বৃষ্টিভেজা অভ্যর্থনায় একটু অস্বস্তি-333476 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৮ জিলহজ ১৪৩৭


বৃষ্টিভেজা অভ্যর্থনায় একটু অস্বস্তি

নোমান মোহাম্মদ, ধর্মশালা থেকে   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বৃষ্টিভেজা অভ্যর্থনায় একটু অস্বস্তি

এশিয়া কাপের রেশ শেষ না হতেই শুরু হয়ে যাচ্ছে বিশ্ব টি-টোয়েন্টির মিশন। বৈশ্বিক এ আসরে খেলতে গতকাল ভারতের ধর্মশালায় পৌঁছে গেছেন মাশরাফিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

মেঘের বাড়িতে ক্রিকেটের নিমন্ত্রণ হলে ঠিক আছে। কিন্তু ক্রিকেটারদের আপ্যায়ন করা হয় যদি ঝুম বৃষ্টিতে, তাহলে? বৃষ্টিভেজা দুপুর-বিকেল বাঙালির মন রোমান্টিকতার রঙে রাঙিয়ে দিতে পারে। তবে ক্রিকেটাররা সে সম্ভাবনায় যে আঁতকে উঠবেন, সেটিই তো স্বাভাবিক। মাশরাফি বিন মর্তুজা ধর্মশালায় পা রেখেই যেমন গেলেন চমকে!

এশিয়া কাপের ফাইনাল শেষ হতে হতে আগের দিন মধ্যরাত। ঘণ্টা কয়েকের বিশ্রাম কেবল জোটে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। এরপরই ‘দে ছুট’। সাতসকালে ঢাকা থেকে উড়ালে চেপে বসা। মধ্যাহ্নে দিল্লি বিমানবন্দরে নেমে উড়োজাহাজ বদলে ধর্মশালার উদ্দেশে রওনা। বিকেল ৪টা ১০ মিনিট নাগাদ এখানকার কাংড়া বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করে স্পাইসজেটের বিশেষ উড়ালযানটি। বাংলাদেশের ১৬ কোটি ক্রিকেটপাগলের আশা বুকে নিয়ে উড়ে আসা স্বপ্নযান যেন। আর এখানে এসেই কিনা অলক্ষুণে বৃষ্টির উপদ্রবের কথা শুনতে হয় মাশরাফিকে!

আগের সপ্তাহখানেক একেবারে নিরুপদ্রব ছিল ধর্মশালার আবহাওয়া। পরশু বিকেলে তুমুল বৃষ্টিতে প্রথম ব্যত্যয়। আর সেটিও কি যেনতেন বৃষ্টি! দশ দিক ভাসিয়ে নেওয়া প্রলয় তুফান যেন। বরফশীতল পানিই কেবল পড়েনি আকাশ চুয়ে, পড়েছে বরফখণ্ডও। পরদিন সকালে হিমালয়ের চূড়ায় থাকা তুষারের স্তূপেও রয়ে যায় যার প্রমাণ। তা অমন বৃষ্টি হলে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো নিঃসন্দেহে পড়ে যাবে সংশয়ের ভেতর। তাই তো বৃষ্টির কথা শুনে চাপা আতঙ্ক বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফির কণ্ঠেও, ‘এখানে বৃষ্টি হচ্ছে? তাহলে তো সমস্যা।’ কে জানে, চকিতে হয়তো সর্বশেষ এশিয়ার গেমসের কথা খেলে যায় তাঁর মনের কোণে! দক্ষিণ কোরিয়ার ওই আসরে হট ফেভারিট হয়েও ফাইনাল পর্যন্ত খেলতে পারেনি বাংলাদেশ। বৃষ্টির কারণে সেমিফাইনাল ভেসে গেলে টসে হেরে পাতাতাড়ি গোটাতে হয়। ইতিহাসের ওই আর্তনাদই হয়তো মহাকাল ভেদ করে কাল বিকেলে পৌঁছে যায় কাংড়া বিমানবন্দর থেকে মাত্রই বেরোনো মাশরাফির মনের গহিনে।

এর আগে মাত্রই অবশ্য একটি ফাইনাল খেলে এসেছে বাংলাদেশ। এশিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে। ওই ম্যাচেও ছিল বৃষ্টির উৎপাত, যে কারণে খেলা নেমে আসে ১৫ ওভারে। আর তাতে শেষ পর্যন্ত যে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি, সে জন্য ভাগ্যকেই কাল একরকম দোষারোপ করেন মাশরাফি, ‘এশিয়া কাপ ফাইনালে টস হারের কারণে আমরা পিছিয়ে পড়ি অনেক। সেটিই শেষ পর্যন্ত গড়ে দেয় পার্থক্য।’ ওই ভাগ্যকে না আরেক দফা শাপশাপান্ত করতে হয় বাংলাদেশকে! টস যতটা ভাগ্যের খেলা, বৃষ্টি তার চেয়েও বেশি। প্রকৃতির খেয়ালে যে হাত নেই কারো! আর গত পরশুর মতো কাল বিকেলেও তো ধর্মশালার হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের স্টেডিয়ামে রংবাজের মতো দাপিয়ে বেড়ায় বৃষ্টির দল। ক্ষণে ক্ষণে আকাশ চিরে ওঠে বিদ্যুতের ঝলকে। কাল নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেও যদি এমন অবস্থা থাকে, তাহলে ম্যাচ মাঠে গড়ানোর প্রশ্নই নেই। বাংলাদেশ অধিনায়ক তাই আতঙ্কিত হবেন না কেন!

