kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


৭ মার্চের সমাবেশে শেখ হাসিনা

বিএনপির শীর্ষ দুই পদে দুই আসামি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিএনপির শীর্ষ দুই পদে দুই আসামি

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চে গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : পিএমও

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশকে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে যত বাধাবিঘ্ন আসুক না কেন, আমরা তা অতিক্রম করতে পারব ইনশা আল্লাহ। বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলব বঙ্গবন্ধুর সেই চেতনায়—ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে।

আজকের দিনে এটাই আমাদের শপথ। জাতির পিতা পথ দেখিয়ে গেছেন, আমরা সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করব। বাংলাদেশ বিশ্বে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবে। ’

বিএনপি আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে—উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই জবাব একদিন জাতির কাছে খালেদা জিয়াকে দিতে হবে এবং এর বিচারও বাংলার মাটিতে হবে। খালেদা জিয়াকে আবারও বিএনপির চেয়ারপারসন এবং তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করারও সমালোচনা করেছেন তিনি। বলেছেন, বিএনপির শীর্ষ দুই পদে দুই আসামিকে বসানো হয়েছে। একজন এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, আরেকজন অর্থ পাচার মামলার আসামি।  

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ উপলক্ষে গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এ সমাবেশের আয়োজন করে।

৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই ভাষণ ৪৫ বছর ধরে বাংলার মানুষের চেতনাকে উজ্জীবিত করছে, পৃথিবীর আর কোনো নেতার ভাষণ এমন নেই যে মানুষ ৪৫ বছর ধরে শুনছে, চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছে। সেই ভাষণ জাতির পিতা দিয়েছিলেন এ দেশের মানুষকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মুক্তি দেওয়ার জন্য, অর্থাৎ স্বাধীনতার জন্য। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সেখানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে) উপস্থিত থাকার। সে ভাষণ শোনার জন্য বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যে মানুষ এসেছিল, তাদের আসার জন্য গাড়ি ঘোড়া কিছু লাগেনি। যে যেভাবে পারে এখানে এসেছিল। কেন এসেছিল? একটি নির্দেশ পাবার জন্য। সেই নির্দেশ জাতির পিতা দিয়েছিলেন। এই ভাষণেই তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তিনি বলেছিলেন, যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবেলা করবে। এবং শেষে তিনি এ কথাও বলেছিলেন—আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তার মানে স্বাধীনতার প্রস্তুতি। ’

বিকেল ৩টার দিকে সমাবেশ শুরু হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে সমাবেশের মঞ্চে উপস্থিত হন। কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন নেতার বক্তব্য শেষে সোয়া ৫টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। ২৭ মিনিটের বক্তব্যে তিনি ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য, বিএনপির আন্দোলন, তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন, এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের অর্জনসহ সাম্প্রতিক বিষয়েও কথা বলেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তি ঘিরে সরকার পতনের দাবিতে বিএনপির আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৫ সালে আসলেন, বললেন আওয়ামী লীগ সরকারকে উত্খাত না করে ঘরে ফিরবেন না। ৬৮ জন মানুষ নিয়ে প্রায় তিন মাস অফিসে অবস্থান করলেন। প্রায় আড়াই শ মানুষ পুড়িয়ে মারা হলো, হাজার হাজার মানুষ সেই আগুনে দগ্ধ হয়ে যন্ত্রণা ভোগ করছে। কী অপরাধ ছিল তাদের? কেন তাদের পোড়াল খালেদা জিয়া? সেই জবাব একদিন তাকে জাতির কাছে দিতে হবে এবং এর বিচারও বাংলার মাটিতে হবে। ’

খালেদা জিয়াকে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেই নিরীহ মানুষগুলোর তো কোনো অপরাধ ছিল না। তাদের পুড়িয়ে, মানুষ খুন করে তিনি (খালেদা) আন্দোলন করেন। কিসের আন্দোলন? এই আন্দোলন আর কিছুই না, এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করা, যে উন্নতি হচ্ছে তা নস্যাৎ করা। কারণ, তাঁর আত্মা তো পড়ে থাকে পাকিস্তানে। তার সেই পেয়ারে পাকিস্তানে চলে গেলেই হয়, এ দেশের মানুষকে রেহাই দিলেই হয়। ’

