kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মনোবিজ্ঞানীদের সহায়তা নিয়ে মাকে জিজ্ঞাসাবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মনোবিজ্ঞানীদের সহায়তা নিয়ে মাকে জিজ্ঞাসাবাদ

রামপুরার বনশ্রীতে দুই সন্তানকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার মা মাহফুজা মালেক জেসমিন রিমান্ডেও এখনো একই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ। তাদের ভাষ্য মতে, তিনি শুধু বলছেন, ‘দুই সন্তানকে তিনিই হত্যা করেছেন।

’ এর আগে র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদেও তিনি একই কথা বলেছেন বলে দাবি করেছিল র্যাব। তবে নিবিড় তদন্তের অংশ হিসেবে মাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এবার মনোবিজ্ঞানীদের সহযোগিতা নিচ্ছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, নিজের সন্তানদের মৃত্যুর পর দায় স্বীকারের বিষয়টি কঠিন সিদ্ধান্তের ব্যাপার। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জেসমিন বারবার বলছেন, তিনিই দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন। এখন পর্যন্ত অন্য কোনো তথ্য মেলেনি।

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘জেসমিনের মধ্যে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি। তবে তিনি মানসিক রোগাক্রান্ত থাকতে পারেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। আমরা আশাবাদী, ঘটনার রহস্য পরিপূর্ণভাবে উদ্ঘাটিত হবে। হত্যার মোটিভ কী, তিনি একাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, তাঁর সঙ্গে এ ঘটনায় আরো কেউ জড়িত ছিল কি না—এ রকম আরো অনেক বিষয়ে জেসমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত অন্য নারীর মিসড কল পেয়ে বা স্বামীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা জানতে পেরে বাধ্য হয়ে জেসমিন দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এই পরিবারে আর্থিক অনটন ছিল। জেসমিনের স্বামী আমান উল্লাহ একটি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেন আর জেসমিন নিজেও মাস্টার্স পাস করা। সম্পর্কে চাচাতো বোন হলেও দুই পরিবারের অমতেই তাঁরা বিয়ে করেন। আমান গার্মেন্ট ব্যবসায় সম্পৃক্ত ছিলেন। পরবর্তী বাস্তবতা, আমান উল্লাহর আর্থিক অবস্থা, তাঁর রাত করে বাসায় ফেরা এবং আর্থিক আভাব-অনটনসহ পারিবারিক এমন অনেক বিষয়ে জেসমিনের মনোকষ্ট থাকতে পারে। তবে এসব কারণে তাঁদের মধ্যে কখনো মারামারি, কাটাকাটি হয়েছে—এ রকম কোনো তথ্য প্রতিবেশী বা স্বজনের কাছ থেকে তদন্তে পাওয়া যায়নি।

কোনো ধরনের চেতনানাশক ছাড়া একজন নারীর পক্ষে দুই শিশুকে হত্যা করা সম্ভব কি না জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এটি আমার কাছে অসম্ভব মনে হয় না। কারণ একজন মানুষ অনেক কিছুই পারে। এর আগে কদমতলীতে পাভেল ও পায়েল নামের দুই শিশুকে চেতনানাশকের মাধ্যমে মৃত্যু নিশ্চিত করে মাও আত্মহত্যা করেন। এ রকম একটা মামলা এখনো বিচারাধীন। তবে এ ক্ষেত্রে দুই শিশুকে চেতনানাশক খাওয়ানো হয়েছিল কি না তা জানতে আমরা ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছি। ’

রামপুরা থানার পুলিশ জানায়, থানাহাজতে কখনো কখনো জেসমিনের আচরণে অস্বাভাবিকতা প্রকাশ পাচ্ছে। বিষয়টি পুলিশকে ভাবিয়ে তুলেছে। হাজতের মধ্যে তাঁর আত্মহত্যার ভয়ও রয়েছে। এ কারণে ২৪ ঘণ্টা একজন করে মহিলা পুলিশ তাঁর দেখভাল করছেন।

রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় রিমান্ডে নিয়ে মাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন গতকালও তিনি আগের মতো একই ধরনরে বক্তব্য দিচ্ছেন। স্বামীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে দুই শিশু খুন হয়েছে কি না জানতে চাইলে ওসি বলেন, তদন্তে এখনো পর্যন্ত সে রকম কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একজন মা তাঁর সন্তানকে খুন করতে পারেন—সাদা চোখে এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নাও হতে পারে। তবে এ ধরনের ঘটনা সমাজে ঘটছে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।

ওসি আরো বলেন, তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। দুই শিশুর বাবা মামলার বাদী আমান উল্লাহকে এ বিষয়ে এর আগেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীকে মুখোমুখি করে এবং আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেও নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অধিকতর তদন্তের জন্য আমান উল্লাহ, শিশুদের দাদি, খালা, চাচা, গৃহশিক্ষক, দারোয়ান ও বাড়ির মালিককে প্রয়োজনে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আজ (রবিবার) সন্ধ্যার পর আমান উল্লাহ থানায় আসবেন। তাঁকে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি যেহেতু মামলার বাদী কাজেই তাঁর সঙ্গে আমাদের অনেক কাজও আছে। ’

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার পর দুই সন্তানের মা-বাবার কললিস্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে ডিবি ও র্যাব। তবে তাঁদের ফোনে বিবাহবহির্ভূত কোনো সম্পর্কের প্রমাণ এখনো মেলেনি। আরো যাচাই-বাছাই করে এরপর এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নুসরাত আমান (১৪) ও আলভী আমান (৬) মারা যায়। ঘটনার পর মা জেসমিন ও খালা মিলা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, খাবারের বিষক্রিয়ায় নুসরাত ও আলভীর মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের চিকিৎসকরা জানান, দুই শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর শিশু দুটির পরিবারের সদস্য, গৃহশিক্ষক, বাসার নিরাপত্তারক্ষী ও চায়নিজ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার, বাবুর্চিসহ কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বুধবার লাশ দাফনের পর গ্রামের বাড়ি থেকে দুই সন্তানের মা-বাবাকে ঢাকায় নিয়ে আসে র্যাব। তারপর র্যাব দাবি করে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদে দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেন মা জেসমিন। এরপর নুসরাত-আলভীর বাবা আমান উল্লাহ বাদী হয়ে রামপুরা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় জেসমিনকে একমাত্র আসামি করা হয়। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার আদালত জেসমিনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।


মন্তব্য