kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মোহাম্মদ আলমের সেই বর্ণনা

কাজী হাফিজ   

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মোহাম্মদ আলমের সেই বর্ণনা

‘আমি তখন মেজর জলিলের ৯ নম্বর সেক্টরে। ওপর থেকে নির্দেশ আসে, হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে কোনো একটি থানা মুক্ত করতে হবে।

সেক্টর হেড কোয়ার্টার হিঙ্গেলগঞ্জের কাছাকাছি থানা ছিল সাতক্ষীরার শ্যামনগর। ওই থানাটিই দখলমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা, লে. বেগ ওই অভিযানে সরাসরি অংশ নেন। বিকেলের দিকে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই আমরা থানা দখল করি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমাদের অভ্যর্থনা জানান। কিন্তু আমরা কেউই ধারণা করতে পারিনি যে প্রতিরোধ না করার বিষয়টি ছিল হানাদার বাহিনীর কৌশল। আমরা সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। এলাকাবাসীও আমাদের অভিনন্দন জানাতে সেখানে হাজির হয়। স্থানীয় একজন আমাদের খাওয়ার জন্য দুটো গরু জবাই করেন। রাতে উৎসবের আমেজে খাওয়াদাওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের গান বাজতে থাকে। কিন্তু ফজরের আজানের সাথে সাথেই অতর্কিতে আক্রান্ত হই আমরা। আমাদের অবস্থান ছিল থানায় ও ওয়াপদা অফিসে। হানাদার বাহিনী যে তিন কিলোমিটার দূর দিয়ে আমাদের ঘেরাও করে রেখেছিল তা আগে টের পাইনি। ওদের আক্রমণ এতটাই অতর্কিত ছিল যে আমাদের সেন্ট্রিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই জবাই হয়ে যায়। আমাদের মরণপণ প্রতিরোধে হানাদার বাহিনীকেও ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। আমাদের ক্ষয়ক্ষতিই বেশি ছিল। ওই অভিযানে আমরা ২৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নিই। পরে ফিরতে সক্ষম হই মাত্র ৩০-৩৫ জন। বাকিরা শহীদ অথবা গ্রেপ্তার হন। ’

এই বর্ণনা মোহাম্মদ আলমের। একাত্তরে তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের তথ্য অধিদপ্তর থেকে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ‘ওয়ার ফটোগ্রাফার’। সে কারণে যুদ্ধক্ষেত্রের অনেক ঐতিহাসিক মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। সাক্ষী হয়েছিলেন বাঙালির চিরগৌরবময় এক ইতিহাসের। কেবল ক্যামেরা নিয়ে যুদ্ধে ছবি ধারণ নয়, অস্ত্র হাতে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তেও হয়েছে তাকে। রণক্ষেত্রে কখনো জয়ের আনন্দ কখনো বা সহযোদ্ধাদের মর্মান্তিক মৃত্যুর বেদনা তাঁকে বহন করতে হয়েছে দীর্ঘদিন।

ওয়ার ফটোগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগেও একাত্তরের ২৫ মার্চের ভয়াল সেই রাতে এবং পরদিন সকালেও মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে পেশাগত দায়িত্ব পালনে পিছু হটেননি মোহাম্মদ আলম। পলাশীতে ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে, শহীদ মিনারের কাছে—যেখানেই লাশের স্তূপ সেখানেই ক্যামেরা হাতে ছুটে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ আলম। ৬২ বছর বয়সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আলম ক্যামেরা ছাড়েননি। ২০০৮ সালের ১০ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। তখন তিনি ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান ফটো সাংবাদিক।

মোহাম্মদ আলম যুদ্ধদিনের স্মৃতি হাতড়ে ২০০৫ সালের ১২ ডিসেম্বর এ প্রতিবেদকের কাছে তাঁর বিবেচনায় সবচেয়ে বিয়োগান্তক নানা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন। থানা মুক্ত করার ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি ছিল একাত্তরের জুন মাসের পরের দিকে। মুক্তিযোদ্ধা হাবিলদার ইসলামের কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার সময় তিনি পানি খেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার পাশে তখন একের পর এক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়ে যাচ্ছেন। ওই অবস্থায় তাঁর জন্য পানির ব্যবস্থা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। একপর্যায়ে হানাদার বাহিনীর ব্যূহ ভেঙে ক্যাপ্টেন নুরুল হুদাসহ আমরা কয়েকজন বেরিয়ে আসতে সক্ষম হই। ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা হাই পাওয়ারের চশমা পরতেন। চশমা ছাড়া চলতে পারতেন না তিনি। তার সেই চশমা ভেঙে যায়। আমি আমার চায়নিজ রাইফেলটি খালের পানির মধ্যে হারিয়ে ফেলি। তবে ক্যামেরাটি রক্ষা করতে সক্ষম হই। তাতে ধারণ করা ছিল ওই অভিযানে যাওয়ার এবং থানা দখলমুক্ত করার পর সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্যটি, যে ছবি পরদিন বিশ্বের অনেক সংবাদপত্রে ছাপা হয়। ’

