kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যুবকে প্রশাসক নিয়োগ

শেষ হয়েও হলো না শেষ

আবুল কাশেম   

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শেষ হয়েও হলো না শেষ

যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) ব্যাংক হিসাবগুলোতে যে টাকা ছিল, গত ১০ বছরে তা শূন্যের কোঠায়। স্থাবর সম্পত্তিও বিক্রি হয়েছে দেদার।

আর এই পুরোটা সময় যুবকে দুই হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা গ্রাহকদের ভাগ্য ঘুরেছে মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রণালয়ে, ফাইলের ভেতরে। এক দশক পরে মুনাফা তো দূরের কথা, আসলের কিছু অংশ ফেরত দিতে আইন মন্ত্রণালয় প্রশাসক নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে গত বুধবার। যুবকের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা অর্থ আনুপাতিক হারে ফেরত দিতে গত সেপ্টেম্বর মাসে এ অনুমোদন

চেয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অনুমোদন পাওয়ার পর সুনির্দিষ্টভাবে যুবকের গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দিতে প্রশাসক নিয়োগের বদলে একটি স্থায়ী কমিশন গঠনের চিন্তা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেই কমিশন সারা দেশে অতীতে এ ধরনের যত ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর সুরাহা করবে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটলেও তা খতিয়ে দেখবে কমিশন। এ জন্য একটি প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

যুবকের গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের জন্য প্রশাসক নিয়োগের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়ে আইন মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘দ্য বাংলাদেশ (টেকিং ওভার অব কন্ট্রোল অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল কনসার্নস) অর্ডার, ১৯৭২’ এবং ‘দ্য অফিশিয়াল রিসিভারস অ্যাক্ট, ১৯৩৮’-এর আওতায় রিসিভার, প্রশাসক অথবা সরকার যেভাবে প্রয়োজন মনে করে সেভাবেই যুবকের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সরকারের হেফাজতে নিয়ে তার রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকদের পাওনা হিসাব-নিকাশ করে পরিশোধের ব্যবস্থা করা যায়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (বাণিজ্য সংগঠন) মো. আব্দুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুটি আইনের কথা উল্লেখ করে বুধবার যুবকে প্রশাসক, রিসিভার অথবা সরকার যেভাবে চায় সেভাবে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের অনুমোদন দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। ’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, যুবকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার বদলে একটি স্থায়ী কমিশন গঠনের চিন্তাভাবনা চলছে। ওই কমিশন যুবক, ডেসটিনিসহ অতীতে যেসব প্রতিষ্ঠান আইন ভঙ্গ করে যে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে, সেই গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কাজ করবে। ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আব্দুল মান্নান এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে কমিশন গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রিসভা তাতে সম্মতি দিলে কমিশন গঠন করা হবে। আর কমিশনটি কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত হবে সেটিও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবে। সারা দেশে যুবকের মতো প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রতারিত ব্যক্তিদের পাওনা আদায়ে ওই কমিশন কাজ করবে।

আজ শুক্রবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুনের বিদেশ যাওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ৯ মার্চ তিনি দেশে ফিরবেন। তারপর ১৪ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে কমিশন গঠনের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হতে পারে বলে জানান তিনি।

যুবক গ্রাহকদের সংগঠন ‘যুবকে ক্ষতিগ্রস্ত জনকল্যাণ সোসাইটি’র সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হোসেন মুকুল কালের কণ্ঠকে বলেন, কমিশন গঠনের নামে জটিলতা সৃষ্টি না করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত ১০ বছর ধরে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পাওনা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ফেরত দিতে দ্রুত প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া। কমিশন গঠন করতে হলে আলাদা আইন করতে হবে। বিধিমালা করতে হবে। কমিশনের চেয়ারম্যান, সদস্য ও অন্যান্য স্টাফের পদ সৃষ্টির অনুমোদন নেওয়া, ওই সব পদে জনবল নিয়োগ দেওয়া একটি দীর্ঘতর প্রক্রিয়া। ২০১২ সালে কমিশন আইন পাস করলেও এখনো সেই কমিশন গঠন করতে পারেনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ অবস্থায় যুবকের গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের জন্য কমিশন গঠনের নামে সময়ক্ষেপণ করা কোনোমতেই উচিত হবে না। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে গঠিত যুবক কমিশন এবং ওই কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় গঠিত আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি যুবকের গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। সুপারিশ অনুযায়ী প্রশাসক যুবকের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি নিজের হেফাজতে নিয়ে তা বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করবে। এ অবস্থায় এখন কমিশন গঠন শুরু করলে তা যুবকের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের আরো দীর্ঘদিন ভোগাবে।

