kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বুদ্ধিদীপ্ত মাশরাফি আর বিস্ফোরক তামিমে রক্ষা

নোমান মোহাম্মদ, ধর্মশালা থেকে   

১০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বুদ্ধিদীপ্ত মাশরাফি আর বিস্ফোরক তামিমে রক্ষা

বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে ‘সুপার টেন’-এ খেলার স্বপ্নে প্রথম ম্যাচেই ব্যাটে ঝড় তুললেন তামিম ইকবাল। বাংলাদেশও পেয়েছে স্বস্তির জয়। ছবি : এএফপি

এ যেন প্রকৃতির বড্ড বাড়াবাড়ি! সোনারঙা সকাল-সন্ধ্যা হেলে থাকে পাশের হিমালয়ে। কাংড়া উপত্যকার সবুজ পাতার মর্মরে বাজে সৌন্দর্যের জয়গান।

পাহাড়ে পাহাড়ে বাড়িঘরের আলোর বিন্দু দূর থেকে মনে হয় জোনাকির দুষ্টুমি। আর সব কিছুর মাঝে থাকা স্টেডিয়ামটি যেন বসরাই গোলাপের বাগানে গা এলিয়ে থাকা প্রজাপতির মতো। সুন্দরের মাঝে সৌন্দর্যের চূড়ান্ত রূপ!

অথচ কাল সন্ধ্যায় সেই ধর্মশালা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ দলকে কিনা মনে হয়, সুদূর কোনো মহাসাগরের বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপের বাসিন্দা। মৃত্যুপুরীতে বসতি যাদের। যাদের অতীত থাকলেও থাকতে পারে, ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবে নেই।

এরপর কী ইন্দ্রজালিক বিভাতেই না পাল্টে যায় সেই দৃশ্যপট! বদলে যায় একটি মাত্র ওভারে। জাদুকর মাশরাফি বিন মর্তুজার হাত থেকে বের হওয়া ওই ছয় বলেই তো আবার প্রাণসঞ্চার মৃত্যুপুরীর বাসিন্দাদের! হাট করে খোলা পরাজয়ের অন্ধকার দরজা বন্ধ করে জয়ের ছোট্ট ঘুলঘুলির আলোয় তাই ভরে ওঠে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ।

নেদারল্যান্ডসকে ৮ রানে হারিয়ে উল্লাসে না হলেও স্বস্তিতে শুরু হয় অভিযান।

২০ ওভারের ইনিংস, ৪০ ওভারের ম্যাচ। এক ওভারে কেন, অনেক সময় একটি বলেও তো জয়-পরাজয়ের ঠিকানা লেখা হয়ে যায়। সেই হিসাবে মাশরাফির ওভারটির আর আলাদা উল্লেখের কী আছে! আছে। ওই ১৭তম ওভারই যে বাংলাদেশের সামর্থ্যের গায়ে লাগতে দেয় না প্রশ্নের কালি! সীমিত ওভারের ক্রিকেটে পরাশক্তি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে করে না আক্রান্ত। অধিনায়কের ছয়টি বল তাই শুধু ‘আরেকটি’ ওভার না, এর চেয়ে ঢের বেশি।

মাশরাফি যখন নিজের হাতে বল তুলে নেন, ম্যাচের ওই সময়ের চালচিত্র একবার দেখুন। সাকিব আল হাসানের করা ঠিক আগের ওভারের শেষ বলে না হয় আউট ডাচ অধিনায়ক পিটার বোরেন! তবু চার ওভারে ৬ উইকেট হাতে নিয়ে মাত্র ৪২ রান চাই নেদারল্যান্ডসের। টি-টোয়েন্টি বিবেচনায় চাহিদা তেমন কঠিন না। ইস্পাতকঠিন ছিল বরং মাশরাফির পরিস্থিতি। আগের দেড় বছরের ছুটে চলা সাফল্যের ক্যারাভান কমলা রঙের এলেবেলে ডাচ স্টেশনে এসে থমকে পড়ার আশঙ্কা। আর ঠিক অমন সময়ই ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ ফিরলেন পুরনো দিনের স্মৃতি নিয়ে।

না, ক্যারিয়ারের সেই শুরুর দিককার মতো মাশরাফির বল আর আগুনের গোলা হয়ে ছোটে না। সে চেষ্টাও করেন না তিনি। বরং অভিজ্ঞতায় সওয়ার হয়ে বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ে বোকা বানান প্রতিপক্ষকে। ১৭তম ওভারের প্রথম বলটি থার্ড ম্যানে ঠেলে এক রান নিতে পারেন রলফ্্ ফন ডার মারউই। পরের বলেও এক রান, কিন্তু টম কুপার যে বেঁচে যান কিভাবে! বল তাঁর ব্যাটের কানা ছুঁয়ে স্টাম্পে লাগলেও বেলস তো পড়ে না! গুড লেন্থ থেকে লাফিয়ে ওঠা তৃতীয় বল ব্যাটে লাগাতে পারেন না মারউই। পরেরটিতে পারেন, আর তা মুশফিকের গ্লাভসে জমা হয় বলে আউট। নতুন ব্যাটসম্যানের সাধ্যে কুলায় না পরের দুই বলে এক রানের বেশি নেওয়ার।

অর্থাৎ, জয়-হারের দোদুল্যমানতার ওই ওভারে মাত্র তিন রান দিয়ে এক উইকেট শিকার মাশরাফির। চার ওভারে ৪২ রানের তুলনামূলক সহজ অঙ্ক থেকে তিন ওভারে ৩৮ রানের কঠিন পরিস্থিতিতে ডাচদের ঠেলে দেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

