‘বাবাকে প্রথম হাহাকার করে কাঁদতে-333838 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৫ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৭ জিলহজ ১৪৩৭


‘বাবাকে প্রথম হাহাকার করে কাঁদতে দেখি’

কাজী হাফিজ   

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘বাবাকে প্রথম হাহাকার করে কাঁদতে দেখি’

‘অপারেশনে যাওয়ার সময় বাবা সামনে দাঁড়িয়ে হাত পাততেন। রিভলবারটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখতেন ঠিকমতো গুলি ভরা আছে কি না। পটাশিয়াম সায়ানাইডটাও সঙ্গে নিয়েছি কি না জানতে চাইতেন। বলতেন—যদি ধরা পড়ো, এটা অবশ্যই ব্যবহার করবে। এক সেকেন্ড দেরি করবে না। দেশের জন্য যুদ্ধে নিজ সন্তানদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে বাবার কোনো দ্বিধা ছিল না।’

কথাগুলো বলছিলেন একাত্তরে ঢাকায় দুর্ধর্ষ গেরিলা অপারেশনগুলোর অন্যতম নায়ক ইশতিয়াক আজিজ উলফাত। তাঁর বাবা আজিজুস সামাদের আরো পরিচয় আছে। তিনি স্বনামখ্যাত প্রয়াত সাংবাদিক আতাউস সামাদের বড় ভাই এবং আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের মামা। ছেলেদের তিনি মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছেন এই অপরাধে হানাদার বাহিনী তাঁর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। কিন্তু ভেঙে পড়েননি তিনি।

উলফাতের অশ্রুসিক্ত স্মৃতিচারণা, ‘আমার ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বাবাকে কখনো কাঁদতে দেখিনি। কিন্তু যেদিন তিনি তাঁর  জ্যেষ্ঠ ছেলে লেফটেন্যান্ট আশফাকুস্ সামাদ বীর-উত্তমের শহীদ হওয়ার সংবাদটি পান সেদিন হাহাকার করে কেঁদে উঠেছিলেন। স্বজন হারানোর সেই বেদনা আমৃত্যু ভুলতে পারেননি তিনি। যুদ্ধের আগে আমরা চার ভাই ঈদের দিনগুলোতে এক রঙের পাঞ্জাবি পরতাম। সুখের সেই দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ঈদ আর আমাদের জন্য আনন্দ বয়ে আনে না।’

ইশতিয়াক আজিজ উলফাত ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। এরপর সেখানে কেটে গেছে ২১টি বছর। এই দীর্ঘ সময়েও তিনি ভিনদেশি ওই পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেননি। অবশেষে ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে আসেন।

কোন পরিস্থিতিতে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন—এ প্রশ্নে দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা উলফাত আজিজ বলেন, ‘আমার বয়স তখন ১৭ বছর ৬ মাস। সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। মার্চ মাসের পরিস্থিতি দেখে বুঝতে পারছিলাম যুদ্ধ হবেই। তখনকার সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বাসার চেয়ে আমাদের রাজপথেই বেশি সময় কাটছিল। উৎকণ্ঠা আর রোমাঞ্চ একই সঙ্গে কাজ করছিল। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে আমার বন্ধু মতিউর শহীদ হন। সে সময়ও আমরা মিছিলে ছিলাম। সুতরাং একাত্তর আমাকে আন্দোলিত করবে—সেটাই স্বাভাবিক। ২৫ মার্চের আগেই আমাদের পরিবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল। আমরা একটি পয়েন্ট টুটু বোরের রাইফেল আর একটি পিস্তলও জোগাড় করে ফেলি।’

