kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শ্বাস নিলেই রোগের ভয়

রাজীব আহমেদ   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শ্বাস নিলেই রোগের ভয়

ঢাকার চেয়ে অনেক বেশি দূষিত চীনের রাজধানী পেইচিংয়ের বাতাস। সেই দূষণের মাত্রা এত বেশি যে কানাডার একটি কম্পানি বোতলজাত বাতাস রপ্তানি শুরু করেছে চীনে।

একেকটি বোতলের দাম ১৫ থেকে ২০ ডলার। চলছেও ভালো। প্রথম চালানে এসেছে ৫০০ বোতল, পরের চালানে আরো এক হাজার বোতল যাওয়ার কথা রয়েছে।

চীনের এত দূষণের কারণ কয়লা। সস্তায় পণ্য তৈরির জন্য জ্বালানির জোগান দিতে চীন কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এর সুফলও পেয়েছে তারা। কয়েক দশক ধরে গড়ে ১০ শতাংশ হারে বেড়ে চীনের অর্থনীতির আকার এখন বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম।

বায়ুদূষণ করে চীন অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান পেলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। ঢাকাবাসী বায়ুদূষণ করে পেয়েছে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলার অধিকার, কোনো ধরনের নিময়-কানুন না মেনে নির্মাণকাজ ও ইট-বালু পরিবহনের অধিকার এবং রাস্তা ঝাড়ু না দেওয়ার বদ অভ্যাস। আর নগরীর সেবা সংস্থাগুলো পেয়েছে রাস্তা খুঁড়ে দীর্ঘদিন ফেলে রাখার অধিকার। সম্মিলিত এই ‘অসভ্যতার’ কুফলও পাচ্ছে নগরবাসী। রাস্তায় বের হলেই চোখে পড়ছে নাক-মুখ ঢেকে চলাচলরত মানুষ। তারা ঢাকার বাতাসে ‘মাস্ক’ ছাড়া শ্বাস নিতে পারে না। রাজধানীর শিশু থেকে বৃদ্ধ—বহু মানুষ শ্বাসকষ্টে ভোগে, সর্দি-কাশি ও হাঁচিতে আক্রান্ত হয়।

এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যোগ হয়েছে ‘উন্নয়নের ধুলা’। পানির লাইন বসানোর জন্য রাস্তা খোঁড়া হচ্ছে, অবকাঠামো নির্মাণের জন্য রাস্তা খোঁড়া হচ্ছে, সেবা সংযোগের জন্য রাস্তা খোঁড়া হচ্ছে। খুঁড়ে রাখা রাস্তাগুলো দিনের পর দিন মেরামত করা হচ্ছে না, ফলে ধুলা বাড়ছে রাস্তায়। সরকারি-বেসরকারি নির্মাণকাজের উপকরণ খোলা পরিবহন

 করা হচ্ছে, রাস্তায় ফেলা রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে ধুলা উড়ছে বাতাসে। রাস্তাগুলো ঝাড়ু দেওয়া হয় দায়সারাভাবে। নর্দমা পরিষ্কার করে ময়লা সেখানেই ফেলে রাখা হয়। সেই ময়লা শুকিয়ে বাতাসে মেশে, কিছু বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে আবার নর্দমায় যায়। রেললাইনের দুই পাশে ধুলার উৎস জমে থাকছে, ট্রেনের হাওয়ায় তা বাতাসে মিশছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (সিএএসই) প্রকল্পের তথ্য মতে, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ৬৫ মাইক্রোগ্রাম অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার অবস্থান সহনীয়। কিন্তু শীতকালে ঢাকার বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ ৩০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত উঠে যায়। প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১৫০ মাইক্রোগ্রাম ক্ষুদ্র বস্তুকণা সহনীয়। শীতে ঢাকার বাতাসে তা ৫০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত ওঠে। ২০১৪ সালে সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত পর্যালোচনা করে পরিবেশ অধিদপ্তর দেখেছে, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত অন্যান্য সময়ের তুলনায় দূষণ বেশি থাকে। বছরের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে বায়ুতে বস্তুকণার পরিমাণ গ্রহণযোগ্য মাত্রার মধ্যে থাকে।

ঢাকায় বাতাসে ধূলিকণা বাড়ার বড় উৎস হলো ইটভাটা ও যানবাহন। এর পরেই আছে রাস্তার ধুলা। মোট বস্তুকণার ৩৮ শতাংশ আসে ঢাকার আশপাশের ইটভাটা থেকে, ১৯ শতাংশ যান্ত্রিক যানবাহন থেকে, ১৮ শতাংশ রাস্তার ধুলা থেকে, ৯ শতাংশ মাটি থেকে উৎসারিত ধুলা থেকে এবং বাকি ১৬ শতাংশ আসে অন্যান্য উৎস থেকে।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, ধুলাবালির কারণে সব বয়সী মানুষের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ হতে পারে। বড়দের হতে পারে সিওপিডি নামের এক ধরনের শ্বাসকষ্টের রোগ। অনেক সময় ধুলাবালি থেকে রোগ হয়ে তা ফুসফুসের ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হাঁপানি, সিওপিডিসহ বিভিন্ন শ্বাসকষ্টজনিত রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ’

