সেই গতির ঝড়ের আশায় বাংলাদেশ-332336 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


সেই গতির ঝড়ের আশায় বাংলাদেশ

সাইদুজ্জামান   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সেই গতির ঝড়ের আশায় বাংলাদেশ

একটা চেনা নম্বর দেখে ফোনটা ধরলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা, ‘কী? টিকিট? আরে ভাই আমি খেলব তাই জানি না কিভাবে ঢুকব, আর আপনি কি না টিকিট চাচ্ছেন! রাখি।’ রিখটার স্কেলে কালকের এশিয়া কাপ ফাইনালের রোমাঞ্চ বোঝাতেই কথোপকথনটা তুলে দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিতভাবেই আসবেন এবং আরো অনেকে। আসতে চাচ্ছেন না, এমন কেউ বাংলাদেশে আছেন কি না, জানা যায়নি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকেই হাজার দেড়েক টিকিটের ডিমান্ড নোট জমা পড়েছে। তা নিয়ে গতকাল দুপুরের অনুশীলনের পরও বেশ চিন্তাগ্রস্ত দেখিয়েছে ম্যানেজার খালেদ মাহমুদকে। সব মিলিয়ে সর্বগ্রাসী একটা আকর্ষণের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত ফাইনালকে ঘিরে।

কিন্তু নিশ্চিত করেই বলা যায়, প্রত্যাশিত সংখ্যার টিকিট না মিললেও ভিআইপি মর্যাদা নিয়েই মাঠে ঢুকবেন মাশরাফিরা, তাঁদের তো সত্যি সত্যিই টিকিট লাগে না! তাই টিকিট প্রার্থনার ফললাভের চেয়ে সবাই বেশি মনোযোগী চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে। সাকিব আল হাসান তো নেটে নতুন কেউ নন, তবে নেটে এত বেশি খাটতে তাঁকে অতীতে কে কবে দেখেছেন? শর্ট বোলিংয়ের বিপক্ষে একটু সমস্যা আঁচ করতে পেরেই কি না, লাগাতার খাটো লেন্থের বোলিংয়ের সামনে অনুশীলন করে গেছেন তিনি। ঘেমে নেয়ে তৈরি হয়ে বাসে ওঠার পরই কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে ডেকে পাঠান ইনডোরে। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাকে সামনে রেখে সাকিবের সঙ্গে কোচের গম্ভীর আলোচনার তাৎপর্য একটাই—দলে এতটুকু গুরুত্ব কমেনি সেরা অলরাউন্ডারের। একটু পর তামিম ইকবালকে ডেকে নিয়ে অধিনায়কের বিশেষ আলাপচারিতায় একটা বিষয় পরিষ্কার—বড় ম্যাচে বড় ক্রিকেটারদেরই দ্বারস্থ টিম ম্যানেজমেন্ট।

তামিমের বিস্ফোরক শুরু আর ব্যাটে-বলে সাকিবের জ্বলে ওঠার সম্ভাবনা দুশ্চিন্তার মেঘ হয়ে আছে ভারতের আকাশেও। ভারতের বিপক্ষে অতীত সাফল্য এবং সাম্প্রতিক ফর্ম মিলিয়ে তামিম ইকবালকে ঘিরে ভারতীয় সাংবাদিকদের বিপুল আগ্রহ কার্যত দেশটির টিম ম্যানেজমেন্টের রণপরিকল্পনার আংশিক প্রতিফলন তো বটেই। স্থানীয় সাংবাদিকদের যেমন আগ্রহের কেন্দ্রে বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা আর রবিচন্দ্রন অশ্বিনের ত্রিভুজ। তবে আগের রাতে ম্যাচ থাকায় তাঁরা সবাই দূরের তারা, মিরপুরের আশপাশেও আসেনি। মহেন্দ্র সিং ধোনি গিয়েছিলেন কুর্মিটোলা গলফ কোর্সে। গাঢ় সবুজের সমারোহে ‘ক্যাপ্টেন কুল’ আরো কতটা শীতল হয়েছে, কে জানে!

অবশ্য তা নিয়ে অত ভাবনা নেই বাংলাদেশ দলের। নিজেদের শক্তির ধার আরো কতটা বাড়ানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা চলছে দলে। টিম রুলসের বিধিনিষেধের কারণে সবাই ‘স্পিকটি নট’। তবে প্র্যাকটিসের ড্রিল দেখে অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে ভেতরে ভেতরে ভারতের জন্য সবরকমের বিকল্পই বাজিয়ে দেখছেন হাতুরাসিংহে। পেস বোলিং নিয়ে সাকিবের দুর্ভাবনার পেছনে কি নতুন কোনো ছক আছে দলের? পাঁচ নম্বরে নামা একজনের টানা পেস বোলিং খেলে যাওয়ার দৃশ্য নেটে খুব নিয়মিত নয়। তবে কি ব্যাটিংয়ে বহু কাঙ্ক্ষিত প্রোমোশন পাচ্ছেন তিনি? সে প্রশ্ন তুললেই সাপ দেখার মতো পালিয়ে যাচ্ছেন দল সংশ্লিষ্টরা। বিপিএলের সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকারি আবু হায়দার রনিকে নিয়ে পড়ে থাকলে বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক। হেড কোচেরও আকস্মিক আগ্রহ বেড়েছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের বাঁহাতি এ পেসারের প্রতি। তবে কি...? জিজ্ঞাসা করে নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। আপাতত সম্ভাবনার আলোতেই ফাইনালের একাদশে দেখা যাচ্ছে আবু হায়দারকে।