ব্যস, আর কী! ওই যে আত্মবিশ্বাসের প্রাণসঞ্চার, এরপর রোখা যায় না বাংলাদেশকে। তাসকিন আহমেদ এসে অধিনায়কের পদাঙ্ক অনুসরণে করেন অবিশ্বাস্য ওভার। ছয় বলের ছয়টিতেই ইয়র্কার! দেন মোটে ৬ রান। ২ ওভারে ৩৩ রানের প্রায় অসম্ভব সমীকরণের সামনে পড়ে যায় নেদারল্যান্ডস। এরপর আল-আমিন হোসেন এসে প্রথম বলে ভয়ংকর কুপারকে (১৫) আউট করে জয় নিশ্চিত করে ফেলেন একরকম। সেটিতে আবার খানিক অনিশ্চয়তা পরের ৫ বলে ১৬ রান দিয়ে। তবু কি আর তাসকিনের শেষ ওভারে ১৭ রান হয়! ৮ রান মোটে নিতে পারে নেদারল্যান্ডস। অধিনায়কে অনুপ্রাণিত বাংলাদেশ জিতে যায় ৮ রানে। আর শুধু ওই ওভার না, তাঁর ৪-০-১৪-১ বোলিং বিশ্লেষণও তো অকুণ্ঠ প্রশংসার দাবি জানিয়ে রাখে।

মাশরাফির ওভারটিই যে টার্নিং পয়েন্ট—এ নিয়ে সংশয় নেই কারো। ম্যান অব দ্য ম্যাচে তামিম ইকবালের নির্বাচনেও যেমন। ম্যাচের শেষটা মাশরাফির হলে শুরুটা নিঃসন্দেহে তামিমের! বাংলাদেশের জয়ের রসদ আসে এই ওপেনারের নিঃসঙ্গ ব্যাটিং-লড়াইয়ে। নিঃসঙ্গ বলতে তো আর একা একা ইনিংসজুড়ে ব্যাটিং করেননি তিনি। কিন্তু যখন জানবেন তামিমের ৮৩-র পর বাংলাদেশ ইনিংসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫—তখন সঙ্গহীন শেরপার উপমা আর অসংগত মনে হবে না।

ঢাকা থেকে ধর্মশালার ভৌগোলিক দূরত্বটাই শুধু বিস্তর না। এশিয়া কাপের পাগলপারা দর্শক সমর্থন থেকে প্রায় শূন্য গ্যালারির সামনে এসে পড়াও বাংলাদেশের জন্য বিরাট পালাবদল। তবু তো কাল গ্যালারিতে গর্বের সঙ্গে ওড়ে বেশ কিছু লাল-সবুজ পতাকা। কিন্তু গর্বিত হওয়ার মতো ব্যাটিং তামিম ছাড়া করতে পারেন না কেউ।

সৌম্য সরকার ইনিংসের প্রথম ওভারেই পান ‘জীবন’। কিন্তু বিলিয়ে আসেন তা চতুর্থ ওভারে। ছক্কা মারার পরের বলে সাব্বির রহমান এলবিডাব্লিউ। সাকিব দৃষ্টিকটুভাবে আউট অফ স্টাম্পের অনেক বাইরের বলে চালিয়ে শর্ট থার্ড ম্যানে ক্যাচ দিয়ে। এই শবযাত্রার মিছিল এক প্রান্ত থেকে দাঁড়িয়ে দেখেন কেবল তামিম। আর সতীর্থদের প্রতি আউটে যেন প্রতিজ্ঞার চোয়াল তাঁর শক্ত হয় আরো। আউট হওয়া চলবে না! গোল্লায় যাক নিজের সেঞ্চুরির সম্ভাবনা, বাংলাদেশকে দেড় শ রানের বৈতরণী অন্তত পার করতেই হবে!

তামিম তা পারেন অবিশ্বাস্য পরিপক্বতায়। নিজের সহজাত ছটফটে আগ্রাসী সত্তাকে পরিস্থিতির খাঁচায় বন্দি করে। তাই তো এক ওভারে দুই চার মারা সত্ত্বেও যখন দেখেন পরের ওভারে পর পর আউট মাহমুদ উল্লাহ ও মুশফিকুর রহিম—নামেন আবার ধৈর্যের পরীক্ষায়। তাতে পাস করে ৫৮ বলে ৮৩ রান করে থাকেন অপরাজিত। বাংলাদেশ পায় ১৫৩ রানের পুঁজি।

কিন্তু সেই পুঁজিতেও তো দেউলিয়া হওয়ার পথে ছিল বাংলাদেশ। নির্বিষ বোলিং আর বাজে ফিল্ডিংয়ের প্রদর্শনীতে। ডাচ ব্যাটিং ইনিংসের প্রথম ১৪ ওভারের মধ্যে কখনো তাই ম্যাচে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে না মাশরাফির দল। পারে অবশেষে অধিনায়কের জিয়ন-কাঠির স্পর্শেই।

ইনজুরি তাঁর অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে সত্যি। সময়ও তো ছিনিয়ে নেয়নি কম। তবু বাংলাদেশ ক্রিকেটের পুরনো সেই রাজকুমারের কাল আবার অধিষ্ঠান সম্রাট হিসেবে। তামিমের ম্যাচসেরা নির্বাচনের মতোই দ্বিধাহীন সেই মাশরাফির ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়া ওভারের মাহাত্ম্য।

বাংলাদেশের মায়াময় সুন্দর ক্রিকেট রূপকথার চূড়ান্ত সৌন্দর্যের উদাহরণ তাই আরো একবার হন তিনি। মাশরাফি বিন মর্তুজা নামের আশ্চর্য এক ক্রিকেট-জাদুকর।


মন্তব্য