বিশ্বাসঘাতক কামলা, তিন ভাই খুন-334272 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


বিশ্বাসঘাতক কামলা, তিন ভাই খুন

আলম ফরাজী, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)   

১০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিশ্বাসঘাতক কামলা, তিন ভাই খুন

বছরচুক্তি কামলা ছিল তারা মিয়া ও আব্দুর রব। হিন্দু হয়েও ওই দুই মুসলমানকে অতি বিশ্বাস করে বাড়িতে কাজে নিয়োগ করেছিলেন গৃহকর্তা হীরেন্দ্র চন্দ্র মজুমদার। স্থান দিয়েছিলেন

হৃদয়ে। একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী দেশজুড়ে হত্যাযজ্ঞ চালানোর সময়ও এই দুই কামলার ওপর বিশ্বাস হারাননি গৃহকর্তা। কিন্তু কে জানত দুধ-কলা দিয়ে পোষা ওই দুই বিশ্বাসঘাতক তাঁকে এবং তাঁর অন্য দুই ভাই খগেন্দ্র চন্দ্র ও ভূপেন্দ্র চন্দ্র মজুমদারকে হানাদারদের হাতে তুলে দেবে। আর নির্মম এই ঘটনাটি ঘটে বিজয়ের মাত্র ২০ দিন আগে। সেদিনের সেই বিভীষিকা স্মরণ করে আজও আঁতকে ওঠেন ওই মজুমদার পরিবারের বেঁচে থাকা অন্য সদস্যরা।

উল্লিখিত মজুমদারবাড়ির অবস্থান ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের খামারগাঁও গ্রামে। পরিবারের লোকজন জানায়, দিনটি ছিল ২৬ নভেম্বর। ওই দিন ভোরে গ্রামজুড়ে শুরু হয় হায়েনাদের তাণ্ডব। হানাদাররা বাড়িঘর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি ও বাড়ির দুই কামলা পাকিস্তানি সেনাদের দেখিয়ে দেয় মজুমদারবাড়িটি। টের পেয়ে নারী ও শিশুরা বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপন করে। কিন্তু সহায়সম্বল আগলে বাড়িতেই থেকে যান তিন ভাই। এ অবস্থায় বাড়ির বছরচুক্তি কামলা রব ও তারা মিয়া পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করে। তারা পাশের এলাকা থেকে আরো রাজাকার এনে বাড়িটি দখলের কৌশল আঁটে। একপর্যায়ে ওই দুই কামলার নেতৃত্বে একদল রাজাকার, আলবদর ও আলশামস ঘিরে ফেলে পুরো বাড়ি। তিন ভাইকে ধরে পিঠমোড়া করে বেঁধে ওরা নিয়ে যায় বাড়ির পূর্ব দিকে বারইগ্রাম মাদ্রাসায় আলবদর বাহিনীর ক্যাম্পে। সেখান থেকে তাঁদের পাশের কিশোরগঞ্জ পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে খবর পাঠানো হয়, মোটা অঙ্কের টাকা পেলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।

পরিবারের এক সদস্য শিক্ষক প্রবাল মজুমদার জানান, তাঁর বাবা হীরেন্দ্র চন্দ্র মজুমদার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। অন্য দুই চাচা ছিলেন পল্লী চিকিৎসক। স্বজনদের প্রাণ বাঁচাতে তাঁরা ছয় হাজার টাকা জোগাড় করেন। পরে সেই টাকা নিয়ে রাজাকারদের ক্যাম্পে যান গ্রামের নুর বক্স ও মুশুলী গ্রামের দারোগ আলী। কিন্তু রাজাকাররা টাকা রেখেও ফেরত দেয়নি তিন ভাইকে। এরপর আর তাঁদের সন্ধান মেলেনি। তার পরও আশায় বুক বেঁধে ছিল স্বজনরা—দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হয়তো তাঁরা তিনজন বাড়ি ফিরে আসবেন। এরই মধ্যে ওই দুই কামলা ও তাদের সহযোগী রাজাকাররা এলাকায় এসে দম্ভোক্তি করে প্রচার চালায়, ওই তিনজনকে চিরতরে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ওরা বলাবলি করে, কে কোন ভাইকে কিভাবে হত্যা করেছে। এ ধরনের কথাবার্তায় পরিবারের লোকজন ধরে নেয় হায়েনারা স্বজনদের মেরে ফেলেছে।

খামারগাঁও গ্রামের হাদিছ মিয়া (৬০) জানান, পিঠমোড়া করে বেঁধে তিন ভাইকে রাজাকাররা নিয়ে যায় তাঁর বাড়ির সামনে দিয়ে। পরে জেনেছেন পাশের মুশুলী এলাকার কালীগঞ্জ রেলব্রিজের ওপর চোখ বেঁধে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া নরসুন্দা নদীর স্রোতে ভেসে যায় তাঁদের লাশ।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সারা দেশে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তরা আদালতে মামলা করার সুযোগ পায়। এ অবস্থায় মজুমদার পরিবারের পক্ষে নিহত খগেন্দ্র চন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী বিদ্যুৎ প্রভা মজুমদার বাদী হয়ে প্রায় ১৫ জন চিহ্নিত রাজাকারের বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা ও লুটপাটের অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় আব্দুর রব, তারা মিয়া, আব্দুর রাশিদ, আব্দুল কাদিরসহ বেশ কয়েকজন রাজাকারের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। সাজা ভোগের পর এদের অনেকেই মারা গেছে।

এদিকে দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ওই তিন ভাইয়ের স্ত্রীদের সান্ত্বনা জানিয়ে শহীদের সনদপত্র প্রদান করেন। তাতে লেখা ছিল, ‘আপনার স্বামীর আত্মত্যাগের ফলে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। আপনার এই ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়।’ সেই চিঠির সঙ্গে নগদ দুই হাজার করে টাকাও পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু ওই তিনজনের নাম শহীদদের তালিকায় ওঠেনি।

মজুমদার পরিবারের বর্তমান প্রধান হিমাংশু মজুমদার ক্ষোভের সঙ্গে জানান, বঙ্গবন্ধুর পর দেশের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানই তাঁদের কোনো খোঁজ নেয়নি। এমনকি স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন দিবসেও পরিবারের সদস্যদের ডাকা হয় না। এই ক্ষোভ আর কষ্ট নিয়েই গত বছরের ২৫ জুলাই মারা গেছেন শহীদ হীরেন্দ্র চন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী জয়ন্তী মজুমদার।

ভূপেন্দ্র চন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী রেবা মজুমদার (৭৫) আজও বেঁচে আছেন। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শহীদ পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও আর কেউ আমাদের খবর নেয় না।’

এ ব্যাপারে নান্দাইল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাজহারুল হক ফকির জানান, শহীদ পরিবার হিসেবে ওই পরিবার স্বীকৃত। তবে স্থানীয় প্রশাসনের তালিকায় তাঁদের নাম না থাকায় একটু বেকায়দায় পড়তে হয়।

মন্তব্য