সদ্য সমাপ্ত এশিয়া কাপে পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার মতো পরাশক্তিদের হারায় বাংলাদেশ। নিজেরাও যে দিনে দিনে পরাশক্তি হয়ে উঠছে, তারই আরেক প্রস্থ প্রতিশ্রুতি ওই পারফরম্যান্সে। অথচ এই দলটিকেই কিনা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে হবে বাছাই পর্ব! পরশু ধর্মশালায় আসার পথে বিমানের পাশের সিটের যাত্রী অজয় শর্মাও যেমন তাতে অবাক হন খুব, ‘এশিয়ার সেরা দুটি দলের একটি এখন বাংলাদেশ। তাহলে কেন তাদের বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব খেলতে হবে? ওদের খেলতে হলে শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানেরও তা খেলা উচিত।’ কিন্তু এ যুক্তি তো আর আইসিসির ধোপে টিকবে না। সে জন্যই বৃষ্টি আরো চিন্তা বাড়াচ্ছে বাংলাদেশের। এমনিতে নেদারল্যান্ডস-আয়ারল্যান্ড-ওমান নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তার বলিরেখা নেই টিম ম্যানেজমেন্টে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে কোনো খেলা যদি ভেসে যায়, তাহলে তো রান রেট চলে আসবে হিসেবে। মাশরাফি অবশ্য আগাম অত দূর ভাবতে রাজি নন, ‘আগে তো কাল (আজ) মাঠে যাই। অবস্থা বুঝি। পরেরটা পরে দেখা যাবে।’

স্টেডিয়াম-মাঠ-উইকেট না হয় আজ দেখবেন! কালই অবশ্য ধর্মশালার ক্রিকেটীয় আগ্রহ বুঝে ফেলার কথা মাশরাফি ও তাঁর দলের। বিশ্বকাপ মাঠে গড়াচ্ছে রাত পোহালেই। অথচ উত্তেজনার ছিটেফোঁটাও নেই শহরে। নেই বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপনের চিৎকার। দু-এক জায়গায় কেবল দেখা মেলে এর, হিন্দি ভাষায় লেখা যে বিলবোর্ডের স্লোগানের বাংলা অনেকটা এমন, ‘হিমাচলের রঙের সঙ্গেই ক্রিকেট।’ তবে কাল পর্যন্ত অন্তত ধর্মশালার রঙের ক্যানভাসে ক্রিকেটের চেয়ে সৌন্দর্যের উপস্থিতিই বেশি। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায় বিমানবন্দর থেকে প্যাভিলিয়ন হোটেলে যাওয়ার সময় নিশ্চয় সেই উপলব্ধি হয়েছে বাংলাদেশ দলের। রাস্তার দু’পাশে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা সাদা রঙের ‘কাত’ ফুলে যেমন পেয়েছেন অভ্যর্থনা।

তবে আজ থেকেই এসব একপাশে সরিয়ে বাংলাদেশ দলকে নেমে পড়তে হচ্ছে অভিযানে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মিশনে। বিশ্বকাপ আজ থেকে শুরু হলেও বাংলাদেশের প্রথম খেলা কাল, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে। যে দলটি কাল বিকেলে জাঁকিয়ে অনুশীলন করেছে স্টেডিয়ামের ইনডোরে। তবে বাছাই পর্বের এ দলগুলো যে বাংলাদেশকে বিন্দুমাত্র চোখ রাঙাতে পারবে না, স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নে তার প্রমাণ। বিমানবন্দরে ধর্মশালার স্থানীয় সাংবাদিকরা যে আগ্রহভরে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের প্রশ্ন করেন, ‘তোমাদের দল কি বিশ্বকাপ জয়ের কথা কিছু বলছে?’

নাহ্্, এশিয়া কাপের ফাইনাল খেললেও এখনো স্বপ্নের আকাশটা অত বড় নয় বাংলাদেশের। আপাতত বাছাই পর্ব উতরে মূল পর্বে যাওয়াই তাদের পাখির চোখ। স্বপ্নের সেই ‘চোখ’ ধর্মশালার বৃষ্টির জলে ভিজে যাবে না—এই তো এখানকার প্রার্থনা!

মন্তব্য