৩৩ বছর পর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রীর-334274 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


৩৩ বছর পর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সফরে অনেক বার্তা

মেহেদী হাসান   

১০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল বিন আহমেদ আল জুবেইরের ঝটিকা সফরে ইতিবাচক অনেক বার্তা রয়েছে। গত মঙ্গলবারের আগে দেশটির কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৮৩ সালে। সেই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ এখন অনেক পরিণত ও সারা বিশ্বে পরিচিত। বৈশ্বিক নানা ইস্যুতে ঢাকা নেতৃত্ব দিচ্ছে। উদার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবেও পশ্চিমা বিশ্বে এ দেশের বিশেষ মূল্যায়ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, ৩৩ বছর পর সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে দেশটির কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বিশেষ করে বর্তমান সরকারের প্রতি সৌদি সরকারের আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

এ ছাড়া বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকসহ নানাভাবে সহযোগিতা করে আসা সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমনে উদ্যোগ নিয়েই তাতে এ দেশের সমর্থন ও সহযোগিতা চেয়েছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘ছাড় না দেওয়ার নীতি’ অনুসরণকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের জন্য এমন আশ্বাস দেওয়া কঠিন নয়। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিদেশে সেনা পাঠানোর ক্ষেত্রে নিজের নীতির কথা তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা বিদেশে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়। বিদেশে যুদ্ধ করতে সেনা না পাঠানোর নীতি রয়েছে বাংলাদেশের। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ৩৪ দেশীয় জোটে যোগ দিলেও ঢাকা তার নীতি বদলায়নি। বাংলাদেশের মতো আরো অনেক মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের এমন নীতি রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করার বাইরে আরো অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কাজ করার সুযোগ আছে। তারই আলোকে গত মঙ্গলবার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদবিরোধী লড়াইয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। প্রয়োজনে জাতিসংঘের উদ্যোগেই কেবল বাংলাদেশ সেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর দেশের উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ থেকে আরো কর্মী নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং তাঁদের প্রশিক্ষণের কথা বলেছেন। দুটিই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সৌদি আরব বিশ্বে বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। দেশটির সঙ্গে সম্পর্ককে ঢাকা বিশেষভাবে মূল্যায়ন করে। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রশ্নে সৌদি আরবের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে জল্পনা-কল্পনা থাকলেও রিয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো ঢাকার কাছে তা উত্থাপন করেনি। তা ছাড়া গত বছর অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম উইকিলিকসের ফাঁস করা সৌদি সরকারের নথি থেকে জানা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ঠেকাতে জামায়াত দেশটির হস্তক্ষেপ চেয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় সৌদি সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর দিকেই এ বিষয়ে নাক না গলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাই জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় ঘোষণার দিনেই সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের কোনো যোগসূত্র ছিল না। উইকিলিকসের নথিগুলো থেকে আরো জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপারসনের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে চিকিত্সার জন্য রাজকীয় খরচে থাইল্যান্ড থেকে সৌদি আরবে নিয়ে যেতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাঠানো অনুরোধ সৌদি সরকার ফিরিয়ে দিয়েছিল। এ ছাড়া ২০১২ সালের দিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক মধ্যস্থতা করতে সৌদি সরকারের প্রতি বিএনপি-জামায়াতের অনুরোধেও রিয়াদ সাড়া দেয়নি। এসবের কারণ হলো, এতে শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল। দেশটি সেই ঝুঁকি নিতে চায়নি।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল বিন আহমেদ আল জুবেইর গত মঙ্গলবার ঢাকায় তাঁর কর্মসূচি কেবল সরকারি পর্যায়েই সীমিত রাখার মধ্য দিয়ে সম্পর্ক আরো এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সরকারের বাইরে অন্য কোনো দল বা প্রতিনিধির সঙ্গে তাঁর কোনো কর্মসূচি ছিল না।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিশেষ মাত্রা পেতে শুরু করেছে। এ বছরের শুরুতেই রিয়াদে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। অনেক দিন পর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ওই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রায় উন্নীত করতে আগামী মে মাসের মধ্যে দেশটিতে সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বৈঠকেই আদেল বিন আহমেদ আল জুবেইর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌদি সফরের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে উদগ্রীব হয়ে আছেন। বর্তমানে এ সফর নিয়েই উভয় পক্ষ কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গত মঙ্গলবার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাতে সম্ভাব্য সফর নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আদেল বিন আহমেদ আল জুবেইরের ঢাকা সফর এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ছবি প্রকাশ করে বলেছে, ‘আল জুবেইর বাংলাদেশের জনগণ, সরকার ও প্রধানমন্ত্রীকে পবিত্র দুই মসজিদের হেফাজতকারী বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সউদের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। জবাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও সৌদি আরবের জনগণ, সরকার ও পবিত্র দুই মসজিদের হেফাজতকারীকে শুভেচ্ছা জানান।’

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘বৈঠকে তাঁরা (প্রধানমন্ত্রী ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী) পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও সমন্বয় জোরদারের উপায় নিয়ে কথা বলেছেন।’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, গত ৬ জানুয়ারি রিয়াদে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময়ই সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী। গত জানুয়ারি থেকে বেশ কয়েকটি ফোরামে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছে। ঢাকায় আসার দুই দিন আগে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) বিশেষ সম্মেলনের ফাঁকেও তাঁরা বৈঠক করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সৌদি আরব সফরের আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

 

মন্তব্য