আত্মবিশ্বাসই নিয়ে গেল ফাইনালে-331966 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


আত্মবিশ্বাসই নিয়ে গেল ফাইনালে

সাইদুজ্জামান   

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আত্মবিশ্বাসই নিয়ে গেল ফাইনালে

পাকিস্তানকে হারানোর পর গতকাল আর অনুশীলন করেনি বাংলাদেশ। ছুটি পেয়ে যে যাঁর মতো কাটিয়েছেন সময়। সময়টা দারুণ উপভোগ করেছেন সৌম্য সরকার ও তাসকিন আহমেদ। ছবি : মীর ফরিদ

মেরিডিয়ান হোটেলের ঘুম আগেই ভেঙেছে, তবু সকাল ১০টায়ও লবিটা সুনসান। এশিয়া কাপের পাঁচ দলের আবাসস্থল হওয়ায় দিনভরই গমগম করে লবি। হঠাৎই ফাঁকা। বিরাট কোহলির অটোগ্রাফ নিতে এক কিশোরীর উপস্থিতি ছাড়া ক্রিকেটভক্তির কোনো চিহ্নও নেই। শরীর টেনে খালেদ মাহমুদ লবিতে নেমে আসার পর জানা গেল, ‘ছেলেদের প্রায় সবাই রাতেই যার যার বাড়িতে গেছে।’ মাশরাফি-সাকিব-তামিমরা নেই তো হোটেলকেন্দ্রিক চিরায়ত ক্রিকেটভক্তিও উধাও!

হোটেলের ম্যানেজারগোছের একজন এসে যথেষ্ট বিনয়ের সঙ্গে মাহমুদের কাছে জানতে চাইলেন, ‘স্যার, গতরাতের খাবারটা ঠিকঠাক ছিল তো?’ যেন জাতীয় দলের ম্যানেজারের প্রশংসা না পেলে চাকরি তাঁর যায় যায়! বাইরে নিরাপত্তারক্ষীরা যেন সংখ্যায় অন্যান্য দিনের চেয়ে ভারী। শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠাতেই কি বাড়তি নিরাপত্তার দরকার হয়ে পড়ল মাশরাফিদের? উত্তরে মাহমুদের ঠোঁটে গর্বের হাসি, ‘কী জানি ভাই! তবে দল যে ভালো খেলছে, এটা চারপাশের মানুষের রিঅ্যাকশনেও বুঝতে পারি। বিশ্বকাপ থেকে ধরলে প্রায় এক বছর ধরে নিয়মিত জিতছে যে দলটা, তার গুরুত্ব তো বাড়বেই।’

কিন্তু তাই বলে টি-টোয়েন্টিতে এমন ভোজবাজির মতো পালটে যাবে বাংলাদেশ? লেদারের সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে তামিম ইকবাল বাধা দিলেন, ‘কে বলল যে আমরা বদলে গেছি? এখনো অনেক দূর যেতে হবে। তবে হ্যাঁ, একটা পরিবর্তন হয়েছে, সেটা আমাদের মানসিকতায়। হতে পারে টানা ওয়ানডে জিততে জিততে আমাদের মনে দারুণ একটা আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে। এই আত্মবিশ্বাস একটা ট্রেন, যাত্রা শুরু করেছে। আমরা লাইনচ্যুত না হলে কিংবা কেউ চেইন টেনে না দেওয়া পর্যন্ত চলতেই থাকবে। প্রতিপক্ষ কে, কোন ফরম্যাট ওসব ভেবে ভয় পাই না।’

ভারতের হাই প্রোফাইল ব্যাটসম্যানরাও যেখানে মোহাম্মদ আমিরের গতি, সুইং আর বাউন্সে হতবাক সেখানে অকুতোভয় থাকার ব্রতই নিয়েছিল বাংলাদেশ। শুনুন তামিমের কাছেই, ‘আমি ওকে টার্গেট করেছিলাম। বড় বোলারকে মেরে দিলে বাকিরা ভয় পেয়ে যেত।’ আমিরের মতো বোলারের প্রথম ওভারে ডাউন দ্য উইকেটে এসে ছক্কা হাঁকাতে কলিজা লাগে। আমিরের প্রথম ওভারের শেষ বলে ঠিক এটাই করেছিলেন তামিম। মনে করিয়ে দিতেই অট্টহাসি বাঁহাতি এ ওপেনারের, ‘জানেন, বিপিএলের ১০ ম্যাচে আমির একটাও ছক্কা খায়নি। এশিয়া কাপের আগের দুই ম্যাচেও না।’ তবে নিজের ইনিংসটা বড় না হওয়ায় আক্ষেপ আছে তামিমের মনে, ‘প্রায় ১০ দিন ব্যাটই ধরিনি। এশিয়া কাপে খেলব, ডাক পাওয়ার আগে একবারও ভাবিনি। প্রিপারেশনটা ভালো হয়নি। তবে এখন ম্যাচে ঢুকে গেছি। আশা করি ঠিক হয়ে যাবে।’

কিন্তু আমিরকে বিরল ছক্কা মারাই তো আর টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের পালটে যাওয়ার একমাত্র কারণ হতে পারে না। বরং এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠার পথেও কিছু কিছু ঘাটতি দৃশ্যমান। টেকনিক্যালি দলের সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম রানে নেই, সাকিব আল হাসান অকারণ শট খেলে আউট হয়েছেন পাকিস্তান ম্যাচে। আল-আমিন উইকেট পেলেও পাকিস্তান ইনিংসের শেষদিকে একের পর এক ফুলটস দিয়েছেন। ফিল্ডিংয়ে আজ ভালো তো পরের দুদিন অফ-ডে কাটাচ্ছেন ফিল্ডাররা।

কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে থাকা মাহমুদ থামিয়ে দিলেন তখনই, ‘আপনি কেন আশা করছেন টানা নির্ভুল ম্যাচ খেলে যাবে একটা দল? প্রতিটি ম্যাচেই সব দল কোনো না কোনো ভুল করে। মুশফিকের সামর্থ্য নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে সব ব্যাটসম্যানেরই খারাপ সময় যায়। ওর যেমন এখন যাচ্ছে। নইলে যে বলটা অনায়াসে মিড উইকেটের ওপর দিয়ে গ্যালারিতে পাঠাতে পারে মুশফিক, সেখানে রিভার্স সুইপ কেন করতে যাবে? নিজের ওপর সাকিব কতটা বিরক্ত হয়েছে সেটা তো আউট হওয়ার পর ওর রিঅ্যাকশনেই দেখেছেন। আমি নিশ্চিত এই ভুলটা দ্বিতীয়বার করবে না সাকিব। আর বাজে সময়টা কাটিয়ে উঠলে ওরকম বল সোজা গ্যালারিতে পাঠাবে মুশি।’

ম্যানেজারকে যদি অবিশ্বাস হয়, তাহলে শুনুন তামিমের মূল্যায়ন, ‘সাকিবকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এই ফরম্যাটে দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ও। আর মুশফিক টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে আমাদের দলের সেরা ব্যাটসম্যান, আমি নিজেকেও পিছিয়ে রেখে বলছি। এই তিনটা ম্যাচ কেন, হয়তো আরো গোটা তিন-চারেক ম্যাচে মুশি রান নাও করতে পারে। তার পরও আমি বলব ও আমাদের দলের সেরা টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যান। একটু অপেক্ষা করেন শুধু।’ তিন ফরম্যাটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রানের মালিক যদি এ সার্টিফিকেট দেন, তাহলে না মেনে উপায় কী!

তামিম ছক্কা মারলেন আমিরকে, সাকিব আর একই ভুল করবেন না ভবিষ্যতে, মুশফিকও রানে ফিরবেন— ইত্যাকার কথায় তো আর উন্নতির সিঁড়িটার খোঁজ কিভাবে পেল বাংলাদেশ, তার হদিস নেই। অগত্যা আবার পাকিস্তান ম্যাচের উইনিং স্ট্রোক খেলা মাহমুদ উল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া, ‘আমাদের সাম্প্রতিক জয়গুলো কারো একার নৈপুণ্যে নয়। গতকালও (পরশু) টিম এফোর্টেই জিতেছি। শুরুতে সৌম্য দারুণ একটা ইনিংস খেলে গেল। মুশি যতক্ষণ ছিল, তাতে একটা পার্টনারশিপ হওয়াতে চাপ কমে গিয়েছিল। সাকিবও একটা রোল প্লে করেছে। তবে আমার মনে হয় মাশরাফি ভাইয়ের ওই দুইটা বাউন্ডারি শেষ ল্যাপে আমাদের এগিয়ে দিয়েছে।’

নিজের প্রশংসা তো আর মাহমুদ উল্লাহ নিজে করতে পারেন না। তবে তাঁর প্রশংসাকারীর অভাবও নেই এখন। দলেই আছেন মাহমুদকে ক্রিকেটার হয়ে উঠতে দেখা খালেদ মাহমুদ, ‘ও সব সময় কনট্রিবিউট করে। এশিয়া কাপেই বোলিংয়ে উইকেট নিয়েছে, ইনিংসগুলো ছোট ছোট হলেও শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তান ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এগুলো হয়তো সবার চোখে সেভাবে পড়ে না। রিয়াদ (মাহমুদ উল্লাহ) খুবই স্মার্ট ক্রিকেটার।’

কিন্তু মুস্তাফিজুর রহমানের অনুপস্থিতিতেও পাকিস্তানকে ১২৯ রানে আটকে রাখার পেছনে নিশ্চয় বড় কোনো অনুপ্রেরণা আছে। না, অনুপ্রেরণার খোঁজ দিতে পারেননি খালেদ মাহমুদ, তবে যা বলেছেন তাতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতির প্রধান কারণটা জানা হয়ে যাবে, ‘মুস্তাফিজ এমন একজন বোলার, যার বিকল্প আপাতত নেই। কিন্তু সব খেলোয়াড় তো সব সময় ফিট থাকবে না। তাই মুস্তাফিজ নেই ভেবে বসে থাকেনি কেউ। তাসকিন কি বোলিংটা করে দিল! আল-আমিন প্রতি ম্যাচেই উইকেট নিয়ে দিচ্ছে। সানিও ভালো বোলিং করেছে। সাকিব-মাশরাফিদের নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। তবে হ্যাঁ, মুস্তাফিজ থাকলে হয়তো পাকিস্তানকে একশতে আটকে রাখা যেত। এখন যে নেই, তাকে নিয়ে পড়ে থাকলে তো হবে না।’

অবশেষে পাওয়া গেল টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের আকস্মিক উন্নতির রেসিপি। তামিমের অভাব ভুলিয়ে দেন সাব্বির রহমান কিংবা মুস্তাফিজের ফাঁকা জায়গাটা ভরাট করে দেয় পুরো বোলিং ইউনিট। সঙ্গে টি-টোয়েন্টি বিষয়ে কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের পাখি পড়ানো। নিজের ব্রেনের জায়গাটা ঠুকে তামিমের এক্সপ্রেশনে বোঝা গেল কোচের বুদ্ধির ভক্তদলে নাম লিখিয়েছেন তিনিও।

মন্তব্য