ঢাকায় গেরিলা অভিযান-332333 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


ঢাকায় গেরিলা অভিযান

আজিজুল পারভেজ   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ঢাকায় গেরিলা অভিযান

অগ্নিঝরা একাত্তরে ঢাকার প্রতিরোধ যুদ্ধে একটি গেরিলা ইউনিট ছিল হানাদার পাকিস্তানিদের জন্য আতঙ্ক। এই ইউনিটের দুর্ধর্ষ যোদ্ধারা ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী সাভারে পাকিস্তানি বাহিনীর ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। শুরুতে এই ইউনিটের নেতৃত্বে ছিলেন রেজাউল করিম মানিক। হানাদারদের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি শহীদ হওয়ার পর এই ইউনিটের নেতৃত্ব দেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।

খ্যাতিমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা বাচ্চু মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময়ে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। একই সঙ্গে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের সক্রিয় সংগঠকও। একাত্তরে রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণায় বাচ্চুর জবানিতে উঠে এসেছে নানা ঘটনাপ্রবাহ। ১ মার্চ দুপুর ১টার দিকে সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান বেতার ঘোষণায় ৩ মার্চ ঢাকায় আহৃত জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করেন। এ সময় ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) পাকিস্তান বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট খেলা চলছিল। ইয়াহিয়া খানের ওই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দর্শক খেলা ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তখন হোটেল পূর্বাণীতে চলছিল আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির সভা। লাখ লাখ মানুষ মিছিল নিয়ে সমবেত হয় হোটেলের সামনে। বঙ্গবন্ধু কী নির্দেশনা দেন জানার জন্য। চলতে থাকে জনতার স্লোগান।

বাচ্চুর ভাষায়, জনতার এই বিস্ফোরণকে ইঙ্গিতপূর্ণ মনে হলো। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইনে বর্বরতা চালানোর পরদিন তিনি কেরানীগঞ্জে চলে যান সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে। এরপর ২৫ এপ্রিল সীমান্ত অতিক্রম করেন।

আগরতলায় মেজর হায়দারের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। পরে ২৭ জন ছেলেসহ পশ্চিম দিনাজপুরের বালুরঘাট ট্রেনিং শুরু হয়। সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, ওমর, পনির, মঞ্জু, ইফতেখার, তৌফিক প্রমুখ। ট্রেনিং চলাকালেই কলকাতায় গেলে ২ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফের সঙ্গে দেখা হয়। মেজর খালেদ মোশাররফের অধীনে পুনরায় ১৫ দিনের একটি ব্রাশ-আপ ক্লাস হয়। সেখানে তিনি আরো ২৫ জন ছেলেকে নিয়ে ৫২ জনের একটি টিম করে সবাইকে ঢাকা উত্তরের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন।

সেপ্টেম্বর মাসের দিকে গভীর রাতে দলটি আখাউড়া-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক দিয়ে দেশের পথে পা বাড়ায়। ধামরাই থানার এক গ্রামে এসে পৌঁছাতে সাত দিন সাত রাত লেগেছিল তাদের। পথিমধ্যে রৌহার একটি ছোট বাজারে রাতযাপনকালে পাকিস্তানি বাহিনীকে মোকাবিলা করতে হয়। এবার ক্যাম্প স্থাপন করা হয় সিঙ্গাইর থানা এলাকার কাছাকাছি একটা গ্রামে। এখানেও একটি অপারেশনে ১৪ জন পাকিস্তানি সেনার একটি রেশনিং কোরকে খতম করা হয়। এরপর ক্যাম্প নিয়ে আসা হয় শিমুলিয়ায়। একপর্যায়ে ২৩ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল ঢাকা নগরীতে প্রবেশ করে।

দলটি ঢাকা শহর এলাকায় বেশ কয়েকটি অপারেশন করে। এই দলটিতে বাচ্চু ছাড়াও ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, মুনীরউদ্দিন, ফেরদৌস, মাহাবুব আলী, জাহেদ, শফিকুল ইসলাম স্বপন, জন, ফিরোজ, মোহাম্মদ আলী, ওমর, আরিফ, রমজানসহ আরো বেশ কয়েকজন নির্ভীক যোদ্ধা।

