জমি জালিয়াতির মূলে স্বত্বলিপি না-332690 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


জমি জালিয়াতির মূলে স্বত্বলিপি না থাকা

আপেল মাহমুদ   

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জমি জালিয়াতির মূলে স্বত্বলিপি না থাকা

দেশে জমিজমা নিয়ে যত জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম-অরাজকতা, তার অন্যতম প্রধান কারণ সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে স্বত্বলিপি (রেকর্ড অব রাইটস-আরওআর) না থাকা। স্বত্বলিপিতে জমির মালিকের নাম-ঠিকানা-পরিচয়, মৌজা, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, জমির শ্রেণি ইত্যাদি প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ থাকে। কিন্তু এই স্বত্বলিপি যুগ যুগ ধরে রয়ে গেছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে। অথচ জমিজমার দলিল রেজিস্ট্রি হয় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে। তাই সাবরেজিস্ট্রাররা যখন কোনো জমির দলিল রেজিস্ট্রি করেন, তখন দলিল লেখকদের সরবরাহ করা পর্চা, খাজনার রসিদ ও নামজারির কাগজপত্রের ওপরই নির্ভর করতে হয় তাঁদের। সেগুলোর ভিত্তিতেই রেজিস্ট্রির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে থাকেন তাঁরা। তথ্যগুলোর সত্য-মিথ্যা যাচাই করার কোনো সুযোগ তাঁরা পান না। এক রকম ‘অন্ধ বিশ্বাসেই’ দলিল রেজিস্ট্রি সারেন তাঁরা। আর এই সুযোগটিই নিয়ে থাকে অসাধু ব্যক্তি ও জালিয়াতচক্র।

এ ছাড়াও স্বত্বলিপির অভাবে জমির শ্রেণি জালিয়াতির কারণে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লোকসান দিচ্ছে সরকার। রেজিস্ট্রেশন আইন ও বিধিমালায় দেশের প্রতিটি রেজিস্ট্রি অফিসে মৌজাওয়ারি আরওআর সংরক্ষণ থাকার কথা। কিন্তু বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে সাবরেজিস্ট্রাররা তা পাচ্ছেন না। ফলে জমির সঠিক শ্রেণি নির্ধারণ করাও সম্ভব হচ্ছে না।

নিবন্ধন পরিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৯৩৫ সালে প্রণীত বেঙ্গল সার্ভে ও সেটেলমেন্ট আইনে সুস্পষ্টভাবে রেকর্ডের স্বত্বলিপি দেশের প্রতিটি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে পাঠানোর কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ৮০ বছরেও আইনটি কার্যকর হয়নি। ফলে এর ফাঁক দিয়ে যুগ যুগ ধরে দেশের সব সাবরেজিস্ট্রি অফিসে জাল দলিল রেজিস্ট্রি এবং ঘুষ-দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে।

নিবন্ধন পরিদপ্তরের আইজিআর (ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন) খান মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এটি অনেক দিনের অমীমাংসিত বিষয়। অনেকবার মৌখিক এবং লিখিতভাবে জানানোর পরও ভূমি মন্ত্রণালয় স্বত্বলিপির কপি সরবরাহের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’

একাধিক সাবরেজিস্ট্রার কালের কণ্ঠকে জানান, কোনো জালিয়াতচক্র ভিটি জমিকে নাল এবং বাণিজ্যিক স্থাপনাকে সাধারণ বাড়ি উল্লেখ করে রেজিস্ট্রি করতে এলে তাঁদের করার কিছু থাকে না। তাঁদের কাছে স্বত্বলিপি বই থাকলে সেটা যাচাই করে প্রকৃত শ্রেণি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেত। একই সঙ্গে জমির প্রকৃত মালিকের নাম এবং জমির পরিমাণ জানা সম্ভব হতো।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত বেশ কয়েকজন সাবরেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের অফিসে জমির স্বত্বলিপি সংরক্ষণ না থাকায় প্রতিনিয়ত ভুয়া দাতা-গ্রহীতারা দলিল রেজিস্ট্রির সুযোগ পাচ্ছেন। রেজিস্ট্রি আইন ও বিধিমালায়ও অনেক ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। আইনে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে সাবরেজিস্ট্রাররা ভূমি অফিসে গিয়ে কাগজপত্র যাচাই করে এসে দলিল রেজিস্ট্রি করবেন। বরং রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩৪ ও ৩৫ ধারা অনুযায়ী একজন সাবরেজিস্ট্রারের এ ধরনের কোনো সুযোগই নেই। তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবেই দলিল রেজিস্ট্রি করা বা না করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সাবরেজিস্ট্রার জানান, দেশের ৪৯৩টি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে স্রেফ বিশ্বাসের ওপর দলিল রেজিস্ট্রি করতে হচ্ছে। এ কারণে অপরাধ করলেও সাবরেজিস্ট্রাররা মাফ পেয়ে যাচ্ছেন। এমনকি রেজিস্ট্রেশন আইনেও কিছু ক্ষেত্রে তাঁদেরকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। 

