পাঁচ দিনের রিমান্ডে মা-332331 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


পাঁচ দিনের রিমান্ডে মা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পাঁচ দিনের রিমান্ডে মা

নিজ বাসায় দুই শিশুসন্তান হত্যার ঘটনায় তাদের মা মাহফুজা মালেক জেসমিনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে গতকাল শুক্রবার দুপুরে জেসমিনকে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন রামপুরা থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) মোস্তাফিজুর রহমান। বিকেলে শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম স্নিগ্ধা রানী চক্রবর্তী পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ড শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুই সন্তানকে এভাবে একজনের পক্ষে হত্যা করা সম্ভব নয়। এই হত্যাকাণ্ডে আর কেউ জড়িত কি না তা জানার জন্য তাঁকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। তাই রিমান্ড চাওয়া হয়।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী সাফায়েত আলী বলেন, ‘বাদী নিজেই আসামিকে অসুস্থ বলে উল্লেখ করেছেন। একজন অসুস্থ মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব নয়। আমরা আদালতকে বলেছি, তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন। আদালত তার পরও শুনানি শেষে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।’

এদিকে আদালতে নেওয়ার আগে থেকেই জেসমিন বিমর্ষ অবস্থায় আছেন। এজলাসে তিনি কোনো কথা বলেননি। অল্প সময়ের শুনানি শেষে পুলিশ তাঁকে একটি পিকআপে করে থানায় নিয়ে যায়। গতকাল বিকেলে থানায় নেওয়ার পর জেসমিন কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন।

রামপুরা থানার পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও জেসমিন দুই সন্তানকে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। সন্তানদের হত্যার কারণ হিসেবে র‌্যাবের কাছে যা বলেছেন, পুলিশকেও একই তথ্য দিয়েছেন তিনি। তবে রিমান্ডে নিয়ে তাঁকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

ওই ঘটনায় ভালো নেই পরিবারের অন্য সদস্যরাও। দুই সন্তানের মৃত্যুর পর স্ত্রীকে পুলিশ হেফাজতে রেখে গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে বনশ্রীতে নিজ বাসায় গিয়ে আর্তনাদ করেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আমান উল্লাহ। তাঁর বন্ধু মোহাম্মদ দিপু বলেন, “ওই রাতে আমি আমানের সঙ্গে ছিলাম। সে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে আর্তনাদ করে বলছিল, ‘আমি তো নিঃস্ব হয়ে গেলাম। আমার আর কিছুই রইল না। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব।’” দিপু জানান, ঘটনার পর আমান অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এখন স্বজনদের বাসায় রেখে তাঁর চিকিৎসা চলছে।

বনশ্রীর ৫ নম্বর সড়কে একটি বাসার ‘পঞ্চম তলায়’ স্বামী ও এক সন্তান নিয়ে থাকেন নিহত দুই শিশুর ছোট খালা আফরোজা মালেক মিলা (৩৬)। গতকাল বিকেলে তাঁর বাসায় গিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গত ২৯ ফ্রেব্রুয়ারি আমার বোন মাহফুজা মালেক জেসমিন ফোন করে আমাকে বলেন, দুই শিশু কেমন যেন করছে। তারা অসুস্থ। খবর পেয়ে আমি দ্রুত বোনের বাসায় গিয়ে দেখি মেয়েটি (নুসরাত আমান অরণী) ফ্লোরে পড়ে আছে। আর ছেলে আলভী আমান খাটের ওপর ঠিক একইভাবে নিথর। তখন বোনের কাছে আমি জানতে চাই এটা কিভাবে হলো। বড় আপা আমাকে বলেন, ‘আমিও বুঝতে পারছি না।’ ওই সময় শিশুদের বৃদ্ধ দাদি ও মা জেসমিন ছাড়া বাসায় আর কেউ ছিলেন না।”

