চাই আজ অন্য কান্না-332686 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৮ জিলহজ ১৪৩৭


চাই আজ অন্য কান্না

মোস্তফা মামুন,প্রিয় মাশরাফি,   

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চাই আজ অন্য কান্না

সেদিন মোহাম্মদ সামিকে বোকা বানিয়ে বলটা যখন বাউন্ডারির দিকে ছুটছে, তখন গোটা বাংলাদেশও বলটাকে ঠেলতে যে সঙ্গে ছুটছিল তুমি কি সেটা খেয়াল করেছ? করার কথা নয়। তুমি তখন ঋষির মতো মগ্ন।

কাজ তো আরো বাকি। সেই কাজটা করার সময়, মানে পরের বলটা যখন উড়ে যাচ্ছিল, তখন কি দেখতে পেয়েছিলে এর সঙ্গে আমরাও উড়ছি!  দেখোনি। দেখার কথাও নয়। তখনো তো তোমার কাজ বাকি। এবং আজ তোমার কাজের শেষটুকু বাকি।

ছোটবেলা দৌড়ঝাঁপ করে বড় হয়েছ, ১৫০০ মিটার দৌড় দেখেছ নিশ্চয়ই। কয়েকটা চক্কর দিতে হয়। আগের সব চক্কর সাফল্যের সঙ্গে শেষ করে আজ আমাদের শেষ চক্কর। ওই যে ফিনিশিং টেপ নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে ওরা। সেখানে বুক ছোঁয়ানোর নিয়ম। তুমি এবং তোমরা বুক ছোঁয়াতে শরীর নিংড়ে আজ আবার দৌড় দেবে। সেই দৌড়ে খালি চোখে দেখা যাবে ১১ জনকে। কিন্তু আসলে দৌড়াবে ১৬ কোটি। তোমরা দেবে শক্তি আর ঘাম। বিশ্বাস আর ভালোবাসায় আমরা চুকাব তার দাম।

নিশ্চয়ই জানো, বাংলাদেশে মার্কিন ভিসাকে ধরা হয় সাধারণের জন্য স্বপ্নের সবচেয়ে সোনালি ছাড়পত্র। কিন্তু গত তিন দিনের জোয়ার দেখে মনে হচ্ছে, এই ম্যাচের টিকিট আমেরিকার ভিসার চেয়েও দামি। টিকিটের জন্য লাইন দেওয়া, মার খাওয়া—এগুলো নতুন ব্যাপার নয়। এর মধ্যে আবার টিকিট ছিনতাইয়ের ঘটনা! প্রত্যাশার সর্বোচ্চ সীমানাকে উপমা দিয়ে বোঝাতে আমরা বলি ‘আকাশচুম্বী’। কিন্তু এবারেরটা আকাশকে চুমু খাওয়াটাওয়া নয়, আবেগের ধাক্কায় আকাশকেই উড়িয়ে দিতে চলছে। দেখে দেখে মনে হয়, আজ জিতলে বোধ হয় আকাশে আর বাংলাদেশে এক ইঞ্চিরও তফাত থাকবে না।

তোমার অবশ্যই মনে আছে চার বছর আগের দুই রানের ট্র্যাজেডি। জীবনের নিয়ম হলো সুখের স্মৃতি সময়ে ফিকে হয়ে যায়, দুঃখ ক্ষত হয়ে রয়ে যায়। মনে আছে, গত বিশ্বকাপে এই ভারতের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালের আগে এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ কি না—এই প্রশ্ন উঠল। তুমি বললে, ‘মনে হয় না। এশিয়া কাপের ফাইনালটা তার চেয়েও বড় ছিল।’

এতক্ষণ সংবাদ সম্মেলন নামের একটা আনন্দ আড্ডা চলছিল। তোমার কথায় রেশটা গেল হারিয়ে। কান্নাভরা সেই স্মৃতিটা দুঃখের এক বোতল নোনা জল যেন ছিটিয়ে দিল। সেদিন ভাবিনি এক বছরের মধ্যেই ক্ষতিপূরণের এমন সুযোগ চলে আসবে। পৃথিবীর নিয়ম এই যে এখানে লেনদেনের একটা অদৃশ্য খাতা আছে। সে যা নেয় তা ফিরিয়েও দেয়। আজ কি সেই ফিরিয়ে দেওয়ার দিন!

