জারিফকে একা ফেলে চলে গেলেন মাও-333072 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


গ্যাসের আগুনে ছারখার পরিবার

জারিফকে একা ফেলে চলে গেলেন মাও

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জারিফকে একা ফেলে চলে গেলেন মাও

সুমাইয়া বেগম

হাসপাতালে ছেলে জারিফের পাশের ইউনিটেই চিকিৎসাধীন ছিলেন মা সুমাইয়া বেগম (৪০)। মায়ের সঙ্গে দেখা করার আবদার করায় এর মধ্যে একদিন চিকিৎসকরা তাকে নিয়েও গিয়েছিলেন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে। কাচঘেরা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সে দেখেছে মায়ের সারা শরীর ব্যান্ডেজে মোড়ানো, নাকে-মুখে জড়ানো একগাদা নল। এত কিছুর ভিড়ে মায়ের মুখটাই সেদিন ঠিকমতো দেখা হয়নি ছেলেটির। সেই প্রিয় মুখ আর কখনো দেখাও হবে না তার। কারণ জারিফের পৃথিবী শূন্য করে না ফেরার দেশে চলে গেছেন মা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুমাইয়াকে গতকাল রবিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

রাজধানীর উত্তরার বাসায় গ্যাসের আগুনে দগ্ধ সুমাইয়াকে গত ১ মার্চ এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হার মানলেন তিনি। একই আগুনে পুড়ে এর আগে জীবন প্রদীপ নিভে গেছে সুমাইয়ার স্বামী শাহিন শাহনেওয়াজ ও দুই ছেলে সারলিন বিন নেওয়াজ (১৫) এবং জায়ান বিন নেওয়াজের (১৪ মাস)। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ভোরে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাড়ির সপ্তম তলার ফ্ল্যাটে গ্যাসের আগুনে পুড়েছিল তারা। জারিফও (১১) পুড়েছিল, তবে সে এখন আশঙ্কামুক্ত। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র জারিফকে গতকাল হাসপাতাল থেকে মামার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। 

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট থেকে সিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল সুমাইয়াকে। শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকরা তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় শনিবার থেকে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। 

সিটি হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক রাশেদ মাহমুদ গতকাল বলেন, ‘সুমাইয়া ক্লিনিক্যালি ডেড ছিলেন। হার্ট ছাড়া তাঁর শরীরের অন্য অংশ ঠিকমতো কাজ করছিল না। তাঁকে বাঁচানোর সব রকম চেষ্টা ছিল চিকিৎসকদের। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।’

শাহনেওয়াজ ছিলেন আমেরিকান দূতাবাসের মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার। ঘটনার দিনই মারা যান তাঁর দুই ছেলে সারলিন ও জায়ান। পরের দিন মারা যান শাহনেওয়াজ। শাহনেওয়াজের ভাতিজা মেহেদী রাহাত বলেন, সারলিন ও জায়ানের লাশ নানির বাড়ি বরিশাল সদরের নবগ্রাম রোডে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। গতকাল রাতে দুই সন্তানের পাশেই সুমাইয়াকেও দাফন করা হয়েছে। যদিও শাহনেওয়াজের লাশ ঝালকাঠি সদরের সরকারি কবরস্থানে তাঁর বাবার কবরের পাশে দাফন করা হয়। 

একই পরিবারের দগ্ধ পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে হারানোর শোকে ডুবেছে স্বজনরা। জারিফের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কায় আছে তারা। স্বজনরা কালের কণ্ঠকে বলে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুমাইয়াকে স্বামীসহ নিহত দুই সন্তানের খোঁজ জানানো হয়নি। যদিও তিনি একাধিকবার তাদের খবর জানতে চেয়েছিলেন। তিনি বারবার বলেছেন, ‘আমার মনে হয় তারা কেউ বেঁচে নেই।’ শেষ পর্যন্ত প্রিয় মুখগুলোর পরিণতি না জেনেই চলে যেতে হলো তাঁকে। জারিফকেও এখনো মা-বাবা ও দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি।

সুমাইয়ার মামাতো ভাই আবু সুফিয়ান বলেন, সুমাইয়া মারা গেছে। কিন্তু এর পরও মনকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারছি না। সর্বনাশা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে একটি পরিবার। বেঁচে থাকা একমাত্র ছেলে মাকে ফিরে পাওয়ার আশা থাকলেও সে আশাও শেষ হয়ে গেছে।

জারিফের চাচাতো বোন মিথিলা জামান পান্থি বলেন, জারিফ সুস্থ হওয়ার পথে। সে তার ভাইদের খুঁজছে। তাকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা চলছে। পরিবারের সবাই তাকে সময় দিচ্ছে। তবে মনে হচ্ছে মায়ের মৃত্যুর ঘটনা বুঝে গেছে সে।

জারিফের চাচা কামরুল আহসান বলেন, আগামী বছরই শাহনেওয়াজের সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর কথা ছিল। এখন সবাই না ফেরার দেশে পাড়ি জমাল। চোখের সামনে তছনছ হয়ে গেল সাজানো সংসার, আচমকা ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল সব স্বপ্ন।

অগ্নিকাণ্ড ও মৃত্যুর ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, সেদিন গ্যাস লাইনের ছিদ্র থেকেই দুর্ঘটনা ঘটে। বাড়ির মালিককে বিষয়টি জানালেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সুমাইয়াও মৃত্যুর আগে তাঁর বর্ণনায় এমনই দাবি করেছেন। তবে মালিকের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। এমনকি এ বিষয়ে কোনো মামলাই নেয়নি।

মন্তব্য