মিলা বলেন, ওই সময় তিনি আমান উল্লাহর বন্ধু জাহিদকে ফোন দেন। তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণের মধ্যে জাহিদ ভাই তাঁর বন্ধু হ্যাপিকে নিয়ে বাসায় চলে আসেন। এরপর দুই বাচ্চাকে তাঁরা সবাই মিলে প্রথমে আলরাজি ইসলামী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাতেই দুই শিশুর মৃত্যুর কথা জানান চিকিৎসকরা।’ মিলা বলেন, ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দুই সন্তানের মৃত্যুর খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েন জেসমিন আপা। তখনো মনে হয়নি আপাই দুই শিশুকে হত্যা করেছেন। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না দুই সন্তানকে আমার আপা খুন করেছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে মিলা বলেন, ‘জেসমিন আপা সন্তানদের খুব আদর করতেন। তবে সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে একটু বেশি চিন্তা করতেন। তাই বলে সন্তানদের হত্যা করবেন, এটা হতে পারে না। আপনিই বলেন, কোনো মা কি তাঁর সন্তানকে খুন করতে পারে! কিন্তু আপা কেন যে এ কথা বলছেন তা তিনিই জানেন।’

গতকাল দুপুরে রামপুরার বনশ্রী এলাকার বি-ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায় অন্তত ২০ জন নারী দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের অনেকের সঙ্গে শিশুসন্তানদেরও দেখা যায়। ওই সময় তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা কেউই মেনে নিতে পারছেন না ঘটনা। এ ঘটনায় মা-ই প্রকৃতপক্ষে জড়িত কি না তা আরো যাচাই-বাছাই করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মিডিয়ার মাধ্যমে আবেদন জানান তাঁরা।

গত বৃহস্পতিবার র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জেসমিন নিজেই তাঁর সন্তানদের শ্বাসরোধে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। সেই সঙ্গে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে  জেসমিনের বিরুদ্ধে রামপুরা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন তাঁর স্বামী আমান উল্লাহ। মামলার এজাহারে তিনি বলেন, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কর্মস্থল উত্তর বাড্ডা পূর্বাঞ্চল এলাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চলে যান তিনি। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাঁর স্ত্রী ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁকে জানান, তাঁদের দুই সন্তান খুবই অসুস্থ। তাদের হাসপাতালে নিতে হবে। দ্রুত তাঁকে বাসায় যেতে বলেন। তিনি তাৎক্ষণিক কর্মস্থল থেকে বাসার উদ্দেশে রওনা করেন। রাস্তায় জ্যাম থাকায় বন্ধু জাহিদকে ফোন করে বাসায় যেতে বলেন। এরপর তাঁর স্ত্রী, শ্যালিকা ও বন্ধু জাহিদ দুই শিশুকে আলরাজি হাসপাতালে নিয়ে যান। এরই মধ্যে আমান নিজেও আলরাজি হাসপাতালে চলে যান। এজাহারে আমান বলেন, ‘আলরাজি হাসপাতালের চিকিৎসক দুই শিশুকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আমার সন্তানদের মৃত ঘোষণা করেন। ওই সময় স্ত্রী আমাকে জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তাদের বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উপলক্ষে বনশ্রী সি-ব্লকের কেন্ট নামের চায়নিজ রেস্টুরেন্ট থেকে এনে রাখা খাবার দুপুরে গরম করে ছেলেমেয়েকে খাওয়ানো হয়। ওই খাবারের বিষক্রিয়ায় দুই সন্তান মারা যেতে পারে। তবে আমার স্ত্রী পরবর্তী সময়ে র‌্যাব হেফাজতে আমার সামনেই জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, দুই সন্তানকে সে-ই শ্বাসরোধে হত্যা করেছে। কারণ জানতে চাইলে জেসমিন ওই সময় বলে, সন্তানদের স্কুলে লেখাপড়া, রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় মানসিকভাবে সে টেনশন করছিল। টেনশন নিয়ে তার মাথায় যন্ত্রণা হয়। ছেলেমেয়ে না থাকলে যন্ত্রণা হতো না। ওই যন্ত্রণার কারণেই সে দুই সন্তানকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে দুই সন্তানকে হত্যার আগে আমার স্ত্রী জেসমিন আগে কখনো টেনশনের কথা আমাকে জানায়নি। দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজেও আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিল বলে আমার সামনেই র‌্যাবকে জানায়।’

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুশরাত জাহান অরণী (১৪) ও হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের নার্সারির ছাত্র আলভী আমান (৬) মারা যায়।

মন্তব্য