ভারত খুব বড় প্রতিপক্ষ। ঠিক। কিন্তু কত বড়! এই ভারতকে কি কয়েক মাস আগে প্রায় হোয়াইটওয়াশ করে ফেরাইনি এই মিরপুরে? কী বললে! বিরাট কোহলির ফর্মটা দারুণ যাচ্ছে! ঠিক। যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে, ওর ব্যাটের ফাঁক বের করা কোনো বোলারের কাজ নয়, ওই দেয়াল ভেদ করতে কিংবদন্তির অস্ত্রবিদ্যা জানা যোদ্ধার দরকার। কিন্তু এটা কি মনে পড়ে না যে কোহলি এত দুর্ধর্ষ অন্যদের কাছে, তাকে তোমরা বিমুখ করে দিয়েছিলে অল্পতেই। কিংবা বিশ্বকাপের সেই ম্যাচেও তো বিরাট সামান্যতেই ফিরে গিয়েছিল। মনে রেখো, বিরাট হোক আর বীর বাহাদুর হোক, শেষ পর্যন্ত ইনিংস শুরু হয় শূন্য থেকে। আগের ম্যাচগুলোতে দারুণ ব্যাট করেছে বলে ২০-৩০ রান ওকে বোনাস দেওয়া হবে না। কোহলির যম হয়ে ওঠা রুবেল নেই, মুস্তাফিজও গেল। কিন্তু এটা একটা তুচ্ছ ক্রিকেট দলের চিন্তা হতে পারে আর বাংলাদেশকে শুধু ক্রিকেট দল কে বলে! দুনিয়ার আর কোনো দলের সঙ্গে অত কোটি অদৃশ্য খেলোয়াড় নেই। এই খেলাটায় আর কোথাও এভাবে মানুষ নাচে না, এভাবে মানুষ কাঁদে না, এভাবে মানুষ লাফায় না। ক্রিকেট ছাপিয়ে পতাকা আর মানচিত্র মিলে এ এক বিস্তৃত আশ্চর্য ক্যানভাস। সেই ক্যানভাসটাকে কীর্তির রঙে আরেকবার ভরিয়ে দেওয়ার এই তো দিন!

জানো কি না কে জানে, কোথাও কোথাও ফাইনাল ম্যাচটাকে বলা হয় প্রথম ম্যাচ। এ জন্য এই ম্যাচে এসে আগের ম্যাচে কে কী করল না করল সেটা অর্থহীন হয়ে যায়। মুশফিক এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে এমন কিছু রান করেনি, ধরা যাক আজ ম্যাচ জেতানো একটা ইনিংস খেলে ফেলল। তখন টুর্নামেন্টের আগের ব্যর্থতাটা আর কারো মনে থাকবে না। তাঁর কাছেও এশিয়া কাপটা হয়ে থাকবে সাফল্যময় স্মৃতি। কিংবা নিজের ছন্দে না থাকা সাকিবের ব্যাট যদি গর্জে ওঠে তাহলে কি আমরা এ নিয়ে আর কথা বলব যে সাকিবের হলোটা কী? গত বিশ্বকাপে মারিও গোেজর কথা মনে করো। টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে ভালো করছিল না বলে বেচারা একাদশ থেকেই বাদ পড়ে যায়। ফাইনালে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামা এবং তারপর যা হলো তাতে ব্রাজিল বিশ্বকাপ তার কাছে চরম সুখের স্মৃতি। এখানেই ফাইনাল ম্যাচের মাহাত্ম্য যে আগে কে কতটা ব্যর্থ হয়েছে সেটা এখানে গোনাতেই ধরা হয় না। কথাগুলো বললাম মুশফিক আর সাকিবকে জাগিয়ে তুলতে। সক্ষমতাটা ওরা দেখাতে পারেনি, কিন্তু সময় চলে যায়নি। বরং আসল সময়টা আসলে বাকি। আজই।

এটা আর তোমাকে নতুন করে কী বলব, এই দেশে সবাই ঘরে ঘরে এখন একজন মাশরাফি চায়। কেউ ভাবে—ইস্, এ রকম যদি আমার একটা ভাই থাকত! কেউ মনে করে, যদি আমার ঘরে থাকত অমন ছেলে। এমনকি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িয়ে ছেলেকে ফুটফাট ইংরেজি শেখানো ধনাঢ্য বাবারাও যে আজ সাধারণ মফস্বল থেকে উঠে আসা মধ্যবিত্ত ছেলের দিক থেকে তাচ্ছিল্যে মুখ ফিরিয়ে নেন না তার কারণ মাশরাফিরা তো এদের মধ্য থেকেই তৈরি হয়। বীরত্ব আর কৃতিত্বের শেষকথা তুমি এখন, কিন্তু সেটা বোধ হয় ভাঙা চশমায় দেখা দৃষ্টিভঙ্গি। আসল সত্য হলো তুমি দল আর দেশকে এমন এক করেছ যে দুটোর অন্তর আর আত্মা এখন একটাই। অতীতের ভ্রান্তি-বিভ্রান্তিতে মাঝখানের সেতুটা হারিয়েই গিয়েছিল যেন। তুমি ফিরিয়ে দিলে অলৌকিক চাবি দিয়ে।