এদিকে যুবক কমিশনের প্রতিবেদন মতে, তিন লাখ তিন হাজার ৭৩৯ জন গ্রাহক যুবকের কাছে দুই হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা পান। দেশের ৪৯টি তফসিলি ব্যাংকে যুবকের বিভিন্ন হিসাবে অর্থ রয়েছে মাত্র ৭৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সারা দেশে ৯১টি জমি, ১৮টি বাড়ি ও ১৮টি কম্পানি রয়েছে যুবকের। তবে জমি, বাড়িসহ অন্যান্য সম্পদ বিক্রি চলছে। এ অবস্থায় যুবকের যেসব সম্পত্তি এখনো রয়েছে, একজন প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করে গ্রাহকদের বিনিয়োগ করা আসল অর্থ পরিশোধের সুপারিশ করেছে কমিশন। যত দিন প্রশাসক নিয়োগ সম্পন্ন না হয় তত দিন পর্যন্ত এসব সম্পত্তি সংশিষ্ট জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আওতায় নেওয়া এবং যুবক ও এর সহযোগী সব সংস্থার নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশও করেছে। এসব সুপারিশের কোনোটিই বাস্তবায়ন করেনি সরকার।

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুবকের কর্তারা জামিনে মুক্ত হয়ে এখনো ভিন্ন নামে একই ধরনের ব্যবসা চালাচ্ছেন এবং যুবকের বিভিন্ন সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। সংস্থাটি সারা দেশে কয়েক শ সমবায় সমিতি গড়ে তুলেছে। ঢাকার নবাবগঞ্জে উর্বশী বহুমুখী সমবায় সমিতি, পটুয়াখালীতে দুমকী যুবকল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আইডিয়াল বহুমুখী সমবায় সমিতিসহ বিভিন্ন নামে বিভিন্ন স্থানে সমিতি খুলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে। এ ছাড়া যুবকের গ্রাহকদের অর্থে কেনা ধানমণ্ডির ২৮ নম্বর রোডের ১৫ নম্বর বাড়ি ও কুমিল্লা শহরের ১০৪ শতক জমি অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও মেঘনা সি ফুডস, বিচ হ্যাচারির শেয়ার ও সুইফট ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের মালিকানাও অসৎ উদ্দেশ্যে বিক্রি বা হস্তান্তর করেছে যুবক। সারা দেশে যুবকের ৯১টি জমি-প্রকল্প থাকলেও তার ৫০টি প্রকল্পে কোনো জমি অবশিষ্ট নেই।

যুবকের সম্পত্তি, জমি, বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নগদ টাকা বেহাত করার দায়ে ৪০ জনের নাম উলেখ করেছে কমিশন। এই ৪০ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ফৌজদারি মামলা করার সুপারিশও করেছে কমিশন। এ ছাড়া, দ্বিপক্ষীয় বিরোধিতা রয়েছে এমন সম্পত্তি যেমন—বিকে টাওয়ার, একটি টেলিভিশন চ্যানেল, সাবেক সচিব মো. মোকাম্মেল হক ও ভোলার চেয়ারম্যান মজনু মিয়ার সঙ্গে জমি ক্রয়-বিক্রয় ও লেনদেনসংক্রান্ত জটিলতা, অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ের বকেয়া ভাড়াসংক্রান্ত বিষয়াদিও প্রশাসকের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে কমিশন। অভিযুক্ত ওই ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলার খসড়া এজাহার লিখে দ্রুত মামলা দায়ের করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। সে মামলাও হয়নি এখনো।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ১৮৬০ সালের সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টে নিবন্ধিত যুবকের মূলত সাহিত্য ও শিক্ষা চর্চা কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা। কিন্তু তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে আত্মসাৎ করেছে, অবৈধ ব্যাংকিং করেছে। এখন প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে গ্রাহকদের পাওনা টাকা আনুপাতিক হারে ফেরত দেওয়া হলেও যুবকের কর্তারা তাদের অপরাধের কোনো শাস্তি পাচ্ছেন না। কারণ মামলাগুলোর কার্যক্রম কার্যত বন্ধ।

১৯৯৭ সালে নিবন্ধন নেওয়া যুবক ১৯৯৪ সালে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের মধ্য দিয়ে যুবক কার্যক্রম শুরু করে। যুবকের বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যাংকিংয়ের অভিযোগ তুলে ২০০৬ সালের ৬ জুলাই যুবকের কার্যকলাপ বন্ধ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই দিনে গ্রাহকদের কাছ থেকে যুবকের নেওয়া আসল অর্থ সুদসহ ২০০৭ সালের মার্চের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেয়। ওই সময় এক টাকাও পরিশোধ করেনি যুবক, তবু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে যুবকের কর্তাব্যক্তিদের নামে সারা দেশে অসংখ্য মামলা করেন গ্রাহকরা। এ অবস্থার মধ্যে ২০১০ সালের ২৬ জানুয়ারি যুবকের গ্রাহকদের পাওনা অর্থ কিভাবে ফেরত দেওয়া যায়, তা বের করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, দুই বছর মেয়াদে ২০১১ সালের ৭ মে সরকারের সাবেক যুগ্ম সচিব মো. রফিকুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে ‘যুবক কমিশন’ গঠন করে সরকার। ২০১৩ সালে এই কমিশন দ্রুত প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে যুবকের সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের সুপারিশ করে। কিন্তু কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের মতো ‘ঝামেলার দায়িত্ব’ তখন নিতে আগ্রহী ছিল না বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। শেষে গত বছর লিখিতভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, যুবক যেহেতু ১৯৯৭ সালে সামাজিক নিবন্ধন আইনের (দ্য সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০) আওতায় নিবন্ধিত, তাই প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে।


মন্তব্য