ডোপপাপী শারাপোভা-333839 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


ডোপপাপী শারাপোভা

খালিদ রাজ   

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ডোপপাপী শারাপোভা

চার বছর বয়সী একটি মেয়ে কতটুকুই বা আর বোঝে। রাশিয়ান হওয়ার কারণে শারীরিক গড়ন এশিয়ানদের তুলনায় যত বড়ই হোক, অত বড় র‌্যাকেট কী আর ছোট্ট মেয়েটার পক্ষে ধরা সম্ভব! বল মারতে গেলে মাটি ছুঁয়ে যেত র‌্যাকেট, যেটা আবার কিনে দিয়েছিলেন তাঁর বাবার এক বন্ধু। টেনিসের সঙ্গে মেয়েটার ভালোবাসার গল্পের শুরুটা ওই চার বছর বয়স থেকে। এরপর কেটে গেছে দুই যুগ। খ্যাতি-সাফল্যে টেনিস বিশ্ব তো বটেই, মারিয়া শারাপোভার নামটি অযুত-লক্ষ-নিযুত-কোটি তরুণ হৃদয়েও ভালোবাসার দোল খাইয়ে চলছিল অনবরত।

কিন্তু হঠাৎ করেই পাল্টে গেল সব। ভালোবাসার স্বর্গোদ্যান থেকে যে এখন ঘৃণার বধ্যভূমিতে গিয়েই  আছড়ে পড়তে হচ্ছে তাঁকে। টেনিস কোর্টে তিল তিল করে গড়ে তোলা ‘স্বচ্ছ’ ভাবমূর্তির সৌধ থেকে যেন ধপাস করেই পড়ে যাচ্ছেন রুশ সুন্দরী। এখন তো ভালোবাসার বাঁধনে বেঁধে নেওয়া টেনিসও ‘ছি ছি’ ধিক্কারে লজ্জার কালি ছিটিয়ে দিচ্ছে তাঁর গায়ে। ভেঙে চুরমার হতে চলেছে একটু একটু গড়ে তোলা খ্যাতি-সাফল্যের সাম্রাজ্যও। কোটি ভক্তের ভালোবাসাও পাল্টে যাচ্ছে ঘৃণায়! এমনই হওয়ার কথা। কারণ ‘ডোপ পরীক্ষায় আমি ব্যর্থ’—শারাপোভার নিজ মুখ থেকেই বের হওয়া কথাটি যে তীর হয়েই টেনিসপ্রেমীদের হৃদয়টা এঁফোড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে। নিজের ভালোবাসার সঙ্গে এভাবে প্রতারণা করতে পারলেন শারাপোভা! তাও এক-দুই  নয়, ১০ বছর ধরে নাকি ঠকিয়ে চলেছেন তিনি টেনিসকে!

এই খেলাটির একটু-আধটু খবরও যাঁরা রাখেন, তাঁদের কাছেও শারাপোভা নামটার অর্থ অন্য রকম। খেলোয়াড় হিসেবে তো অবশ্যই, তবে নিজের সৌন্দর্য দিয়ে আকৃষ্ট করেছেন তিনি বিশ্বের কোটি ভক্তকে। শুধু ছেলেরাই নয়, তাঁর সৌন্দর্যের গুণমুগ্ধ ছিলেন এমনকি মেয়েরাও। খুদে টেনিস খেলোয়াড়দের আগামীর স্বপ্নেও সামনে ‘রোল মডেল’ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছেন শারাপোভা। আর খেলার সঙ্গে সৌন্দর্য যোগ হওয়াতে বিজ্ঞাপনের বাজারেও তাঁর চাহিদা পৌঁছে গিয়েছিল তুঙ্গে। কিন্তু তাঁর ডোপপাপের কথা চাউর হয়ে যেতেই ধস নেমেছে তাতেও। এমন মানুষের সঙ্গে যে থাকতে রাজি নয় ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘নাইকি’ও। সেই ১১ বছর বয়স থেকে তাঁর সঙ্গে আছে আমেরিকান প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ ২০১০ সালেও তাঁর সঙ্গে নতুন করে আট বছরের চুক্তি করেছে। কিন্তু ডোপ টেস্টের পর নাইকি থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা শারাপোভার সঙ্গে সম্পর্ক ‘সাময়িক স্থগিত’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

২০০৬ সাল থেকে শারীরিক সমস্যার কারণে শারাপোভা নিয়ে আসছেন নিষিদ্ধ ড্রাগটি। চলতি বছরের অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের সময় হওয়া ডোপ টেস্টে তাঁর শরীরে ধরা পড়ে ‘মেলডোনিয়াম’ নামের নিষিদ্ধ পদার্থ। দোষ স্বীকার করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না রাশিয়ান তারকার সামনে। ‘পুরো দায় আমার’—২০০৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে উইম্বলডনের শিরোপা জেতা শারাপোভা নিষিদ্ধ ড্রাগ নেওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার করলেন এই বলে, ‘আমার পারিবারিক চিকিৎসকের পরামর্শে ১০ বছর ধরে ওষুধটা নিচ্ছি। মিলড্রোনেট সম্পর্কে জানতাম। দিন কয়েক আগে আইটিএফ (ইন্টারন্যাশনাল টেনিস ফেডারেশন) থেকে চিঠি এসেছে, ওখানে আমি মেলডোনিয়াম নামটা দেখি, যেটা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।’

