মাদকবাহী ট্রাকের চালক পিষে মারল দুই-331961 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৮ জিলহজ ১৪৩৭


মাদকবাহী ট্রাকের চালক পিষে মারল দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ও আঞ্চলিক প্রতিনিধি   

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মাদকবাহী ট্রাকের চালক পিষে মারল দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে

আতাউল ইসলাম, সাদেকুল ইসলাম

মাদকবাহী ট্রাককে মোটরসাইকেল নিয়ে ধাওয়া করে আটকানোর চেষ্টাকারী দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছে ওই ট্রাকের চালক। নিহতরা হলেন—চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক সাদেকুল ইসলাম ও শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট আতাউল ইসলাম। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর সোয়া ৫টার দিকে শিবগঞ্জের কানসাট পল্লীবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনের সড়কে এ ঘটনা ঘটে।

সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ কর্মকর্তা দুজনকে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়ার সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই ঘাতক ট্রাকচালক সিরাজুল ইসলামকে ট্রাকসহ আটক করা হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার বশির আহমেদ পিপিএম বার বলেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনায় ট্রাকচালকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ও মাদক চোরাচালানের অপরাধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, সোনামসজিদ স্থলবন্দর থেকে ছেড়ে আসা একটি ট্রাকে মাদকের চালান যাচ্ছে ঢাকায়, এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সাদেকুল ইসলাম ও আতাউল ইসলাম আগে থেকেই কানসাট গোপালনগর মোড়ে অবস্থান নেন। গোপালনগর মোড়ে তাঁরা ট্রাকটিকে (ঢাকা-মেট্রো-ট-১৪-৮৯৪৮) থামার সংকেত দিলে ট্রাকচালক সংকেত অমান্য করে পাশ কাটিয়ে পালিয়ে যায়। সাদেকুল ও আতাউল তখন মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত ধাওয়া করে ট্রাকটিকে। এক কিলোমিটারের একটু বেশি দূরে এসে ট্রাকের সামনের দিক থেকে গতিরোধের চেষ্টা করেন তাঁরা। এ সময় ট্রাকচালক চলন্ত ট্রাক দিয়ে ধাক্কা দেয় সাদেকুল ও আতাউলের মোটরসাইকেলটিকে। ধাক্কা খেয়ে তাঁরা ছিটকে পড়লে ট্রাকের চাকা চলে যায় সাদেকুল ও আতাউলের পায়ের ওপর দিয়ে। ঘটনাস্থলেই তাঁরা মারা যান।

শিবগঞ্জ থানার ওসি এম এম ময়নুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ গাড়ির গতিরোধ করছে দেখে ট্রাকচালক তাঁদের চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসি। পরে ময়নাতদন্তের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে লাশ পাঠানো হয়।’

ওদিকে, মাদকবাহী ট্রাকের চাপায় দুই পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু সংবাদ থানায় এসে পৌঁছলে থানাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। খবর পেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল মামুন দ্রুত এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

শিবগঞ্জ থানায় কর্মরত সাদেকুল ও আতাউলের সহকর্মীরা জানান, উপপরিদর্শক সাদেকুল ইসলাম প্রায় এক বছর আগে এ থানায় যোগ দেন। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার রাজারামপুর গ্রামের আবদুস সাত্তারের একমাত্র ছেলে সাদেকুল ইসলাম স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে শিবগঞ্জের একটি বাসায় বসবাস করতেন। খবর পেয়ে থানায় ছুটে আসেন সাদেকুলের স্ত্রী। থানাজুড়ে তখন শুরু হয় শোকের মাতম।

সহকর্মীরা আরো জানান, ট্রাকের চাকায় প্রাণ হারানো শিক্ষানবিশ পুলিশ সার্জেন্ট আতাউল ইসলাম মাত্র ১৫ দিন আগে শিবগঞ্জ থানায় যোগ দিয়েছিলেন। জয়পুরহাটের সতিঘাটা গ্রামের শাহজাহান আলীর ছেলে আতাউল শিবগঞ্জ ডাকবাংলোর একটি ঘরে বসবাস করতেন। কর্মজীবনের শুরুতেই সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এভাবে তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ায় সহকর্মীরা শোকে মুষড়ে পড়েন। তাঁরা বলেন, খুব হাসিখুশি ও বিনয়ী ছিলেন দুজনই।

ঘাতক ট্রাকচালক আটক : দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে পিশে মারার পর চালক ট্রাক নিয়ে পালিয়ে গেলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সব ধরনের বহির্গমন পথে অস্থায়ী চৌকি বসায়। অবশেষে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভোলাহাট সড়কের কাশিয়াবাড়ী এলকায় ধরা পড়ে ঘাতক ট্রাকচালক সিরাজুল ইসলাম (৩৮)। সে ঝালকাঠি জেলার নলছিটির অনুরাগ গ্রামের আওয়াল হোসেনের ছেলে।

