রিজার্ভের চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনার-333469 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


রিজার্ভের চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনার আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রিজার্ভের চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনার আশা

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে গচ্ছিত থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বেশ কিছু অর্থ খোয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, চীনভিত্তিক একটি হ্যাকার গ্রুপ হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে এ অর্থ শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে সরিয়ে নিয়েছে। শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া অর্থ এরই মধ্যে উদ্ধার করা গেছে। আর ফিলিপাইন থেকে অর্থ উদ্ধার করতে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইটেলিজেন্স ইউনিট ফিলিপাইনের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ রাখছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সুরক্ষিত রিজার্ভের একটি অ্যাকাউন্ট হ্যাকড করে অর্থ সরানোর বিষয়টিকে ‘অস্বস্তিকর’ ও ‘বিব্রতকর’ ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, ঘটনাটি এখনো বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে জানায়নি। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আনেত্তি ডিক্সন ও বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের নয়া কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফ্যান গতকাল সোমবার হেয়ার রোডে অর্থমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুরোধে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে পাচার হওয়া অর্থ জব্দ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ফিলিপাইনে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ সাত কোটি ৬০ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫৯২ কোটি টাকা) বলে একটি সূত্রের দাবি। আবার অন্য একটি সূত্রে জানা গেছে, পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ১০ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরে তদন্তাধীন রয়েছে। তবে আমি একটি দাপ্তরিক কাজে বাইরে থাকায় তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে অবগত নই।’

হ্যাকড হওয়া অর্থের সঠিক পরিমাণ চানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে খোয়া যাওয়া অর্থের পরিমাণ এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে মিডিয়ায় যে অঙ্কের কথা বলা হয়েছে তার থেকে কিছুটা কম হবে।’

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ২০-২৫ শতাংশ নগদ আকারে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা হয়। বাকি অংশ বন্ড, স্বর্ণ ও অন্যান্য মুদ্রায় বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়। চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ হ্যাক করে চীনভিত্তিক একটি গ্রুপ। পরে তা শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে সরিয়ে নেয় তারা। তবে এর কিছুদিনের মধ্যেই শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া অর্থ ফেরত আনতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ ব্যাংক ও ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক।

এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাকের হোসেন ও ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রবকে জরুরি ভিত্তিতে ফিলিপাইনে পাঠানো হয় বলে জানা যায়। তাঁরা ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও এএমএলসিকে বিষয়টি অবহিত করলে এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। এর পরই বিষয়টি ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসে।

প্রবাসী ফিলিপিনোদের রেমিট্যান্স স্থানান্তরকারী সংস্থা ফিলরেমের মাধ্যমে এ অর্থ ব্যাংকের মাকাতি সিটি শাখায় জমা হয়। পাঁচটি আলাদা হিসাবে মোট ১০ কোটি ডলারের (৭৮০ কোটি টাকা) সমপরিমাণ অর্থ জমা করা হয় সেখানে। এরপর স্থানীয় মুদ্রা পেসোয় রূপান্তহর করে পুরো অর্থ একটি করপোরেট হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। করপোরেট ব্যাংক হিসাবটি চীনা বংশোদ্ভূত এক ফিলিপিনো ব্যবসায়ীর। ওই ব্যবসায়ীর হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তর হয় তিনটি স্থানীয় ক্যাসিনোয়। পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে। ফিলিপাইনের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি দেশটির অর্থ পাচার প্রতিরোধ কাউন্সিল বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।

এদিকে ফিলিপাইনের দৈনিক দ্য ইনকোয়েরার পত্রিকা গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ থেকে ১০ কোটি ডলার মানি লন্ডারিং হয়েছে বলে একটি খবর প্রকাশ করে। ওই খবরে বলা হয়, দেশটির মাকাতি শহরে অবস্থিত রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের একটি শাখার মাধ্যমে ওই অর্থ ফিলিপাইনে আসে। চীনা হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা সেখানকার কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এ অর্থ হাতিয়ে নেয়। হ্যাকার দল এই অর্থ প্রথম ফিলিপাইনে পাচার করে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অর্থ পাচারের এ ঘটনা তদন্ত করছে ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল। বিভিন্ন তথ্যসূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পরে ওই অর্থ সেখান থেকে ক্যাসিনোসহ একাধিক হাত ঘুরে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচারের তথ্য জানার পর গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৬ ফেব্রুয়ারি তিন দিনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের ডিজিএম জাকের হোসেন ও বিএফআইইউর যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রবকে পাঠানো হয় ফিলিপাইনে। সেখানে গিয়ে এ দুই কর্মকর্তা দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) সঙ্গে আলদা বৈঠক করেন। এ দুটি বৈঠকে হ্যাকার গ্রুপ চিহ্নিত করে টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থার বিষয়ে তাদের সহায়তা চাওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, রিজার্ভের অর্থ কোন দেশে, কোথায় বিনিয়োগ বা সংরক্ষণ করা আছে তা সুইফট কোডের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিশ্বব্যাপী সুরক্ষিত হিসেবে বিবেচিত এ নেটওয়ার্ক হ্যাক করে রিজার্ভ থেকে টাকা চুরির ঘটনা ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ঘটে। এরপর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ অব বাংলাদেশের (এনপিএসবি) চ্যানেলের মাধ্যমে সুইফট ব্যবহার বন্ধ রাখা হয়েছে।