তিনি বলে চলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনী যে হামলার জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলছে তা বুঝতে কারো বাকি থাকে না। বাঙালি অফিসারদের তারা পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে থাকে আর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অবাঙালি অফিসার আনা অব্যাহত রাখে তারা। এই পরিস্থিতিতে ২৫ মার্চ ওদের আক্রমণ শুরু হয়ে যায়। ২৬ তারিখে ওরা ইত্তেফাক অফিসে কামান দাগে। ২৭ মার্চ কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে নেওয়া হলে আমি আর আমার বন্ধু মঞ্জু (মেজর মঞ্জুর আহমেদ বীরপ্রতীক) বাসা থেকে বের হই। ইত্তেফাক ভবন ছেড়ে ১০০ গজ যেতেই দেখি রাস্তার পাশে গ্রিলের দরজার নিচে একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে মরে পড়ে আছে। সম্ভবত শিশুটি ওই দরজার নিচ দিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রাণ রক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু হানাদাররা তাকেও রেহাই দেয়নি। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে পৌঁছে দেখি বাড়িগুলো হানাদার বাহিনীর গোলায় বিধ্বস্ত। একটা বাড়িতে পুড়ে প্রায় কয়লা হয়ে যাওয়া দুটো কংকাল জড়াজড়ি করে পড়ে আছে। সদরঘাট রক্তাক্ত। জানতে পারি, সেখানে অনেক লোককে ওরা মেরে পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে। জগন্নাথ কলেজেও যাই। সর্বত্রই গণহত্যার দৃশ্য। কারফিউ শেষ হওয়ার আগে আমরা বাসায় ফিরে আসি। মঞ্জুরের বড় ভাই (মেজর আখতার বীরপ্রতীক) তখন চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেডিক্যাল অফিসার। আমরা তাঁর সহযোগিতা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের কাছে খবর ছিল কিশোরগঞ্জের কোথাও খালেদ মোশাররফের সঙ্গে তিনি আছেন। বাদল ভাইয়ের (শহীদুল্লাহ খান বাদল) সঙ্গে খালেদ মোশাররফের সখ্য ছিল। সে বিষয়টিও আমরা মাথায় রাখি। ২৭ মার্চই ভাইয়া বাদল ভাইসহ তাঁর ঘনিষ্ঠ তিন বন্ধুকে নিয়ে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন। ৪ এপ্রিল ফিরে আসেন তিনটি ৩০৩ রাইফেল, ২৫টি গ্রেনেড ও পর্যাপ্ত গুলি নিয়ে। প্রথমে এগুলো আমাদের বাসাতেই রাখা হয়। পরে নিয়ে যাওয়া হয় তৌহিদ সামাদদের ধানমণ্ডির বাসায়। ওদিকে ভাইয়ারা যাওয়ার পর আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে ২ এপ্রিল রওনা হয়েছিলাম। কিন্তু ওদের খুঁজে না পেয়ে ফিরে আসি। পরে ১৮ এপ্রিল আমি আর মঞ্জুর সাতক্ষীরা হয়ে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হই। পরে কলকাতা এবং সেখান থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ১২-১৩ মের দিকে আগরতলায় পৌঁছি। সেখানে ক্যাপ্টেন হায়দারের কাছে প্রশিক্ষণ নিই আমরা। ঢাকার আরো অনেক ছেলে সেখানে জড়ো হয়েছিল। এরপর মে মাসের শেষের দিকে ঢাকায় অপারেশনের জন্য পুরো প্রস্তুতিসহ ফিরে আসি।’

ঢাকায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পাওয়ার স্টেশনে, গণিজ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের সেই দুঃসাহসিক অপারেশনগুলোর কথা অনেকেরই জানা। উলফাত জানান, আগস্টে তাঁর বন্ধু বাশার ধরা পড়ার পর তাঁদের শেল্টারগুলোর তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। ৩০ আগস্ট পাকিস্তান আর্মি তাঁদের বাসায় অভিযান চালায় এবং তাঁর বাবা আজিজুস সামাদকে ধরে নিয়ে যায়।

বাবার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে উলফাত বলেন, ‘অপারেশনের সময় আমরা প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ বহন করতাম। এতে হাতে হলুদ দাগ হয়ে যেত। বাবা সেই দাগ পেট্রল দিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে ধুয়েমুছে দিতেন। বলতেন, হাতে এ দাগ থাকলে ওরা তোকে শনাক্ত করে ফেলতে পারে।’

বড় ভাই আশফাকুস্ সামাদ সম্পর্কে উলফাত বলেন, ‘যুদ্ধে যাওয়ার আগে ভাইয়া পরিসংখ্যান বিভাগে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছিলেন। যুদ্ধে তাঁকে একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে নেওয়া হয়। তিনি ২০ নভেম্বর ভূরুঙ্গামারীতে দুধকুমার নদের তীরে শহীদ হন। তবে খবরটা আমরা বাবার কাছে গোপন রাখি। বাবা হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আমি লোক পাঠিয়ে তাঁকেসহ আমাদের পরিবারের সবাইকে ভারতে নেওয়ার ব্যবস্থা করি। আগরতলায় পৌঁছার পর তাঁকে বিমানে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। কলকাতায়ই বেতারের মাধ্যমে ওই দুঃসংবাদ পান তিনি। সে সময় আমাকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি খবরটা জানতে? আমি মাথা নিচু করে বলেছিলাম, হ্যাঁ, জানতাম। কিন্তু আপনাকে বলতে পারিনি। বাবাকে আমি সেই প্রথম অসহায়ভাবে কাঁদতে দেখি।’

মন্তব্য