যুদ্ধে যাওয়ার আগের পরিস্থিতি বর্ণনা করে মোহাম্মদ আলম বলেন, “আমি তখন দৈনিক আজাদের ফটোগ্রাফার। পত্রিকার পক্ষ থেকে ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের আগে প্রেসিডেন্ট হাউসে (বর্তমানে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধা) বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের বৈঠক কভার করার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় আমাকে বলা হলো, রাত ৮টার দিকে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধু সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন। অন্য সব রিপোর্টার ও ফটোগ্রাফারের সঙ্গে আমিও সেখানে হাজির হই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু লুঙ্গি ও শার্ট পরা অবস্থায় বেরিয়ে এসে বললেন, ‘নো প্রেস কনফারেন্স। ’ এরপর অফিসের দিকে রওনা হই। ঢাকায় তখন থমথমে অবস্থা। কী হতে যাচ্ছে, সেই অনিশ্চয়তা সবার মধ্যে। আমাদের চিফ রিপোর্টার তখন ফয়েজ ভাই। তিনি রাত ১০টার দিকে আমাদের ডেকে বললেন, কাজ শেষ করে সবাই দ্রুত বাড়ি চলে যাও। কেবল রাতের শিফটের লোক থাকবে। আমি বাসায় চলে যাই। তখন লালবাগের একটি ভাড়া বাসায় থাকতাম আমি। সোয়া ১১টার দিকে গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাই। ট্রেসার গুলিতে আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে। পেশাগত তাগিদে দ্রুত ক্যামেরা হাতে বের হয়ে পড়ি। পলাশীতে ফায়ার সার্ভিস অফিসের কাছে গিয়ে দেখি, সেখানে যত কর্মী ছিল সব ডেড। নতুন খোঁড়া মাটির ওপর লাশের পর লাশ পড়ে আছে। গোলাগুলির শব্দ আসছে তখন এসএম হল ও ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) দিক থেকে। ইকবাল হলে ঢোকার চেষ্টা করি, কিন্তু ব্যাপক গোলাগুলির কারণে তা সম্ভব হয় না। সেখান থেকে রাত সাড়ে ১২টার দিকে দ্রুত আজাদ অফিসে পৌঁছাই। সেই রাতের গণহত্যার ২৪-২৫টি ছবি তুলেছিলাম। ওই সব ছবি তৈরি করে দেওয়ার পর ফয়েজ ভাই আবার বললেন, ‘আইডেন্টিটি কার্ড সঙ্গে নিয়ে বাসায় চলে যাও। ’ তখন প্রায়ই কারফিউয়ের কারণে আমাদের কারফিউ পাস হিসেবে আইডেন্টিটি কার্ড ব্যবহার করতে হতো। বাসায় ফেরার পথে চানখাঁর পুলের দিক থেকে ব্যাপক গুলির শব্দ শুনি। রোকেয়া হলের সামনে, শহীদ মিনারের কাছে, শাঁখারী বাজারে আগুন জ্বলছে। শাঁখারী বাজারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জ্বালানো আগুন আর অনেক জায়গায় তাদের প্রতিরোধের জন্য জনগণের লাগানো আগুন। টায়ার জ্বালিয়ে, রাস্তায় গাছের গুঁড়ি দিয়ে তাদের প্রতিরোধের চেষ্টা তখনো চলছিল। পরদিন সকালে আবারও ক্যামেরা কাঁধে বাইসাইকেলে চেপে বেরিয়ে পড়ি। ঢাকা মেডিক্যালে পৌঁছে দেখি, নার্সদের মুখ থমথমে। ওঁরা আমাকে একটি চটের ব্যাগ দিয়ে তার মধ্যে ক্যামেরা লুকিয়ে রাখার পরামর্শ দিলেন। শহীদ মিনারের কাছে, ইকবাল হলে লাশের পর লাশ। রাস্তার ফুটপাতে পড়ে আছে লাশ। ডালপুরিওয়ালা, ফুচকাওয়ালাসহ ফুটপাতের যত লোক সবাইকে হত্যা করেছে ওরা। লাশের স্তূপ জগন্নাথ হলে। এই চরম বর্বরতার দৃশ্য কান্নায় ঝাপসা হয়ে আসা চোখে ক্যামেরায় ধারণ করি আমি। কিন্তু সংবাদপত্রে তার কিছুই ছাপা হয় না। পরদিন ২৭ মার্চ কিছুটা সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। ওই দিন সকালেও বিভিন্ন এলাকা ঘুরে হানাদার বাহিনীর বর্বরতার ছবি তুলি। কেবল ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের দিকে হানাদার বাহিনীর ব্যারিকেডের কারণে যেতে পারিনি। শহীদ মিনারের কাছে রেডিওর সামনে কিছু লোকের জটলা চোখে পড়ে। হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের কথা প্রচার করছিল। এ সংবাদে আরো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। যত দূর মনে পড়ে, আজাদ অফিসে তখন টাঙ্গাইলের শফিক ভাই সাব-এডিটর হিসেবে ছিলেন। তিনি আমাকে বলেন, ‘তুমি যদি যুদ্ধে যেতে চাও তাহলে আর দেরি কোরো না। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ অবস্থায় সিদ্ধান্ত নিতে হলে এখনই তা নেওয়া উচিত। ’ এরপর আমি প্রেসক্লাবে চলে আসি। সেখানে ফটোগ্রাফার লাল ভাইও একই পরামর্শ দিলেন। বললেন, ‘তোমার কাছে কয়েক দিনের তোলা ছবিগুলো কাজে লাগাতে হলে তুমি চলে যাও। ’ আমার মধ্যে তখন আর কোনো দ্বিধা নেই। ” 

