ট্রফিই কি তবে মাশরাফির ‘বিদায়ী-332687 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


ট্রফিই কি তবে মাশরাফির ‘বিদায়ী উপহার’

মাসুদ পারভেজ   

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ট্রফিই কি তবে মাশরাফির ‘বিদায়ী উপহার’

গতকাল দুপুরের তপ্ত রোদে ট্রেনার মারিও ভিল্লাভারায়েন ড্রেসিংরুম থেকে জনা আটেক ক্রিকেটারকে নিয়ে মাঠ ‘চক্কর’ দিতে বের হলেন। এঁদের মধ্যে তামিম ইকবাল এক পাক দিয়ে এসেই এমন এক প্রশ্নের মুখে পড়লেন যে একদম থ মেরে গেলেন। পরিচিত একজনের মুখে এ রকম কিছু শোনার প্রস্তুতিই ছিল না হয়তো, ‘কী, ভিক্টরি  ল্যাপ দেওয়ার অনুশীলন করে এলেন নাকি?’ বাংলাদেশ দলের ওপেনার নিরুত্তর থাকলেও স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শকের সামনে বিজয়ীর বেশে দৌড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন নিশ্চয়ই। এটি তো আজ রাতে পুরো বাংলাদেশের পরম প্রার্থিত ছবিও। সেই ছবিটা এখন পর্যন্ত কল্পিতই। তবে কল্পনার সেই ছবিটা প্রবল বাস্তবে অনূদিত করার লক্ষ্যেও কম মরিয়া হয়ে নেই তামিমরা।

একেই এবার আর শিরোপার দুয়ার থেকে ফিরতে চায় না বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে শিরোপার চৌকাঠ ডিঙিয়ে একজনকে বিদায়ী উপহার দেওয়ার তাড়নাও তো কম নয়। ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপের ফাইনালটিই যে হতে চলেছে দেশের মাটিতে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। এমনিতে ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেই ক্রিকেটের এই ফরম্যাটকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন তিনি। সেই হিসাবে আজকের পর দেশের মাটিতে অন্তত ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাটে তাঁকে খেলতে দেখার সম্ভাবনা নেই। সতীর্থরা এ উপলক্ষটি তাই স্মরণীয় করে রাখতে চাইবেনই। ‘বিদায়ী উপহার’ হিসেবে এশিয়া কাপের ট্রফির চেয়ে ভালো আর কী-ইবা হতে পারে!

যদিও বিদায় বা অবসর এমন বিষয় যে তা নিয়ে একটা লুকোছাপা চলেই। এই যেমন আজকের ম্যাচটি বাংলাদেশের মাটিতে শেষ ম্যাচ হওয়ার কথা ভারতের অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনিরও। কিন্তু সেদিন তা জিজ্ঞাসার জবাবে হাসতে হাসতে উল্টো বলছিলেন, ‘এত আগেই যাচ্ছি না। বাংলাদেশে আরো খেলতে আসব তো!’ মাশরাফি দেশের মাটিতে আরো খেলবেন যেমন বললেন না, তেমনি অবসরের বিষয়টি স্বীকারও তো করলেন না। কালকের সংবাদ সম্মেলনে একজন প্রসঙ্গটি তুলতেই মাশরাফির পাল্টা প্রশ্ন, ‘আপনাকে কে বলেছে যে এটি দেশের মাটিতে আমার শেষ ম্যাচ?’

