kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


র‌্যাবের দাবি, উদ্বিগ্ন মায়ের হাতেই খুন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



র‌্যাবের দাবি, উদ্বিগ্ন মায়ের হাতেই খুন

দুই শিশুসন্তান হত্যায় অভিযুক্ত মা মাহফুজা মালেক জেসমিনকে গতকাল র‌্যাব হেডকোয়ার্টার্স থেকে র‌্যাব-৩ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

রামপুরার বনশ্রীতে দুই ভাই-বোনের মৃত্যুর বিষয়ে রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে র‌্যাব। তাদের ভাষ্যমতে, মা মাহফুজা মালেক জেসমিনই দুই সন্তানকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করেছেন।

সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন তিনি। এর ফলে তাঁর মধ্যে মানসিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এর জের ধরেই তিনি এমন কাজ করেছেন। এর আগে কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন তিনি। তবে এত অল্পবয়সী দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে মা কেন দুশ্চিন্তায় ভুগতেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি র‌্যাব।

গতকাল বৃহস্পতিবার কুর্মিটোলায় র‌্যাব সদর দপ্তরে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন তথ্য জানান র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান। তাঁর ভাষ্যমতে, র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে দুই সন্তানকে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন তাদের মা জেসমিন। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা ও মানসিক অস্থিরতা থেকেই তিনি এমন কাজ করেছেন।

র‌্যাবের ওই ব্রিফিংয়ের পর গতকাল রাত পৌনে ১০টার দিকে দুই শিশুর বাবা আমান উল্লাহ বাদী হয়ে কেবল তাঁর স্ত্রী জেসমিনকে আসামি করে রামপুরা থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। আর রাতেই জেসমিনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানিয়েছেন রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম।

র‌্যাব সদর দপ্তরে ব্রিফিংয়ে শিশু দুটির মা জেসমিনের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তা মুফতি মাহমুদ খান দাবি করেন, গত সোমবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে দুই গৃহশিক্ষক তাঁর মেয়ে ইশরাত জাহান অরণীকে পড়িয়ে চলে যান। মেয়ের পড়ার সময় তিনি সাধারণত নিজের কক্ষে বিশ্রামে থাকেন। ওই দিনও তিনি ছেলে আলভী আমানকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘটনার সময় শিশুদের বাবা আমান উল্লাহ উত্তরায় তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ছিলেন। বাসায় শিশুদের দাদি হাসনা বেগম ছাড়া আর কেউ ছিল না। ৫টার দিকে গৃহশিক্ষক চলে গেলে তিনি (জেসমিন) মেয়েকে তাঁর সঙ্গে ঘুমাতে ডাকেন। মেয়ে তাঁর পাশে গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে। একপর্যায়ে তিনি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন। এরপর ওড়না নিয়ে মেয়েকে শ্বাস রোধ করার চেষ্টা করেন। এ সময় মেয়ের সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তি হয়। মেয়ে বিছানা থেকে পড়ে যায়। একপর্যায়ে তিনি নিশ্চিত হন যে মেয়ে মারা গেছে। এরপর একই ওড়না দিয়ে তিনি ঘুমন্ত ছেলেকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করেন। ঘটনার পর তিনি প্রথমে স্বামীকে ফোন করে সন্তানদের অসুস্থতার কথা জানান। পরে নিজের বোনকে ফোন করেও একই কথা জানান। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর স্বামী এক বন্ধুকে বাসায় পাঠান। তিনি আসার পর দুই শিশুকে স্থানীয় আল-রাজি ইসলামিয়া হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাকরা তাঁদের জানিয়ে দেন শিশুরা মারা গেছে। এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাকরা একই কথা জানান। এরপর মা সবাইকে বলেন, একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টের খাবারের বিষক্রিয়ায় তাঁর দুই সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্ত করতেও বাধা দিয়েছেন মা।