আপাতত টেনিস থেকে সাময়িক নিষিদ্ধ হয়েছেন রাশিয়ান তারকা। ১২ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া ওই সময়টা তদন্ত শেষে কতটা বাড়বে, সেটি জানতে অপেক্ষায় থাকতেই হচ্ছে। কেউ বলছেন পাঁচ বছর, কেউ আবার মনে করছেন এক বছর পরই কোর্টে ফিরতে পারবেন ২৮ বছর বয়সী রাশিয়ান। টেনিসের অ্যান্টি ডোপিং প্রোগ্রাম ও ওয়াডা (ওয়ার্ল্ড অ্যান্টি ডোপিং এজেন্সি) জানিয়েছে, চার বছরের বেশি সময় নিষিদ্ধ হতে পারেন শারাপোভা। যদিও শারাপোভার সাবেক কোচ জেফ টারাঙ্কো মনে করছেন, দুই বছরের বেশি হবে না, এমনকি এক বছরেও ফিরতে পারেন কোর্টে। রাশিয়ান তারকা এখন সম্ভবত আপিল করবেন ‘টিইউই’তে, যে সংস্থাটি খেলোয়াড়দের নিষিদ্ধ পদার্থ ব্যবহার করার অনুমতি দেয় চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে। শারাপোভা যেহেতু জানিয়েছেন, ‘শারীরিক অবস্থা’র কারণে তিনি ড্রাগ নিয়েছিলেন, তাই আপিল কাজে আসতেও পারে। আরেকটি বড় বিষয়ও সঙ্গ দিচ্ছে পাঁচটি গ্র্যান্ড স্লামের মালিককে। মেলডোনিয়াম এ বছরের শুরুতে নিষিদ্ধ করা হলেও আগে ওষুধটি ব্যবহার করার অনুমতি ছিল। শারাপোভা জোর দিলেন এ বিষয়টাতেই, ‘আপনাদের একটা বিষয় জানা খুব দরকার, ১০ বছর ধরে কিন্তু ওষুধটা নিষিদ্ধ ছিল না ওয়াডার তালিকায়। আইনসম্মতভাবে আলোচনা করে গত ১০ বছর এটা ব্যবহার করেছি। তবে ১ জানুয়ারি নিয়ম বদলে যায়। মেলডোনিয়াম রূপ নেয় নিষিদ্ধ পদার্থে।’ জোর পেলেও আরেকটা জায়গায় আবার ফেঁসে যাচ্ছেন, ২২ ডিসেম্বর যে ওয়াডা থেকে তাঁকে ই-মেইলের মাধ্যমে জানানো হয়েছিল বিষয়টা। কিন্তু ‘ভুলবশত’ মেইলটা পড়ার সময়ই হয়নি শারাপোভার!

লস অ্যাঞ্জেলেসের সংবাদ সম্মেলন বেশ ঘটা করে ডেকেছিলেন শারাপোভা। টেনিস বিশ্বের ধারণা ছিল অবসরের ঘোষণা দিতে চলেছেন রাশিয়ান তারকা। চোটের কারণে প্রায়ই মাঠের বাইরে কাটানো এবং ফর্মহীনতায় ভোগা শারাপোভা আগের দিন জানিয়েছিলেন, ‘বড় ঘোষণা আসছে।’ অবসরের চেয়েও যে বড় কোনো ঘোষণা থাকতে পারে, ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ার ব্যাপারটি জানানোর পর বোঝা গেছে তা। অবসর প্রসঙ্গে বললেন, ‘জানি অনেকেই ভেবেছেন আজ (গতকাল) আমি অবসরের ঘোষণা দেব। কখনোই আমি অবসরের ঘোষণা দেব না লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রাণকেন্দ্রে থাকা এমন হোটেলে।’ ভক্তদের কাছে ক্ষমা চেয়ে টেনিসে ফেরার আশার কথাও শোনালেন তিনি, ‘অনেক বড় ভুল করেছি। ভক্তদের লজ্জায় ডুবিয়েছি, মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছি খেলাটিকে, যেটা আমি সেই চার বছর বয়স থেকেই খেলে আসছি। যে খেলাকে হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসি। জানি এর পরিণাম ভোগ করতে হবে আমাকে। তবে এভাবে ক্যারিয়ার শেষ করতে চাই না। আমি সত্যি আশা করছি আরো একটি সুযোগ পাব খেলার।’

কে জানে ‘দ্বিতীয়’ সুযোগ পাবেন কি না মারিয়া শারাপোভা। নিষেধাজ্ঞার সময় যাই হোক না কেন, হয়তো ফিরবেন। তবে ভালোবাসা-শ্রদ্ধার জায়গাটা নিশ্চয়ই আর তাঁর জন্য বরাদ্দ রাখবেন না ভক্তরা।

মন্তব্য