অর্থ চুরির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতামূলক অফিস আদেশে সবাইকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতিমালা ও নির্দেশনা’ মেনে চলতে বলা হয়েছে। কর্মকর্তাদের অনুপস্থিত অবস্থায় পিসি খোলা না রাখা, অন্যের পিসি ব্যবহার না করা, অননুমোদিত কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার না করা, অপরিচিত বা সন্দেহজনক ই-মেইল না খুলে সরাসরি ডিলিট করা এবং অননুমোদিত কোনো নেটওয়ার্ক ডিভাইস ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অফিস সময়ের পর বা ছুটির দিন অফিসে উপস্থিত থেকে নেটওয়ার্ক ব্যবহারের প্রয়োজন হলে আইটি বিভাগের পূর্বানুমতি নিতে বলা হয়েছে।

এদিকে গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রক্ষিত স্থিতি থেকে ‘হ্যাকড’ হওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অর্থের একাংশ এরই মধ্যে আদায় করা সম্ভব হয়েছে; অবশিষ্ট অঙ্কের গন্তব্য শনাক্ত করে তা ফেরত আনার বিষয়ে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইটেলিজেন্স ইউনিট ফিলিপাইনের এন্টি-মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে। এরই মধ্যে ফিলিপাইনের এন্টি-মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষ তাদের দেশের আদালতে মামলা দায়ের করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলো জব্দ করার আদেশ সংগ্রহ করেছে আদালত থেকে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাইবার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক ও তাঁর ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন টিম এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের টিমের সঙ্গে কাজ করছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে দেশে এবং দেশের বাইরে তদন্তলব্ধ তথ্যাদি অপ্রকাশিত রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বৃহত্তর আর্থিক খাতে সাইবার নিরাপত্তা সার্বিকভাবে নিশ্ছিদ্র করার প্রক্রিয়া জোরালোভাবে সচল রাখা হয়েছে।

‘ইট’স আনইউজুয়াল সিচুয়েশন’ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সুরক্ষিত রিজার্ভের অর্থ চুরি হওয়ার বিষয়টি কিভাবে দেখছেন জানতে চাওয়া হলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘ইট’স আনইউজুয়াল সিচুয়েশন।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিষয়টি তাঁকে জানানো হয়েছে কি না জানতে চাইলে মুহিত বলেন, ‘না বিষয়টি আমাকে এখনো জানানো হয়নি।’

এর আগে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বৈঠক করেন। বিশ্বব্যাংকের পক্ষে এ বৈঠকে নেতৃত্ব দেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আনেত্তি ডিক্সন। তিনি বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের নতুন কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে গতকাল যোগদান করা চিমিয়াও ফ্যানকে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা।

বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তার মতে, বাংলাদেশ খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে : বৈঠক শেষে আনেত্তি ডিক্সন সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ খুব দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। জনগণের জীবনযাত্রার মানও বেশ বেড়েছে। অর্থনীতির জন্য এগুলো খুবই ইতিবাচক দিক। ডিক্সন বলেন, ‘বাংলাদেশে সদ্য যোগদানকারী বিশ্বব্যাংকের নতুন কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফ্যানকে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই আমি এখানে এসেছি। তবে এ সময় আমরা দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা করেছি। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের এ আলোচনা খুব ফলপ্রসূ হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে বাংলাদেশে। এগুলোতে বিশ্বব্যাংকের অনেক অর্থায়নও রয়েছে। আমরা পর্যালোচনা করে দেখেছি, বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের গৃহীত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সক্ষমতা বেশ ভালো। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও এগুলো বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে।’

মন্তব্য