kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নবজাতক হত্যা

‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলেই বাঁচতে মানা

এস এম আজাদ   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলেই বাঁচতে মানা

দুই বছরের ফুটফুটে শিশুটির নাম সাফিয়া। রাজধানীর মগবাজারের মীরবাগের স্বপ্ন গলির ১/জি/১ নম্বর বাড়িতে গাড়িচালক শাহজাহানের বাসায় সে বেড়ে উঠছে।

সাফিয়া শাহজাহান ও তাঁর স্ত্রী মাহমুদার সন্তান নয়। বাড়ির পাশে পরিত্যক্ত স্থানে তাকে কুড়িয়ে পেয়ে লালনপালন শুরু করেছে এই পরিবার। শাহজাহানের তিন ছেলেমেয়ের সঙ্গে একই আদর-যত্নে বেড়ে উঠছে সেও। শাহজাহান বলেন, ‘ওর তো কোনো দোষ নেই। আমি ওকে আমার সন্তানের মর্যাদায়ই পালন করছি। অনেকে টাকার লোভ দেখিয়ে সাফিয়াকে নিতে চেয়েছে। আমি দেইনি। ’ তাঁর বড় মেয়ে হাবিবা বলেন, ‘আমরা এখন তিন বোন, এক ভাই। আমাদের নাম হাবিবা, সামিয়ার সঙ্গে মিল রেখে ওর নাম সাফিয়া রাখা হয়েছে। ’

২০১৪ সালের ১৭ মার্চ শাহজাহানের বাসার পেছনে রিকশার গ্যারেজে স্কুল ব্যাগে তোয়ালে মোড়ানো অবস্থায় পড়ে ছিল সাফিয়া। কান্না শুনে শাহজাহানের ছেলে হাসানই প্রথম দেখে, পরে ভিড় জমায় এলাকাবাসী। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে শাহজাহান স্ত্রী মাহমুদার কোলে তুলে

দেন সাফিয়াকে। শাহজাহানের বড় মেয়ে হাবিবা জানান, গত দুই বছরে মগবাজারের মীরবাগ ও মধুবাগ এলাকায় আরো আটটি নবজাতক উদ্ধার করা হয়েছে। খবর পেয়ে নতুন কোনো জীবন বাঁচানোর আশায় তাঁরা সেখানেও ছুটে গেছেন। কিন্তু উদ্ধারকৃত শিশুগুলো ছিল মৃত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় প্রতিদিনই সাফিয়ার মতো পরিচয়হীন শিশু উদ্ধার হচ্ছে, যাদের বেশির ভাগই মৃত। জন্মের পরই হত্যা করে ফেলে দেওয়া হচ্ছে তাদের। কখনো ফুটপাতে, কখনো বা রাস্তায়, কখনো ময়লার স্তূপে, হাসপাতালের করিডরে, ট্রেনের কামরায়, আবার কখনো জলাধারে—এভাবে নিঃশেষ হচ্ছে বহু প্রাণ। রাজধানীতেই ঘটছে বেশি ঘটনা। এখানে বছরে শতাধিক নবজাতকের মৃতদেহ উদ্ধার করছে পুলিশ। এসব শিশু মায়ের কোল তো দূরের কথা, বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও পাচ্ছে না। অন্যদিকে এই শহরেই অনেক নিঃসন্তান মা একটি সন্তানের জন্য হাহাকার করে ফিরছেন। তাই সাফিয়ার মতো কেউ বেঁচে গেলে সে সহজেই খুঁজে পায় নিরাপদ আশ্রয়। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর পূর্ব শেওড়াপাড়ার পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় আবর্জনার মধ্যে কুকুরের কবল থেকে এক মেয়ে নবজাতককে উদ্ধার করেন দুই নারী। কুকুড়ের কামড়ে আহত শিশুটিকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা। ১১ অক্টোবর তাকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছোটমণি নিবাসে হস্তান্তর করা হয়। গত ১ ফেব্রুয়ারি বেইলি রোডের একটি পাঁচতলা ভবন থেকে এক নবজাতককে নিচে ফেলে দেন তারই মা। পরে পুলিশ ওই মাকে উদ্ধার করলে প্রকাশ পায় এক ন্যক্কারজনক ঘটনা। কুমারী ওই মা ভবনটির গৃহকর্মী। আপন ভগ্নিপতির লালসার শিকার হয়ে তিনি গর্ভধারণ করেন। শিশুটি জন্ম নেওয়ার পর লোকলজ্জার ভয়ে তিনি নিজের সন্তানকে হত্যা করতে চান। হতভাগ্য সেই নবজাতককে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে বাঁচানোর প্রাণান্তর চেষ্টা চলে। তবে ২৫ দিন পর সে মারা যায়।