প্রশ্নকর্তা অনেকের কাছ থেকে শুনেছেন বলাতে মাশরাফি বললেন, ‘অনেকে বলেছেন কিন্তু আমি তো বলিনি।’ নিজের বিদায়ের রং ছড়িয়ে দিতে না পেয়ে অধিনায়ক বরং আজকের ফাইনালেই মজে থাকতে চান, ‘আমাদের জন্য বড় একটি ম্যাচ। আমার শুরু বা শেষ কোনো ব্যাপার নয়। বাংলাদেশে ক্রিকেটের জন্য বড় ম্যাচ, এতে ভালো করার সর্বোচ্চ চেষ্টাই আমরা করব।’ নিজের অবসর ভাবনা লুকানোর কারণ অবশ্য গোপন নেই। তাঁর অবসর নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনার সারমর্ম হলো, সতীর্থদের অনুরোধেই বিদায়ের কথাটা ঘটা করে বলছেন না মাশরাফি। সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ না রাখলেও এটি গোপন রাখছেন কারণ এতে করে দলের ‘ফোকাস’টা না আবার নড়ে যায়। সতীর্থদের দাবি অনুযায়ী টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি খেলে তবেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি দেবেন তিনি।

সুযোগ যখন আছে, তখন তার আগে দেশের মাটিতে শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচের পর ট্রফির চেয়ে আদর্শ উপহার আর কিছু হয় না। সেটি তুলে ধরতে পারলে তাঁর চেয়ে খুশিও নিশ্চয়ই কেউ হবেন না। কিন্তু আগেভাগেই তা বলে চাপ নেওয়া থেকে নিজেকে বিরতই রাখতে চাইলেন অধিনায়ক, ‘না জিতলে কিছুই না। আমি এভাবেই বিশ্বাস করি। এমন নয় যে বাংলাদেশের ক্রিকেট এখানেই থেমে যাবে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনেক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। এই টুর্নামেন্ট খুব ভালো বার্তা দিয়েছে যে টি-টোয়েন্টিতেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। জিতলে অসম্ভব ভালো লাগবে। কিন্তু না জিতলে কিছুই না। আমরা ঠিকই সামনে দিকে এগিয়ে যাব এবং ভালো করব।’

সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের অন্য রকমভাবে এগিয়ে যাওয়ার শুরুটাও যেন তাঁর হাতেই। কেবলই দুঃস্বপ্ন দেখে দেখে শেষ হতে থাকা ২০১৪ সালের শেষ দিকে আবার নেতৃত্বটা তাঁর কাঁধে আসে। ওই সময়ে দলের এমন পারফরম্যান্স যে সামনের বিশ্বকাপ ক্রিকেটকে ঘিরে নতুন কোনো দুঃস্বপ্নের উঁকিঝুঁকিও দেখতে পাচ্ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট। কিন্তু বিশ্বকাপে যাওয়ার পর ভোজবাজির মতোই যেন সব পাল্টে যেতে শুরু করল। ব্যর্থতার শুকিয়ে যাওয়া ফুল নয়, সাফল্যের পাপড়ি মেলা ফুলই ফোটাতে থাকল তাঁর দল। ওয়ানডে সাফল্যের এই ধারা চলল পুরো ২০১৫ জুড়ে। তখনো টি-টোয়েন্টিতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারা দলটি এই ফরম্যাটের বিশ্বকাপের আগে বড় দলের চেহারায়।

এরকম পাল্টে দেওয়া চেহারার জন্য তাঁর অবদানকেও বড় করে দেখা হয়। যদিও বাংলাদেশে ক্রিকেট নিয়ে যে মাতামাতি, তাতে আপত্তি জানিয়ে দুই দিন আগেও তাঁকে বলতে শোনা গেছে, ‘একটি ঘর দাঁড় করাতে হলে চারটি খুঁটি লাগে। একটি খুঁটির ওপর কিন্তু দাঁড়াবে না।’ দল নিয়েও তাঁর একই মত। একার চেয়ে সবার অবদানকেই বড় করে দেখতে চান তিনি। কিন্তু ‘মাশরাফি’ নামের খুঁটিটা না থাকলে কি এই পর্যায়ে আসত দল? তা নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে ‘না’ ভোটই যে জয়যুক্ত হয়ে আসছে বলে দেশের মাটিতে তাঁর বিদায়ের রাতটি আলো ঝলমলেই করে রাখার ইচ্ছে সতীর্থদের। সে জন্যই মনে মনে ‘ভিক্টরি ল্যাপ’ দেওয়ার ছবি আঁকা!

মন্তব্য