ঢাকার বাড্ডা সাবরেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ জানুয়ারি একটি বেসরকারি ব্যাংকের পুরান ঢাকার এক শাখা থেকে সিলভার ট্রেডিং কম্পানির স্বত্বাধিকারী মজিবুর রহমান শামীমের নামে চার কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ঋণের বিপরীতে দক্ষিণখান মৌজার ৮১ শতাংশ জমি বন্ধক রাখা হয়। কিন্তু পরে মর্গেজ দলিল রেজিস্ট্রির সময় দাখিল করা কাগজপত্র ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়।

বাড্ডার সাবরেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাঝে মাঝে যেসব জালিয়াতির ঘটনা ধরা হয় সেটা সাবরেজিস্ট্রারদের ব্যক্তিগত যোগ্যতার ফসল। যদি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে জমির স্বত্বলিপি সংরক্ষিত থাকত তাহলে এ ধরনের ঘটনা উদ্ঘাটন করা সহজ হতো এবং জাল দলিল রেজিস্ট্রি অনেক কমে যেত।’

রেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক সূত্র জানায়, বিভিন্ন জালিয়াতচক্র ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে স্বত্বলিপি না থাকার কারণেই জাল দলিল, পর্চা, খাজনার রসিদ ও নামজারির কাগজপত্র দাখিল করে বন্ধকি দলিল রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হচ্ছে।

গুলশান সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল যাচাইকাজে অভিজ্ঞ মনির হোসেন মোল্লা (মঞ্জু) বলেন, ‘জাল দলিলের কারণে সামাজিক বন্ধনও শিথিল হয়ে যাচ্ছে। ওয়ারিশরা জমির ভাগবাটোয়ারার সময় কারসাজির আশ্রয় নিচ্ছে, যার কারণে ভাই বোনের মুখ, বোন ভাইয়ের মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ করে দিচ্ছে। দেশের সব রেজিস্ট্রি অফিসে স্বত্বলিপি সরবরাহ করার মাধ্যমেই এসব জটিলতার নিরসন করা সম্ভব।’

ভূমি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে নিয়ন্ত্রণ শাখার হিসাব নিয়ন্ত্রক মো. মশিউর রহমানের ২০১৫ সালের ১৫ মার্চে স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানা যায়, ঢাকা জেলার সাভার সাবরেজিস্ট্রি অফিসে স্বত্বলিপি জালিয়াতি করে অনেক দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে। এর ফলে সরকারের মোটা অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ঘটেছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাবরেজিস্ট্রারদের ওপর কর্তৃত্ব করা নিয়ে আইন ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঠাণ্ডা লড়াই চলছে। আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সাবরেজিস্ট্রারদের ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনার জন্য বিগত দিনে কয়েকবার চেষ্টা-তদবির করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।

একাধিক জেলা রেজিস্ট্রার ও সাবরেজিস্ট্রার বলেন, জমি জরিপের পর স্বত্বলিপি তৈরি করে থাকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জরিপ ও রেকর্ড অধিদপ্তর। বারবার লিখিতভাবে চাওয়ার পরও তারা রেকর্ডের স্বত্বলিপির কপি দিচ্ছে না।

ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল জলিল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এক সেট করে স্বত্বলিপি দেওয়া হলে একদিকে যেমন জাল-জালিয়াতি কমে যাবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে কয়েক গুণ। কিন্তু অসংখ্যবার দাবি করেও ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে তা পাওয়া যাচ্ছে না।’

বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. মাহফুজুর রহমান খান বলেন, ‘গত অর্থবছরে দলিল রেজিস্ট্রি খাত থেকে সরকার ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। আর স্বত্বলিপি বই যাচাই করে দলিল রেজিস্ট্রি করা হলে এ আয় প্রতিবছর কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত।

বাংলাদেশ দলিল লেখক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ফরিদুল ইসলাম বাহাদুরও একই কথা বলেন।

মন্তব্য