মোহাম্মদ আলম বলেন, “কলকাতায় গিয়ে এম আর আখতার মুকুলের সঙ্গে দেখা করি। টাঙ্গাইলের মান্নান সাহেব ও জিল্লুর রহমান ছিলেন। তাঁরা আমাকে থিয়েটার রোডে তাজউদ্দীন আহমদের কাছে নিয়ে যান। তিনিই আমাকে তথ্য অধিদপ্তরে ওয়ার ফটোগ্রাফার হিসেবে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। আমার থাকার ব্যবস্থা হয় পার্ক সার্কাসে জয় বাংলা অফিসে। সেখানে উস্তাদ বড়ে গোলাম আলীর খানের পরিত্যক্ত বাসাটিই তখন জয় বাংলা অফিস। আমার বেতন নির্ধারণ করা হয় ৩০০ টাকা। এক মাসের বেতন অগ্রিম দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে থাকতে ইচ্ছুক ছিলাম না। আমার ইচ্ছা ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার। কিন্তু আমাকে বলা হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে বা সেক্টর হেড কোয়ার্টারগুলোতে যেতে হলে নানা ধরনের অনুমতি প্রয়োজন। হঠাৎ করে যাওয়া যাবে না। পরে নিয়মমাফিক পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ অবস্থায় কিছুদিন আমার কাজ জয় বাংলা অফিসের পত্রিকা বিভাগেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই সুযোগটি এসে গেল। পত্রিকা অফিসে খোলা জিপে একজন লোক হাজির হন। এসেই তিনি আমার কাছে পত্রিকা চান এবং আমি সেখানে কী করছি তাও জানতে চান। নিজের পরিচয় দেন মেজর জলিল বলে। তাঁকে সব কিছু বলার পর তিনি বলেন, ‘তোমার যখন ক্যামেরা আছে, পরিচয়পত্র আছে, তখন আর কিছু অনুমতির দরকার নেই। গাড়িতে ওঠো। আমিই তোমাকে নিয়ে যাব। ’ ইতিমধ্যে এম আর আখতার মুকুল ভাইও সেখানে আসেন। তিনিও যেতে বলেন আমাকে। আমি মেজর জলিলের সঙ্গে চলে যাই ৯ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার হিঙ্গেলগঞ্জে। ওই এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রমের বেশ কিছু ছবি তুলে প্রশংসিত হই। ”


মন্তব্য