অবশ্য এর পেছনে বাংলাদেশের ক্রিকেটে পুরনো একটি চর্চার যোগসাজশও রয়েছে। প্রতিপক্ষে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের সংখ্যা মানেই বাঁহাতি স্পিনারের কাঁধ থেকে আস্থার হাত সরিয়ে নেওয়া। তো, ভারতীয় দলে স্বীকৃত ব্যাটসম্যানদের তিনজনই বাঁহাতি—শিখর ধাওয়ান, যুবরাজ সিং ও সুরেশ রায়না। সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান ম্যাচে খেলা আরাফাত সানিকে সরিয়ে জায়গা করে নিতে পারেন আবু হায়দার। তা ছাড়া কে না জানে পেস বোলিংয়ে কিছু দুর্বলতা আছে ভারতেরও। উদাহরণ হিসেবে হাতের কাছে এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচ তো তাজা স্মৃতি। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে, ফাইনালের উইকেটে ঘাস রেখে ভারতের পিলে চমকানোর ফন্দিও নাকি আছে টিম ম্যানেজমেন্টের। যুক্তিতে আরেকটি পরিবর্তন দেখা যেতে পারে বাংলাদেশ দলে। টপ অর্ডার থেকে ছিটকে গত ম্যাচে লোয়ার অর্ডারের জন্য প্যাড পরে বসে থাকা মোহাম্মদ মিথুনকে ফাইনালে ডাগ আউটেই দেখার সম্ভাবনা বেশি। সে জায়গায় ফিরতে পারেন উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান নুরুল হাসান।

কিন্তু তাতেই কি টি-টোয়েন্টির যুগে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা লোয়ার অর্ডারের দুর্বলতা ঘুচছে বাংলাদেশে? সাব্বির রহমান পদোন্নতি পেয়ে টপ অর্ডারে চলে যাওয়ায় সাকিব, মুশফিক আর মাহমুদ উল্লাহকে নিয়ে গড়া মিডল অর্ডারের পরই রক্তশূন্য হয়ে পড়ছে বাংলাদেশের ব্যাটিং! এ সমস্যার আশু কোনো সমাধান নেই কোচের হাতে। তাই বলে নেতিবাচক বিষয়টি সামনে এনে দলের ভেতরে স্নায়ুচাপ নাকি বাড়াতে চান না হাতুরাসিংহে। বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের ওপরই নাকি জীবনবাজি রেখেছেন তিনি। ঢিলেঢালা প্র্যাকটিসে বেড়ে ওঠা সাকিবের ঘাম ঝরানো নেট দেখে মনে হচ্ছে কোচের বার্তাটা দলের সবার মতো তাঁর কাছেও পৌঁছেছে।

বোলারদেরও কড়া হেডমাস্টারের শাসন থেকে মুক্তি নেই! বোর্ডরুমে যুক্তিতর্কের পর একটা পরিকল্পনা করা হয়। সে মতে বোলিং করে বোলার মার খেলেও অসন্তুষ্ট হন না হাতুরাসিংহে। কিন্তু উল্টোপাল্টা করলেই রেহাই নেই কারোর, নামটা যত বড়ই হোক না কেন। তবে চোট নিয়ে মুস্তাফিজুর রহমান ছিটকে পড়ার পরও পাকিস্তান ম্যাচে বোলারদের নৈপুণ্যে বেজায় খুশি কোচ। তবে একদিকে আঁটসাঁট বোলিং করে পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলে দেওয়া তাসকিন আহমেদ কিংবা টপাটপ উইকেট তুলে নেওয়া আল আমিন হোসেনও জানেন যে ফাইনালে গড়বড় করলে অতীত সাফল্যের সুবাদে রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। মাশরাফি-তামিম-সাকিব-মুশফিক-মাহমুদ উল্লাহর মতো সিনিয়র ক্রিকেটাররা এ ব্যবস্থাপত্র মেনে যখন নিয়েছেন, তখন তরুণদের বেগড়বাই করার সুযোগ কোথায়!

আর একটা জায়গায় পুরো দল একমত—শক্তিধর ভারতের বিপক্ষে ভুল করা যাবে না। একটা ভুলের শিকার তো প্রথম ম্যাচেই হয়েছে বাংলাদেশ। ভারতকে বাগে পেয়ে উইকেটের জন্য আরো বেশি ছটফট করেছেন বোলাররা। তাতে পাল্টা আক্রমণে ম্যাচ থেকেই স্বাগতিকদের ছিটকে দিয়েছেন রোহিত শর্মা এবং হার্দিক পান্ডে। সেই থেকে দলীয় সিদ্ধান্ত—ডেথ ওভারে উইকেট নেওয়ার চেয়ে রান আটকানোতেই মনোযোগী হতে হবে। রানের পেছনে ছুটতে গিয়ে উইকেট দেবে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানই।

সাফল্যের রেসিপি তো তৈরি, এখন রান্নার জন্য আগুনের আঁচটা ঠিকঠাক হলে হয়! তবে বাজি ধরেই বলা যায়, গ্যালারি অকাতরে সমর্থনের ‘আগুন’ দিয়ে যাবে মাশরাফিদের। মাঠে বল গড়ানোর আগে এ ক্ষেত্রে একতরফা ফেভারিট বাংলাদেশ। ক্রিকেট জিঙ্গোয়িজমে যে সেই পাকিস্তান ম্যাচের পর থেকেই কাঁপছে বাংলাদেশ! ভারতের সামর্থ্য, প্রোফাইল সে কম্পনে ধসে পড়েছে সেই কবে!

মন্তব্য