খালেদা জিয়াকে আবারও বিএনপির চেয়ারপারসন ও তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করারও সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখলাম, বিএনপির চেয়ারপারসন আর ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত করা হলো। নাটকটা ভালোই করেছে। কাকে নির্বাচিত করল? দুইজনই আসামি। একজন এতিমের টাকা চুরি করে খাওয়া, এতিমখানার অর্থ আত্মসাৎ করার আসামি। আরেকজন তো একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় যেখানে আইভী রহমানসহ অনেককে হত্যা করা হয় সেই মামলা, মানি লন্ডারিং দুর্নীতির দায়ে পলাতক আসামি। সেই পলাতক আসামির নাম কিন্তু ইন্টারপোলে। ইন্টারপোলে যার নাম আসামি হিসেবে, ওয়ান্টেড হিসেবে আছে, তিনি হলেন বিএনপির নেতা। তাহলে এরা জনগণকে কী দেবে?’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা মানুষ খুন করতে জানে। নির্বাচন হতে দেবে না, সেই আন্দোলন করতে যেয়ে জীবন্ত মানুষগুলোকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। বলেছে, মানুষ পুড়িয়ে, বাসে-রেলে-গাড়িতে-লঞ্চে আগুন দিয়ে সরকার উত্খাত করবে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এ আগুন-সন্ত্রাসের কাছে মাথা নত করেনি বা তাদের সমর্থন দেয়নি। বরং এ দেশের সাধারণ মানুষই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘হাইকোর্ট রায় দিয়েছে। সেই রায়ে বলেছে, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল অবৈধ। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীর হাতে গড়া যে দল, সে দল মানুষকে কী দেবে? যার জন্মই অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা দখলকারীর হাতে, তারা দেশের রাজনীতিকে কলুষিত করেছে। ’

জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘৭৫-এর ১৫ আগস্টে জাতির পিতাকে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হলো তার পর থেকে সব পাল্টে গেল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করা হলো। আমাদের পবিত্র সংবিধানে যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যারা পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল, পঁচাত্তরের পর তাদের আবার এ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। যেসব যুদ্ধাপরাধী সাজাপ্রাপ্ত, কারাগারে বন্দি ছিল তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। কে দিয়েছিল? অবৈধভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল জিয়া। তার কাজই ছিল—নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করত, খেতাবও পেয়েছিল, কিন্তু দালালি করেছে ওই পরাজিত শক্তির। গোলাম আযম গংদের প্রতিষ্ঠিত করে কারা? তাকে এ দেশে ফিরিয়ে আনে জিয়া। পরবর্তীতে তার স্ত্রী এদের পাসপোর্ট দেয়, নাগরিকত্ব দেয়। জিয়াউর রহমান যেমন এদের হাতে পতাকা তুলে দিয়েছিল, খালেদা জিয়াও তাদের হাতে পতাকা দেয়। ’

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরবর্তী পরিস্থিতি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘৭৫ থেকে ৯৬ পর্যন্ত ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো নিষিদ্ধ ছিল। তার পরেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেখানে যেখানে সুযোগ পেয়েছে প্রতিবছর ৭ মার্চ, ২৬ মার্চ এ ভাষণ তারা বাজাত। অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে, অনেককে জীবনও দিতে হয়েছে এ ভাষণ বাজাতে গিয়ে। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ ভাষণ আজকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ইতিমধ্যে ১২টি ভাষায় এ ভাষণ অনুবাদ করেছি এবং আরো কয়েকটি ভাষায় আমরা তা অনুবাদের ব্যবস্থা করছি। অথচ এ ভাষণকে জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও খালেদা জিয়া নিষিদ্ধ করে রেখেছে। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি যে চেতনা তা ধ্বংস করে পরাজিত পাকিস্তানের আদর্শকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ’

এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের রানার্সআপ হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ভাষণে বলে গেছেন, এই বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। ঠিকই বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারে না। খেলাধুলায়ও আমরা পিছিয়ে নেই। আমরা এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টিতে রানার্সআপ হয়েছি। আমরা ফাইনালে গেছি, ইনশা আল্লাহ আগামীতে আরো দূর যাব। ’

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, কেন্দ্রীয় নেতা মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন প্রমুখ। সমাবেশ পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ ও উপপ্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল।


মন্তব্য