প্রায় প্রতিদিনই নবজাতকের লাশ উদ্ধার হলেও বেশির ভাগ ঘটনার রহস্য আড়ালেই থেকে যায়। সর্বশেষ গতকাল ভাটারার নূরেরচালা এলাকার কবরস্থান থেকে এক ছেলে নবজাতকের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। অজ্ঞাতপরিচয় ওই শিশুকে জন্মের পরই হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মানবাধিকার ও সমাজকর্মীরা বলছেন, “মহীয়সী নারী মাদার তেরেসার আহ্বান দেশে দেশে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে অনেক ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ শিশুকে। তবে আমাদের দেশে তৈরি হয়নি সেই সচেতনতা। মানবতাবাদী তেরেসা ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ সন্তানকে হত্যা না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা যদি সন্তান পালন করতে না পারো তবে আমাকে দিয়ে দাও। ’ সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, আমাদের দেশে প্রশাসনের উদাসীনতায় নবজাতক হত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। এসব ঘটনার রহস্য কখনোই উদ্ঘাটন করে না পুলিশ। শনাক্ত হয় না নবজাতকের মা-বাবা, পরিচয়। ”

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বের কোনো দেশে এভাবে নবজাতক হত্যা করে ফেলে রাখলে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হতো। একটি শিশু জন্ম নেওয়ার পর তার বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র্রের। তাকে হত্যার অধিকার কারোর নেই। ’ এলিনা খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুলিশ-প্রশাসনের উদাসীনতার কারণেই কারা এসব ঘটাচ্ছে তা বের হচ্ছে না। তদন্ত করে পরিচয় বের করা সম্ভব। হাসপাতাল, মেটারনিটি, অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি করে না পুলিশ। ’

কুড়িয়ে পাওয়া খুদে মরদেহগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। এই প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক (সার্বিক) মোহাম্মদ হালিম বলেন, ‘বছরে প্রায় ১০০ নবজাতকের লাশ দাফন করা হয়। ’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নবজাতকের লাশেরও ময়নাতদন্ত করতে হয়। বেশির ভাগ রিপোর্টে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই শিশু হত্যার আলামত উল্লেখ করা হয়। ’ মর্গ সূত্র জানায়, উঁচু ভবন থেকে নিচে ফেলার পর, পানিতে ফেলে দেওয়ায়, ডাস্টবিনে কুকুরের কামড়ে এবং কাপড় বা প্যাকেটে বদ্ধ অবস্থায় থাকার কারণেই বেশি শিশুর মৃত্যু হয়। অনেক শিশু প্রতিকূল পরিবেশে থেকে বা অনাহারে মারা যায়। অপকর্মের জন্য চুক্তিবদ্ধ ধাত্রীরা নাড়ি না কেটে প্রতিকূল পরিবেশে রেখেও শিশু হত্যা করে। ’

তদন্তে উদাসীনতা : স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্য তৈরি করা অর্ধশতাধিক নবজাতক উদ্ধার ঘটনার খোঁজ  নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ তদন্ত করে কিছুই বের করতে পারেনি। গত বছরের ১৮ মার্চ রাজধানীর মোহাম্মদপুর এবং ১৯ মার্চ তুরাগে দুই নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এসব রহস্য অজানা। ২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুরের জহুরী মহল্লায় ড্রেন থেকে এক নবজাতক এবং নবোদয় হাউজিংয়ের ময়লার স্তূপ থেকে আরো দুই নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়। মোহাম্মদপুর থানায় জিডির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নয়ন মিয়া বলেন, শিশুদের কারা ফেলেছে, তা বের করা যায়নি।