শিবগঞ্জ থানার ওসি এম এম ময়নুল ইসলাম বলেন, পুলিশ সদস্যদের হত্যার পর চালক ট্রাক নিয়ে ঢুকে পড়ে মনাকষা সড়কে। সেখান থেকে শ্যামপুর দিয়ে ঢোবপুকুর-ভোলাহাট সড়কে গিয়ে কাশিয়াবাড়ী স্কুলের সামনে ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। তিনি বলেন, গোপন সংবাদের তথ্য সঠিক ছিল। ওই ট্রাক থেকে বস্তায় ভরা এক হাজার ৪৫০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়।

ময়নাতদন্ত শেষে জানাজা : ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধারের পর শিবগঞ্জ থানা পুলিশ তা ময়নাতদন্তের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্তের দায়িত্বে নিয়োজিত সদর হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ট্রাকের চাকায় পিষ্ট সার্জেন্ট আতাউল ইসলামের পেটের নিচ থেকে দেহের বাকি অংশ ও এসআই সাদেকুল ইসলামের ডান পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া দুজনেরই পেটের নিচের অংশ সম্পূর্ণ পিষ্ট ছিল। তাঁদের দেহ ট্রাকের সামনের ও পেছনের চাকায় পিষ্ট হওয়ায় এ অবস্থা হয়।

ময়নাতদন্ত শেষে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ লাইনে। সেখানে জানাজা শেষে তাঁদের পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল বিকেলেই লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাঁদের গ্রামের বাড়িতে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার বশির আহমেদ পিপিএম বার বলেন, যেহেতু পুলিশ কর্মকর্তা দুজন অনডিউটি নিহত হয়েছেন, তাই পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁদের পারিবারকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এসআই সাদেকুল : নিহত উপপরিদর্শক (এসআই) সাদেকুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তারের ছেলে। তাঁর জন্ম ১৯৮০ সালে। তিনি ২০০৩ সালে উপপরিদর্শক (এসআই) পদে (বিপি নং-৮০০০০২১৯৪৭) পুলিশ বিভাগে যোগদান করেন। মা-বাবার একমাত্র ছেলে সাদেকুল ইসলাম নওগাঁর মান্দা থেকে ১১ মাস আগে শিবগঞ্জ থানায় যোগদান করেন। তিনি দুই কন্যা সন্তানের জনক।

দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধার ছেলের সাহসী অভিযানে মৃত্যুর ঘটনা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না তাঁর গ্রামের মানুষ। একমাত্র ছেলের করুণ মৃত্যুর খবর পেয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তাঁর বিধবা মা সুখি বেগম। দুই ভাইবোনের মধ্যে বড় সাদেকুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের কোটায় পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন। বছর পাঁচেক আগে মারা গেছেন তাঁর বাবা। সাদেকুলের বড় মেয়ে সাদিয়ার বয়স সাত ও ছোট মেয়ে সামিনার এক বছর।

বুধবার রাতেও সাদেকুলের সঙ্গে কথা হয়েছে মা সুখি বেগম এবং বোন শাহনাজের। আসছে বোরো মৌসুমে ধান কাটার সময় এক মাসের ছুটিতে দুই মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে সময় কাটাতে আসতে চেয়েছিলেন সাদেকুল।

শিক্ষানবিশ শেষ হলো না সার্জেন্ট আতাউলের : নিহত সার্জেন্ট আতাউল ইসলাম এক বছর সারদার ট্রেনিং ও ১০ দিন ছুটি শেষে মাত্র এক সপ্তাহ আগে শিবগঞ্জ থানায় যোগদান করেন শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট হিসেবে।

জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, শোকে মুষড়ে পড়েছে আতাউলের বাড়ি জয়পুরহাট সদর উপজেলার সতিঘাটা গ্রাম। একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবরে মা মাছুদা বেগম চিৎকার করে কান্নার পাশাপাশি প্রলাপ বকছেন। ঢাকার মিরপুর থেকে ছুটে আসা বড় বোন শাহনাজ পারভিন কেঁদে কেঁদে বলছেন, দুই দিন আগেও আতাউল তাঁকে ফোন করে বলে, ‘আপু, তুই ভালো থাকিস, নিজের প্রতি যত্ন রাখিস, আমার জন্য চিন্তা করিস না, আমি থানার মধ্যে নিরাপদে আছি।’

মন্তব্য