ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে ‘হ্যাকড’-334267 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১২ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৪ জিলহজ ১৪৩৭


ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে ‘হ্যাকড’ হওয়া ডলার?

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে ‘হ্যাকড’ হওয়া ডলার?

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ‘হ্যাকিং’-এর মাধ্যমে যে অর্থ ফিলিপাইনে গেছে তার একটি অংশ এখন ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে চলে গেছে। তবে ওই অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে এখনো আশাবাদী বাংলাদেশ ব্যাংক।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ট্রেজারি বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় নির্বাহীরা। ‘সাইবার সিকিউরিটি অন পেমেন্ট সিস্টেম ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান, নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহা ও এই ঘটনা তদন্তে সম্প্রতি নিয়োগপ্রাপ্ত রাকেশ আস্থানা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের কয়েকটি ব্যাংকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার ব্যাংকে পাচার হয়েছে দুই কোটি ডলার আর বাকি আট কোটি ১০ লাখ ডলার পাচার হয়েছে ফিলিপাইনের ব্যাংকে। শ্রীলঙ্কায় পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিষয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলে ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের জন্য বিশ্বব্যাংকের একটি টিম কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক আইটি বিশেষজ্ঞ রাকেশ আস্থানা গোটা বিষয়টি দেখভাল করছেন। তিনি এ বিষয়ে বলবেন।’

এ সময় শুভংকর সাহা বলেন, ‘তদন্তাধীন বিষয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ বিষয়ে বলেছে। তার পরও দু-একটি বিষয়ে আমরা আপনাদের জানাব।’

রাকেশ আস্থানা বলেন, ‘তদন্ত চলছে। এর মধ্যে কিছু বলা মুশকিল। ফরেক্স ইন্টারনাল অ্যান্ড ফরেক্স এক্সটারনাল বিষয়গুলো দেখছি। এর বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না।’ তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, যে উপায়ে অর্থ সরানো হয়েছে তা কি হ্যাকড, না চুরি? কোনটা বলা যাবে এ ক্ষেত্রে। এর সঙ্গে কি বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ সম্পৃক্ত আছেন? ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংক, না ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক—কোন দিক থেকে ঘটেছে? তিনি এ প্রশ্নের উত্তর দেননি।

শুভংকর সাহা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হয়েছে। ৮১ মিলিয়ন ডলার (আট কোটি ১০ লাখ ডলার) ফিলিপাইনে গেছে। এই অর্থ উদ্ধারে ফিলিপাইনের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং বিভাগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আদালত সহযোগিতা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংককে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা আশা করছি পুরো টাকাই ফেরত পাব। কেননা ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ওই দেশের আদালতও টাকা উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে আদেশ দিয়েছেন।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে শুভংকর বলেন, ‘আমরা এখনো এটি হ্যাকড মনে করছি। ফিলিপাইনে যে অর্থ গেছে তার একটি অংশ এখনো সেখানকার ব্যাংকে আছে, আর কিছু ব্যাংকের বাইরে চলে গেছে। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি এই পর্যায়ে বলার অবকাশ নেই।’

আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ফিলিপাইনে এই অর্থ কার কার অ্যাকাউন্টে গেছে, সেই অর্থ কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে সে বিষয়ে সেখানকার অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং বিভাগ কাজ করছে। আর শ্রীলঙ্কার ব্যাংকে যে ২০ মিলিয়ন ডলার গিয়েছিল সে অর্থ আমরা ইতিমধ্যে ফেরত পেয়েছি।’

শ্রীলঙ্কায় পাচার করা অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে জমা হয়েছে কি না জানতে চাইলে শুভংকর সাহা প্রথমে বলেন, ‘জমা হয়েছে।’ পরক্ষণেই বলেন, ‘এখনো জমা না হলেও সেটি জমা হবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের কারোর পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে শুভংকর সাহা বলেন, ‘এটা আমরা জানি না।’

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কি মামলা করবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ডেপুটি গভর্নর রাজী হাসান বলেন, আপনারা জানেন প্রতিটি জায়গায় পেমেন্টের কিছু ডিউ ডিলিজেন্স আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যখন এই পেমেন্ট ইনস্ট্রাকশন গেল, তখন তাদেরও কিছু মানি লন্ডারিং, এন্টি মানি লন্ডারিং ফ্লাগ আছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে তারা ওই ইনস্ট্রাকশন সম্পর্কে কিছু জানতে চেয়েছে। আমরা দেখব তারা (ফেডারেল রিজার্ভ) ডিউ ডিলিজেন্সটা ঠিকমতো পরিপালন করেছে কি না। এখন সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর আইনগত দিকও খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে প্রতিটি পয়েন্টেই আইনগত পর্যালোচনা হবে। পরবর্তী কী করা হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। শুভংকর সাহা এ বিষয়ে বলেন, ‘উই আর ইন এ স্ট্রং পজিশন।’