ঢাকার ধুলার বড় ভুক্তভোগীদের একজন কাজী শাহাদাত। তিনি জানান, ঢাকায় বসবাস করে তিনি ‘ডাস্ট’ এলার্জিতে আক্রান্ত হয়েছেন। নাকে ধুলা ঢুকলে তাঁকে একাধারে শ খানেক হাঁচি দিতে হয়। এর কষ্ট ভয়ানক। এ জন্য সার্বক্ষণিক নাক-মুখ ঢেকে চলেন তিনি। তিনি বলেন, জানালা খোলা রাখলেই বাসার ভেতরে অনেক ধুলাবালি ঢুকে পড়ে। এ কারণে ঘরেও ‘মাস্ক’ পরে থাকতে হয় তাঁকে।   

নির্মল বায়ু নিশ্চিত করতে কী করতে হবে তা পরিবেশ অধিদপ্তর ভালোভাবেই জানে। গত ২৩ ডিসেম্বর এক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে তা জনগণকেও জানিয়েছে তারা। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ইট তৈরিতে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে, যানবাহনের মেইনটেন্যান্স ও গাড়িতে ভেজালমুক্ত লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করতে হবে, নির্মাণকাজের সময় চারপাশ ঢেকে রাখতে হবে ও নিয়মিত পানি ছিটাতে হবে, রাস্তা খোঁড়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যতটা সম্ভব ঢেকে রাখা ও নিয়মিত পানি ছিটানো ইত্যাদি। কিন্তু কে শোনে কার কথা? নিয়ম-কানুন কেউ মানে না। বাধ্য করার মতো কেউ নেই। এমনকি সিটি করপোরেশনও নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করে না বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

বায়ুদূষণ বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগও খুব বেশি নয়। অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ঢাকা বিভাগে দুই হাজার ৫৯৮টি ইটভাটা আছে। এর মধ্যে এক হাজার ২৫৮টি পরিবেশসম্মতভাবে করা হয়েছে। ৬৬৯টির পরিবেশ ছাড়পত্রই নেই। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মাত্র ৬০০টির মতো যানবাহনের নিঃসৃত ধোঁয়া পরিবীক্ষণ, ফলাফল বিশ্লেষণ করা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বায়ুদূষণের দায়ে মাত্র ৬৮টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা (এক কোটি ১৯ লাখ টাকা) করা হয়েছে।

অন্যদিকে সিটি করপোরেশনও কাজ করছে ‘দায়সারাভাবে’। রাজধানীর দেড় কোটির বেশি মানুষের জন্য ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছে মাত্র আট হাজার। ফলে নগরীর বিপুল পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা সরানো তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। পুরো রাজধানীর ধুলা থেকে মুক্তির জন্য মাত্র পাঁচটি পানি ছিটানোর ট্রাক রয়েছে।

নির্মল বায়ু প্রকল্পের পরিচালক ড. এস এম মঞ্জুরুল হান্নান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের নিয়ম, ইটভাটা আইন ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালায়ই বলা আছে কিভাবে কাজ করতে হবে। সেগুলো মানলেই ধুলার উৎসরণ কমবে। কিন্তু আমরা তা মানি না। এমনকি সরকারি সংস্থাগুলোও রাস্তা কেটে ফেলে রাখে। সেখান থেকে ধুলা হয়। অথচ নির্মাণকাজের বাজেটেই এ বিষয়ে বরাদ্দ দেওয়া থাকে। ’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খানের হিসাবে একটি পরিবারের মাসে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয় ধুলার কারণে। ধনীদের ক্ষেত্রে ব্যয় আরো বেশি। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন প্রধান প্রধান সড়কগুলো ঝাড়ু দেয়। কিন্তু তাতে পরিষ্কার হয় না। কারণ ঝাড়ুর সঙ্গে অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা বাতাসে উড়ে যায়। উন্নত দেশগুলোতে রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া হয় যন্ত্র দিয়ে, ওই যন্ত্র সব ধুলাবালি নিজের ভেতরে সংগ্রহ করে ফেলে। বাতাসে ওড়ে না।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উন্নয়নমূলক কাজ, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও ট্রাক চলাচলের কারণে ধুলার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। এটা কমানোর জন্য পরিকল্পনামাফিক কাজ শুরু করা হয়েছে। ’


মন্তব্য