রোসাস ও ভাসকুয়েজ। প্রাথমিকভাবে তাঁরা সবাই ৫০০ ডলার করে জমা রাখেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে মিলিয়ন ডলার যাওয়ার আদেশের আগ পর্যন্ত ওই সব অ্যাকাউন্টে কোনো ধরনের লেনদেন হয়নি।

ইনকোয়ারার দাবি করছে, তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণ শোধের কথা বলে ৮১ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়। সন্দেহভাজন ভাসকুয়েজের অ্যাকাউন্টে ২৫ মিলিয়ন ডলার ঢুকেছিল কাঁচপুর, মেঘনা-গোমতী দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ প্রকল্পের জন্য জাইকার কাছ থেকে নেওয়া ঋণ শোধের কথা বলে। আইটি প্রফেশনাল লাগ্রোসাসের অ্যাকাউন্টে ৩০ মিলিয়ন ডলার নেওয়ার ক্ষেত্রেও জাইকার ঋণ শোধের কথা বলা হয়। এখানে দেখানো হয় ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রান্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প। একটি আইপিএফএফ প্রকল্পে কনসালট্যান্সি ফিস হিসেবে ক্রুসের অ্যাকাউন্টে নেওয়া হয় ছয় মিলিয়ন ডলার। আর ভেড়ামারা কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালট্যান্সি ফিস হিসেবে বাকি ১৯ মিলিয়ন ঢোকে ভারজারার অ্যাকাউন্টে।

ফিলিপাইনের আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ক্রুজ, লাগ্রোসাস, ভারজারা, ভাসকুয়েজ ও গো এমন কোনো আয়ের উৎস দেখাননি, যা তাঁদের অ্যাকাউন্টে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢোকার যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারে।

ইনকোয়ারার লিখেছে, ৮১ মিলিয়ন ডলারের বেশির ভাগই মুদ্রা বিনিময়কারী প্রতিষ্ঠান ফিলরেমের মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রা পেসোয় রূপান্তর করা হয়। তারপর এই অর্থ রিজল ব্যাংকের চীনা বংশোদ্ভূত এক ফিলিপিনো নাগরিকের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। তিনি ওই অর্থ তুলে নিয়ে যান দুটি ক্যাসিনোতে—সোলায়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো এবং সিটি অব ড্রিমস অ্যান্ড মাইডাসে।

ফিলিপাইনের আইন অনুযায়ী ক্যাসিনোতে জুয়ায় জেতা অর্থ থেকে নির্ধারিত ট্যাক্স দিলে তা বৈধ আয় বিবেচিত হয়। সেভাবে হাতবদলের পর ওই অর্থ ফিলিপাইন থেকে বাইরে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সেগুলো আবার বিদেশি মুদ্রায় রূপান্তর এবং অন্য কোনো দেশে যাওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

রিজল ব্যাংকের মাকাটি সিটির জুপিটার স্ট্রিট শাখায় খোলা পাঁচটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা সরানো হয় বলে ইনকোয়ারার জানিয়েছে। ব্যাংকের ওই শাখার প্রধান এখন তোপের মুখে রয়েছেন। এই অ্যাকাউন্টগুলো খোলার ক্ষেত্রে ‘তোমার গ্রাহককে ভালোভাবে জানো’ এই নীতি না মানার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

যে পাঁচ অ্যাকাউন্টে অর্থগুলো জমা হয় তার একটির মালিক সো গো দাবি করেছেন, তাঁর অজ্ঞাতসারে ওই হিসাব খোলা হয়েছে। তবে ব্যাংকের ওই শাখা ম্যানেজারের এক প্রতিনিধি ইনকোয়ারারকে বলেছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই ওই অ্যাকাউন্টগুলো কয়েক মাস আগে খোলা হয়েছিল। আগামী ১৪ মার্চ ফিলিপাইনের সিনেট কমিটিতে বিষয়টি শুনানিতে ওই ব্যাংক কর্মকর্তা বক্তব্য দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এএমএলসি ছাড়াও ফিলিপাইনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন এ ঘটনার তদন্ত করছে। তদন্তে নেমেছে ফিলিপাইনের অ্যামিউজমেন্ট ও গেমিং করপোরেশনও, যারা ক্যাসিনোর অনুমোদন দিয়ে থাকে। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ফায়ারআই তদন্তে সহায়তা করার কথা জানিয়েছে।

সাইবার আক্রমণে ২০তম বাংলাদেশ : বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার ব্লুমবার্গ নিউজের অনলাইনের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সাইবার অনিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে। সংস্থাটি সফটওয়্যার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কি ল্যাবের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে সাইবার হামলার শিকার হওয়া দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ২০তম অবস্থানে আছে।

মন্তব্য