সুখের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দুঃখের কথা খুব মনে করতে নেই, তবু মনে করি তোমার একটা কান্না বাংলাদেশের চিরকালীন দুঃখগাথায় ঢুকে আছে অসহ্য যন্ত্রণার স্থিরচিত্র হয়ে। ২০১১ বিশ্বকাপের সেই কান্না মনে পড়লে আজও স্তব্ধ হয়ে যাই। তুমি কী মনে করেছিলে জানি না, কিন্তু অনেকে মনে করেছিল সেই কান্নাতেই আমরা তোমার শেষ দেখে ফেললাম। কিন্তু ওই যে আগেই বলেছি জীবনের লেনদেনের খাতা আছে। গত এক বছরে তোমার হাতে একেকটা সোনালি গল্প তৈরি হয় আর মনে হয়, হিসাব চুকানো চলছে। তবু বোধ হয় পূর্ণতার জন্য এই একটা বাঁক বাকি। একটা আন্তর্জাতিক ট্রফি হাতে উঠলে তোমার আর বাংলাদেশের প্রেমের গল্পটা পূর্ণতা পায়।

আবার পূর্ণতায় সেই চৌকাঠে দাঁড়িয়ে এটাও মনে রাখি যে শেষ পর্যন্ত যদি না-ও হয় তাতেও এমন কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। টি-টোয়েন্টি খেলতে না পারার জাতীয় হাহাকার তো দূর হয়ে গেল। পাকিস্তানকে মার্চে উড়িয়ে দেওয়ার তৃপ্তিও ঐশ্বর্যের সিন্দুকে ঢুকে রইল। আর তাই তুমি এবং তোমাদের প্রতি বাড়তে থাকা কৃতজ্ঞতার বৃত্তটা বড় হলো আরো একটু। আর এই কৃতজ্ঞতার জবাব দেব আজ সন্ধ্যায় মাঠের উন্মত্ত চিৎকারে। এবং তার আগে সারা দিনের শুভকামনা আর প্রার্থনায়।

মসজিদে-মন্দিরে-মনে-মনস্তত্ত্বে আজকের বাংলাদেশে শুধু তোমরাই। সেই বাংলাদেশে ক্ষুধা নেই, দারিদ্র্য নেই, অসুখ নেই। সুখী-সুন্দর এই বাংলাদেশে উৎসবের রঙের জোগান দিচ্ছে তোমাদের আশু কীর্তি। তোমাদের ঘাম আজ আমাদের আনন্দাশ্রু হয়ে ঝরার অপেক্ষায়।

আজকের প্রার্থনাময় বাংলাদেশে তোমরা ১১ জন ভালোবাসার বৃত্তে। আর আমরা ১৬ কোটি শুভকামনার ঘুড়ি উড়িয়ে ঘুরপাক খাচ্ছি স্বপ্নের হাওয়ায়।

আজ সকালে যে বাসটা হোটেল থেকে তোমাদের মাঠে নিয়ে যাবে, মনে রেখো, এটা ১৬ কোটির ভালোবাসার রথ। সেই ১৬ কোটি প্রথম সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তোমাদের সঙ্গেই আছে। আছে তোমাদের নিঃশ্বাসে। আছে গভীর বিশ্বাসে।

পুনশ্চ : চার বছর আগের এশিয়া কাপের ফাইনালের দিনে মুশফিককে একটা চিঠি লিখেছিলাম। সময় আর পরিস্থিতিটা এত অবিকল যে শেষটা সেখান থেকেই তুলে দিলাম। কিন্তু লেখার শেষের মতো ম্যাচের শেষটাও যেন একই রকম না হয়। সেদিন মুশফিকের সঙ্গে কেঁদেছিলাম। গভীর দুঃখের কান্না। আজও কাঁদতে চাই। অনিঃশেষ আনন্দের কান্না।

মন্তব্য