২০১২ সালের ২৪ মে যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচার ৪ নম্বর গলিতে ডাস্টবিন থেকে চার নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। যাত্রাবাড়ী থানায় ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোতলোব হোসেন জানান, এমন চার নবজাতকের লাশ পাওয়ার ঘটনা সচরাচর দেখা যায়নি। তবে কোথা থেকে, কারা ফেলেছে, তা বের করা যায়নি।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘নবজাতকের লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি পুলিশের দৃষ্টিতে মোস্ট ক্লুলেস মামলা। এটি সামাজিক অপরাধ। এখানে কোনো বাদী-বিবাদী নেই। পুলিশ তদন্তক্ষেত্রে এগোতে পারছে না। এখানে প্রাণ নিঃশেষ হচ্ছে, আইনের চোখে হত্যা; তবে ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড বলে হত্যা মামলায় নেওয়া যাচ্ছে না। ’

তবে এক পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় না প্রকাশের শর্তে বলেন, রাজধানীর কিছু মেটারনিটি ক্লিনিকে অবৈধ গর্ভপাত করছে আসাধু চক্র। তারাই মূলত অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানের মা ও বাবাকে সন্তান হত্যায় প্ররোচনা দেয়। পুলিশ এসব ঘটনাকে ‘উটকো ঝামেলা’ বলে মন্তব্য করে। তাই তারা দৈনন্দিন কাজের পর নবজাতকের মৃতদেহ উদ্ধারের তদন্তে আগ্রহী নয়। থানায় অপমৃত্যু (ইউডি) বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত এসব ঘটনা তদন্তে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও কখনো তাগিদ দেন না।

আছে নিরাপদ ঠিকানা : মানবাধিকার ও সমাজকর্মীরা বলছেন, মা হতে পারছেন না—দেশে এমন নারীর সংখ্যা কম নয়। সংকটটি এমনই যে নবজাতক কখনো হয়ে উঠছে হাজার হাজার বা লাখ টাকার পণ্য! সম্প্রতি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশু চুরি করে বিক্রির ঘটনা বেশ আলোচিত। গত বছরের ২৫ মার্চ এ হাসপাতালের ২০৭ শিশু ওয়ার্ডে আঁখি নামের এক নারীর কোলে একটি কন্যাশিশু রেখে পালিয়ে যায় আরেক নারী। আঁখি জানান, এক মাস বয়সের ওই শিশুকে নিতে এক দিনেই হাসপাতালে ভিড় করেন অর্ধশতাধিক মা। তবে শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের হাতে তুলে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভাগ্যগুণে বেঁচে যাওয়া শিশু সাফিয়ার মতো অনেকেই কোনো এক মায়ের কোলে নিরাপদেই আছে। মানবাধিকারকর্মী এলিনা খান জানান, ২০১১ সালের ৩ মে রাজধানীর সেন্ট্রাল রোড থেকে এক নবজাতক উদ্ধার করেন তিনি নিজেই। শিশুটির পা পিঁপড়ায় কামড়ে খেয়েছিল। ল্যাবএইড হাসপাতালে ৪০ দিন চিকিৎসার পর শিশুটি সুস্থ হয়ে ওঠে। এখন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে সন্তানের আদরে বেড়ে উঠছে ছেলেটি। এলিনা খান বলেন, ‘হত্যা না করে যারা সন্তান চায় তাদের দিয়ে দিলেই হয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আছে তারা সন্তান জন্ম দেওয়ার পর নিরাপদে দত্তক দিতে সহায়তা করে। পুরান ঢাকায় মাদার তেরেসা হোমস এবং মোহাম্মদপুরের পিসিকালচার রোডে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক জিনাত হুদা ওয়াহিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে তারা অমানবিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আবার কন্যাসন্তান প্রসব করেও সামাজিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন কেউ কেউ। কিন্তু এসব পরিস্থিতির জন্য তো শিশুটি দায়ী নয়। সে তো সৃষ্টিকর্তার দান। ’


মন্তব্য