বাচ্চুর জবানীতে, ঢাকায় গেরিলা দলটির মূল দায়িত্ব ছিল হানাদারদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা। পাশাপাশি শহরের ভেতরে ওদের ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করা। ঢাকায় প্রথম অপারেশনে কাকরাইল মোড়ে যে পেট্রল পাম্পটি ছিল সেটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তারপর ডিআইটি ভবনে অবস্থিত টেলিভিশন কেন্দ্রটি অকেজো করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। তখন মাহবুব আলী ডিআইটি ভবনেই চাকরি করতেন। তিনি অফিসে আসার সময় প্রতিদিন কিছু কিছু বিস্ফোরক শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে ভবনে এনে জমিয়ে রেখে চূড়ার নিচে ওটা ফাটিয়ে দেন। এই অপারেশনের খবর বিদেশি পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছিল।

নভেম্বরের দিকে সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকা শহরে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর সরাসরি আক্রমণের। এই অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয় রাইসুল ইসলাম আসাদকে। এর দু-এক দিন পরই আরিফ, ফেরদৌস ও জন একটি গাড়ি হাইজ্যাক করে বায়তুল মোকাররমে নিয়ে আসেন। সেখানে হানাদারদের দুটি লরির মাঝখানে গাড়িটি রেখে বিস্ফোরকে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এই অপারেশনের ১৬ জন সেনা প্রাণ হারায়।

বাচ্চুর জবানিতে, ‘শিমুলিয়া ট্রেনিং ক্যাম্পের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে অক্টোবরের দিকে আমরা মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকে অপারেশন চালাই। এই অপারেশনে নেতৃত্ব দিয়েছিল মুনির। ফ্রোজ, আসিফ ও আসাদও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। মুনির অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে একটিমাত্র খেলনা পিস্তল দিয়ে এই ব্যাংকে অপারেশন চালান।’

ঢাকা শহরে এই গেরিলা বাহিনী নভেম্বরের দিকে আরো কয়েকটি অপারেশন চালায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো রেডিও বাংলাদেশ (শাহবাগ), মালিবাগ লেভেলক্রসিং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি এলাকায় অপারেশন। মালিবাগ লেভেলক্রসিংয়ের কাছে রেললাইন উড়িয়ে দিতে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে গেরিলাদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে বাহিনীর একটি সেকশন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বাংলাদেশ রেডিও (শাহবাগ) আক্রমণ করে বহু পাকিস্তানি সেনাকে খতম করা সম্ভব হয়।

বাচ্চু বলেন, ‘অক্টোবরের দিকে দখলদার সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস চালুর চেষ্টা করছিল। খবর পেয়ে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু এক্সপ্লোসিভ বসাই। এই অপারেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস চলা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আমাকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয় এবং বাড়ি তল্লাশি করে আমার পাঁচ ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।’

সাভারে রেডিও স্টেশনের সামনে অক্টোবরের প্রথম দিকে অপারেশন চালায় এই বাহিনীর দুর্ধর্ষ গেরিলারা। তারা এই পথে তিনটি পাকিস্তানি লরি আক্রমণ করে এবং প্রায় ৩৭ জন সেনা হত্যা করতে সক্ষম হয়। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকের এই অপারেশনে ৩১৯ জন রাজাকার আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।

১৪ নভেম্বরের ভায়াডুবি ব্রিজ অপারেশন ছিল এই গেরিলা বাহিনীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য অভিযান। এখানে ২০ জন শত্রু সেনাকে খতম করে ব্রিজটা দখলে নেয় গেরিলারা। খবর পেয়ে মানিকগঞ্জের দিক থেকে তিনটি গাড়ি বোঝাই হয়ে প্রায় সাত শ শত্রু সেনা ব্রিজ অভিমুখে রওনা হয়। গভীর রাতে এখানে দুই পক্ষে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এই যুদ্ধে গেরিলা প্লাটুনের অধিনায়ক মানিক শহীদ হন। গেরিলারা ইতিমধ্যে ধামরাই এলাকাও পুরোপুরি মুক্ত করে ফেলে। পরে সাভারে পাকিস্তানিদের বড় একটি ক্যাম্প দখলে নেয় গেরিলারা। পুরো নিয়ন্ত্রণে চলে আসে সাভার এলাকা।

১৩ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল থেকে ৩৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট মিত্র বাহিনীর চাপে পিছু হটে ঢাকার দিকে আসছিল। দুর্ধর্ষ গেরিলাদের এই বাহিনী এই রেজিমেন্টকে সাভারের কাছে বাধা দিলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে শত্রুপক্ষের শতাধিক সেনা নিহত হয়। মুক্তির আগ মুহূর্তের এ যুদ্ধই ছিল এই এলাকার সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই যুদ্ধে অন্যতম গেরিলা যোদ্ধা টিটো শহীদ হন। পরে এই বীর যোদ্ধারা মিত্র বাহিনীর সঙ্গে বীরদর্পে ঢাকা শহরে প্রবেশ করেন।

মন্তব্য