দিয়েছিলাম নিংড়ানো হৃদয়,পেলাম উপচানো-331632 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


বিশেষ লেখা

দিয়েছিলাম নিংড়ানো হৃদয়,পেলাম উপচানো বিজয়

মোস্তফা মামুন   

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ক্লোজ আপে ওয়াকার ইউনুসের মুখটা ধরছিল বারবার। বিষণ্নতায় ছেয়ে যাওয়া চেহারা, মাথা নাড়ায় স্পষ্ট বিরক্তি। পাকিস্তানি হতাশার শ্রেষ্ঠ ছবি। হতাশার ছবি এভাবে ধরা হচ্ছে, উল্লাসের ছবির প্রদর্শনী কোথায়? পরিস্থিতি তো সেটাই বেশি দাবি করে। কিন্তু সম্প্রচারকারীদের দোষ কী! হতাশায় ওয়াকার বা ওরা কয়েকজন কিন্তু উল্লাসে যে গোটা গ্যালারি। আর একজনের চেয়ে আরেকজন এগিয়ে। একটা ছবিকে ছাপিয়ে আরেকটা। প্রত্যেকেই লাফাচ্ছে, শরীর নিংড়ে দিচ্ছে উচ্ছ্বাসের সর্বোচ্চ প্রকাশে, কেউ একজন বা একটা ছবিকে আলাদা করা যায় কী করে! ক্লোজ আপে ধরতে হয় পুরো গ্যালারি। পুরো স্টেডিয়াম। পুরো বাংলাদেশ। সেটা স্টার স্পোর্টসের একার কাজ নয়, এই জাতির চলন্ত আবেগ ছবিতে ধরতে বিবিসি, স্কাই স্পোর্টস, চ্যানেল নাইন সবাইকে এক জোট হতে হয়!

ছবি একটা শেষে মিলল। যখন প্রধানমন্ত্রী এলেন। মুখে তৃপ্তির হাসি। দেশের নেত্রী, দলের সাফল্যে তাঁর হাসিমুখ তো আদর্শ ছবি। আর বড় পর্দায় সেই ছবি দেখাতেই গ্যালারিতে হুল্লোড় উঠল। সেটা আশ্চর্য এ জন্য যে দেশের নেতা-নেত্রীরা গ্যালারিতে তো অন্য সময়ও আসেন, কিন্তু ক্রিকেটে মত্ত থাকা মানুষ সেদিকে খুব মনোযোগ দেয় না। কাল দিল। যতবার তাঁকে দেখায় ততবার গর্জাতে থাকা গ্যালারি আরো গর্জায়। আনন্দ কল্লোলে দোল খায় পুরো স্টেডিয়াম। প্রধানমন্ত্রীকে দেখে জাতীয়তাবোধ এবং সেই সূত্রে উন্মাদনা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী এটা যে মার্চ মাস এবং ২ মার্চ পাকিস্তানের পতাকা ত্যাগের দিনে পাকিস্তানবধ হচ্ছে? খেলা বা ক্রিকেটকে রাজনীতির সঙ্গে মেলানো উচিত কি না সেই নিয়ে পৃথিবীতেই বিতর্ক চিরন্তন, বাংলাদেশ-পাকিস্তান মুখোমুখি হলে এই দেশেও আলোচনাটা ডালপালা গজায়। আচ্ছা চলুন, বাদ দেই। রাজনীতিকে ক্রিকেট থেকে আলাদাই রাখি। রাজনীতির উজ্জ্বল ইতিহাসকে পেছনে রেখে তাকাই আজকের চলন্ত ক্রিকেট ইতিহাসের দিকে। সেটাও এখন কী গৌরবের! প্রতিদিন তাতে যোগ হয় নতুন সোনালি পাতা। লেখা হয় আধুনিক রূপকথা। সেই রূপকথায় আগের দিন দূর হয়েছিল টি-টোয়েন্টির নাবালকত্ব। কাল তা পৌঁছাল যৌবনে। এবং পৌঁছাল এশিয়া কাপের ফাইনালেও। সেই ফাইনাল যাতে পাকিস্তান চার বছর আগে দুই রানের দুঃখে কাঁদিয়েছিল। মনে করেছিলাম জীবনভর বয়ে বেড়াতে হবে সেই কান্নার যন্ত্রণা। ওদের ফাইনালে উঠতে না দিয়ে দূর হয়ে গেল সেটা। এখন চূড়ান্ত সীমানা দেয়াল পার হতে হবে। সামনে ভারত এবং তাই শিহরণটা আরো বেশি। অধুনা ভারতের সঙ্গে নরম-গরম লড়াইয়ের যে চালচিত্র তাতে দুই দলের ফাইনালটাই তো মানায়। প্রিয় ওয়ানডে ২০১২ সালে এশিয়ার সেরা হতে দেয়নি, অপ্রিয় টি-টোয়েন্টি কি দূর করবে সেই হাহাকার! ভারতজয় এবং জমে থাকা আফসোসের জমাট বাতাস উড়িয়ে দেওয়া স্বপ্নের মতো স্ক্রিপ্টটা লুটিয়ে রইল পায়ের কাছে। স্বর্ণদুয়ার থেকে আর একটা মাত্র পদক্ষেপ দূরে।