ঘটনা ঘটার এক মাস পরও অর্থমন্ত্রীকে বাংলাদেশ ব্যাংক অবগত করেনি কেন জানতে চাইলে ডেপুটি গভর্নর রাজী হাসান বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে বিষয়টি সবাইকে জানানো হয়নি। তবে তদন্তের প্রয়োজনে সরকারের যে যে জায়গায় জানানো দরকার সেটা জানানো হয়েছিল। যখন একটি নির্দিষ্ট পর্যায় এলো তখন অর্থমন্ত্রীকেও জানানো হয়েছে।’

বৈঠক প্রসঙ্গে শুভংকর সাহা বলেন, ‘আমরা আজ বাংলাদেশে যত ব্যাংক আছে তাদের সবাইকে নিয়ে বসলাম এ কারণে যে, আপনারা জানেন প্রতিটি ব্যাংকের বিদেশি লেনদেন আছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে নস্ট্রো অ্যাকাউন্টে টাকা জমা আছে, সে জন্য আমাদের যে সাইবার সিকিউরিটি সেটি অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করলাম।’

বৈঠকে উপস্থিত একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তা বাড়াতে দেশের সব ব্যাংকের ‘ভারনারেবল অ্যাসেসমেন্ট’ করে দেবে। এ জন্য কোনো অর্থ নেবে না।”

এ ছাড়া গভর্নর ড. আতিউর রহমান ব্যাংকগুলোকে এই ঘটনায় আতঙ্কিত না হয়ে ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে লেনদেনের পরামর্শ দিয়েছেন বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

আরো বড় অর্থ চুরির হাত থেকে বেঁচে গেছে বাংলাদেশ : ফিলিপাইনের ব্যাংকিং সিস্টেমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের আরো ৮৭ কোটি ইউএস ডলার হ্যাকড হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল বলে জানা গেছে। অর্থ স্থানান্তরের আন্তর্জাতিক ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যাংকে এক পুনঃ আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ওই অর্থ হ্যাকড হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ঘটে এ ঘটনা।

এ ঘটনার মাত্র কয়েক দিন আগে একই উৎস থেকে স্থানীয় ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে আট কোটি ১০ লাখ ডলার হ্যাকড করা হয় এবং রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) এক স্থানীয় গ্রাহকের কাছে ছাড় করা হয়। ফিলিপাইনের সংবাদমাধ্যম ইনকোয়েরার ডট নেটে গতকাল বুধবার এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

বিভিন্ন উৎস থেকে ইনকোয়েরারকে জানানো হয়েছে প্রায় ৩৭০ কোটি পাউন্ড একজন বৈদেশিক মুদ্রার ডিলারের কাছে পাঠানো হয় এবং পরে সেগুলো সিটি অব ড্রিমস অ্যান্ড মাইডাসের সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোতে জুয়া খেলার জন্য চিপসে রূপান্তর করে জুয়ার টেবিলে রাখা হয় এবং পরে তা নগদায়ন করে হংকংয়ের একটি ব্যাংক হিসাবে রেমিট করা হয়। সব সূত্রই বলছে, এই অর্থ স্থানান্তরের ঘটনাকে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থ পাচারের ঘটনা হিসেবে তুলনা করা যায়।

একই সময়ে দ্য ইনকোয়েরার জেনেছে, যেখানে অর্থ স্থানান্তর ঘটেছে সেই আরসিবিসির মাকাতি সিটির জুপিটার স্ট্রিট শাখার প্রধান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে একটি স্টেটমেন্ট দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইউচেংকো পরিবার নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অর্থ স্থানান্তরের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্ক ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হ্যাক হওয়া অর্থ আট কোটি ডলারের উৎস নিয়ে ফিলিপাইনে তদন্ত কমিটি : এদিকে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তরাষ্ট্র অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ হ্যাক হয়ে ফিলিপাইনে গেছে কি না এ নিয়ে তদন্তে নেমেছে দেশটি। গতকাল বুধবার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) তাদের একটি শাখায় আট কোটি ১০ লাখ ডলার আমানতের উৎস নিয়ে সন্দেহ জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা সন্দেহ করছে এ অর্থ পাচার হয়ে এসেছে। তাই এর উৎস জানতে তদন্তে নেমেছে প্রতিষ্ঠানটি।

গত মাসে ফিলিপাইনের দৈনিক ইনকোয়েরার এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশের একটি ব্যাংক থেকে মিলিয়ন ডলার অর্থ হ্যাকাররা চুরি করেছে। সন্দেহ করা হচ্ছে—এ অর্থ ফিলিপাইনের একটি মধ্যমমানের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখায় জমা হয়েছে। এ রিপোর্ট প্রকাশের পরই আরসিবিসি থেকে এ ঘোষণা এলো।

মন্তব্য