kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পুলিশকেও একই কথা বলছেন মা

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পুলিশকেও একই কথা বলছেন মা

রাজধানীর বনশ্রীতে দুই সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে পুলিশ রিমান্ডে থাকা মা মাহফুজা মালেক জেসমিনের বক্তব্য তিন দিন ধরে একই বৃত্তে ঘুরছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, জেসমিনের র‌্যাব হেফাজতে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান বক্তব্যের তেমন কোনো হেরফের হচ্ছে না।

তবে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতেও আগ্রহ প্রকাশ করেননি। এই গৃহবধূ পুলিশ হেফাজতে খাওয়াদাওয়া,  ঘুমসহ সব কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবেই করছেন। পুলিশ হেফাজতে থাকা কোনো সাধারণ আসামির এ রকম আচরণ আগে কখনো দেখা যায়নি বলে জানান তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, দুই সন্তানকে হত্যার অভিযোগ স্বীকার করে জেসমিন র‌্যাবকে যে কথা বলেছিলেন, পুলিশের হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদেও একই কথা বলছেন। যতবার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে ততবার তিনি স্বাভাবিকভাবে বলছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণেই তিনি দুই সন্তানকে খুন করেন। জেসমিনের স্বামীর অন্য কোনো নারীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলা নিয়ে তাঁদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল বলে কোনো তথ্য এখনো মেলেনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই সন্তান হত্যাকাণ্ডে র‌্যাবের কাছে যে ধরনের স্বীকারোক্তি দিয়েছেন জেসমিন, আমাদের কাছেও এখন পর্যন্ত ঠিক একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। বিষয়টি এতটাই স্পর্শকাতর যে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে না। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজে থেকেই দুই সন্তান হত্যার অভিযোগ স্বীকার করছেন। ’

জানা যায়, মাহফুজা ও তাঁর স্বামী আমান উল্লাহ সম্পর্কে চাচাতো ভাই-বোন। পারিবারিক সম্মতিতে দেড় দশক আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। আমান উল্লাহর পোশাকশিল্পের ব্যবসা রয়েছে। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী জেসমিন কিছুদিন কলেজে শিক্ষকতা করেন।

এদিকে জেসমিনের যে স্বীকারোক্তির কথা র‌্যাব-পুলিশ বলছে, তার সত্যতা নিয়ে এরই মধ্যে সংশয় প্রকাশ করেছে তাঁর ভাই জাকির হোসেন সরকার, ছোট বোন আফরোজা মালেক লিমাসহ পরিবারের সদস্যরা। বোন আফরোজা মালেক লিমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেসমিন আমার বড় বোন। বড় আপা তাঁর সন্তানদের অনেক ভালোবাসতেন। তাই আমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে দুই সন্তানকে আমার বোনই হত্যা করতে পারেন। ’

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বনশ্রীর বাসা থেকে ১৩টি আলামত জব্দ করে সিআইডির কাছে পাঠানো হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মোবাইল ফোনের কললিস্ট (সিডিআর) যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া ওই বাসা থেকে আরো যেসব তথ্য-উপাত্ত তদন্তকারীরা পেয়েছেন তাতেও এখনো কোনো প্রমাণ মেলেনি। ঘটনার পর দুই শিশুর বাবা, খালা, দাদিসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া যায়নি কোনো ক্লু। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বাসার নিরাপত্তারক্ষী, বাড়ির মালিক, ভাড়াটিয়া, নিহত শিশুদের বাবার বন্ধুসহ প্রতিবেশীদেরও। কিন্তু ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না সে বিষয়ে কোনো তথ্য মেলেনি। মা জেসমিন এখনো অনেকটা ভাবলেশহীনভাবে দুই সন্তানের হত্যার অভিযোগ স্বীকার করে যাচ্ছেন। তবে ঘটনাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় সব দিক বিবেচনায় রেখে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।  

এদিকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত পরিবারের কেউ জেসমিনের সঙ্গে দেখা করতে যায়নি। পুলিশের তথ্য মতে, পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর জন্য কেউ খাবারও পাঠায়নি। রামপুরা থানার ডিউটি অফিসার এসআই সীমা বলেন, সকালে পুলিশের বরাদ্দে থাকা রুটি, ভাজি ও ডিম দিয়ে নাশতা করেছেন জেসমিন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় অনেক মানুষের ভেতর এক ধরনের অবস্থা তৈরি হয়, এতে ওই ব্যক্তি নিজেই নিজের ক্ষতি করে, নইলে অন্য কারো ওপর দিয়ে তার ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে চায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে ডিপ্রেশন অব এগ্রেশন। ’ তিনি আরো বলেন, ‘জেসমিনের কর্মকাণ্ড খুব স্বাভাবিক মনে হলেও তিনি প্রকৃতপক্ষে অসুস্থ। তাঁর অনুভূতিগুলো বর্তমানে কাজ করছে না। নিজের সন্তানদের হত্যা করার পর তাঁর এমন স্বাভাবিক থাকার কথা নয়। জেসমিনের পরিবারের ইতিহাস খুঁজলে পাওয়া যাবে পরিবারের কোনো সদস্য অনেকটা তাঁর মতো ছিলেন বা আছেন। তবে তিনি কী কারণে তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তার। ’


মন্তব্য