মুফতি মাহমুদ খান দাবি করেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তা ছাড়া আপাতত এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আর কোনো কারণ পাওয়া যায়নি। তবে অন্য আরো কারণও থাকতে পারে। যেমন মায়ের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, অর্থ-সম্পত্তির লোভ ইত্যাদি বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া সব তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।

ভবিষ্যৎ দুশ্চিন্তা থেকে মা কেন সন্তানদের হত্যা করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মুফতি মাহমুদ খান বলেন, জেসমিন উচ্চশিক্ষিত। তিনি ভেবেচিন্তেই দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন। এটা তাঁর মানসিক সমস্যা হতে পারে। এর আগে তিনি কয়েক দফা আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন। এ বিষয়ে আরো তদন্ত হবে। এরপর আরো বিস্তারিত জানা যাবে।

দুই শিশুর স্বজনরা জানায়, আমান উল্লাহ তাঁর চাচাতো বোন জেসমিনকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। জেসমিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি জামালপুরের একটি কলেজে শিক্ষকতাও করেছেন। গত রবিবার তাঁদের ১৪তম বিবাহবার্ষিকী ছিল। সেদিন রাতে দুই সন্তানকে নিয়ে এ দম্পতি ওই চায়নিজ রেস্টুরেন্টে খেতে যান। তবে বাইরে থেকে জেসমিনকে সুস্থ-স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তিনি প্রচণ্ড মানসিক অস্থিরতায় ভুগতেন। স্বামীর ব্যস্ততা, সংসারের টুকিটাকি সমস্যা, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াসহ সামাজিক ও পারিবারিক নানা কারণে দিন দিন তাঁর অস্থিরতা বাড়তে থাকে। তাঁর আচরণে কখনো কখনো অস্বাভাবিকতা থাকলেও স্বামী আমান উল্লাহ সব কিছু মানিয়ে নিতেন। দুই সন্তানকে খুব আদর করতেন জেসমিন। সন্তানদের ভালোভাবে লেখাপড়া শেখাতে দুজন গৃহশিক্ষক রেখেছিলেন বাসায়। তা সত্ত্বেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা তাড়িয়ে বেড়াত তাঁকে।

অরণী (১৪) ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের (বেইলি রোড শাখা) সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। আর আলভী (৬) হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের নার্সারির ছাত্র ছিল। মা-বাবার সঙ্গে তারা বনশ্রীর সি ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসায় থাকত। বাবা আমান উল্লাহ পোশাক ব্যবসায়ী। তাঁর গ্রামের বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার রায়েরপাড়া গ্রামে। মা জেসমিনের বাড়ি জামালপুরের ইকবালপুর এলাকায়।

শুরু থেকেই পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছে, খাদ্যে বিষক্রিয়া থেকে দুই শিশু মারা গেছে। স্থানীয় একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টের খাবার খাওয়ার পর তারা ঘুমিয়ে পড়ে। সে ঘুম আর ভাঙেনি। তবে ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসাকরা জানান, দুই শিশুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এগুলো হত্যার আলামত। প্রাথমিকভাবে তাঁরা ধারণা করেন, শিশু দুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তাদের মা-বাবা ও স্বজনরাও পুলিশের সন্দেহের তালিকায় ছিল। গত বুধবার সন্ধ্যায় র‌্যাব-৩-এর একটি দল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাবা আমান উল্লাহ, মা জেসমিন ও খালা আফরোজা মালেককে জামালপুর থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে।

এর আগে গত মঙ্গলবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই শিশুর গৃহশিক্ষক শিউলি আক্তার, চাচা ওবায়দুর, আরেক আত্মীয় শাহিন এবং বাসার দারোয়ান পিন্টু মণ্ডল ও ফেরদৌসকে র‌্যাব-৩ কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সোমবার বনশ্রীর ‘কেন্ট’ চায়নিজ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মাসুদুর রহমান, ওয়েটার রনি মিয়া ও আতোয়ার হোসেনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।


মন্তব্য