রাজনীতির সঙ্গে যেমন ক্রিকেটকে মেলানো উচিত নয়, তেমনি ধর্মাচরণ জাতীয় ব্যাপারও দূরে থাকাই বোধ হয় উচিত। কিন্তু কাল ধর্মীয় একটা দৃশ্য দেখলাম এবং দারুণ লাগল! ক্যাচ উঠেছে, তাসকিনের বলে প্রতি ম্যাচে ক্যাচ পড়ে বলে ওর টেনশনটা বেশি, উঁচু ক্যাচ সাকিবের হাতে যতক্ষণে পৌঁছাচ্ছে ততক্ষণ তিনি প্রার্থনায়। সাধারণত নিরাবেগ থাকার নিয়ম যে প্রেসবক্সের তারা পর্যন্ত অকুণ্ঠ সমর্থন করলেন দৃশ্যটার। কিন্তু এসব বিবেচনা নয়, মনে হলো কালকের দিনে প্রত্যেকে যে তার তার মতো নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা নিবেদনে তৈরি এটা হচ্ছে সেই ছবি। বাউন্ডারির কাছে জীবন দিয়ে রান বাঁচালেন কেউ। উঠে যাওয়া ক্যাচও আর এদিন পড়ল না। না, এ হওয়ার দিন। বাংলাদেশের হৃদয় আর ক্রিকেটারদের শরীরের যোগাযোগের সেই দিন যেদিন সব হয়। ইতিহাস পেছনে পড়ে, রূপকথা নতুন রূপ নেয়, অঙ্ক মেলে মনের মতো করে।

মিরপুর স্টেডিয়ামের পরিবেশটা এই টি-টোয়েন্টিতে পরাবাস্তব চেহারা নেয়। সন্ধ্যার পরের অন্ধকার, তাকে ভেদ করা ফ্লাডলাইটের ঝাঁঝাঁলো আলো এবং সঙ্গে দর্শক মোবাইল ক্যামেরার ফ্লাশ মিলিয়ে এ যেন শিল্পীর আঁকা সুন্দরের সুন্দরতম ছবি। কখনো তাতে সমুদ্রের ঢেউ, কখনো শ্মশানের স্তব্ধতা, কখনো মর্মভেদী আফসোসের মিলিত ‘উফ’ ধ্বনি। আর টি-টোয়েন্টির সুবিধা এটাই যে মাত্র তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টার খেলা বলে সারাক্ষণ চেঁচিয়ে যাওয়া যায়। সব সময় কিছু না কিছু ঘটছে বলে বিরতিরও দরকার নেই কোনো। উপমা-উেপ্রক্ষায় মিরপুর এখন ক্রিকেট মন্দিরের প্রতিবিম্ব এবং ক্রিকেট দুনিয়া এই জিনিস অন্য কোথাও দেখে না। কিন্তু ঠিক এটাও নয়, এই মিরপুর বা আমাদের মানুষের মূল অবদানের জায়গাটা অন্য। মানুষের এই উত্তেজনা অদৃশ্য সেতুতে প্রবাহিত হয়ে যায় ক্রিকেটারদের ভেতরে। মাঠে তাই হৃদয়টা যেন শিহরিত দর্শকদের, শরীরটা ক্রিকেটারদের। চাহিদার এই মর্মটা বোঝে আরো ঝাঁপান ক্রিকেটাররা। অসম্ভব সম্ভব হয়। স্বপ্ন রং পায় প্রতিদিন। এই জেদ, এই শক্তির সমাবেশ না হলে যে টি-টোয়েন্টিতে আমরা পারি না সেটাতেই কী করে ফাইনালে যাওয়া যায়! শক্তির প্রবাহ, একটা সাফল্যের তাড়নায় পরেরটা—এই তো বাংলাদেশ ক্রিকেটের ব্যাকরণ। এটা অন্যরা মানবে না। বুঝবে না। এ একান্ত আমাদেরই রসায়ন। 

কাল বিকেলে অনেক দূরে গাড়ি থেকে নেমে, অনেক ভিড় ঠেলে প্রেসবক্সে ঢুকতে ঢুকতে যে তিনজনের সঙ্গে প্রথম কথা হলো, সবার গলায় অভিন্ন আফসোস। মুস্তাফিজ নেই! আজ হবে কিভাবে? তাই তো, মুস্তাফিজবিহীন এখনকার বাংলাদেশ ফনাবিহীন সাপ, দাঁতহীন বাঘ। শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল কী অনিঃশেষ আমাদের প্রতিভার খনি। এক বছর আগে এই দিনে যাকে কেউ চিনত না, আজ সেই তিনিই জাতীয় হাহাকারের নায়ক। এর মধ্যে কেউ মনে করায়, তামিম এসেছেন এবং ফর্মে আছেন। তিনিই হয়তো! তিনি নন, দেখা গেল সৌম্য তাঁর বকেয়া রানটা এদিনই করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবু হয় না। তীরের কাছে গিয়ে বেদনার ঢেউ যেন হাত বাড়ায়। আর তখনই এলেন তিনি। অচিনপুর থেকে আসা সেই রাজকুমার। আমাদের ভাগ্য, তাই তাঁকে পাওয়া। মাশরাফি বিন মর্তুজা তাঁর লৌকিক নাম কিন্তু আসলে তিনি অধুনা বাংলাদেশের প্রাণ। এমনই জাদুময় যে যাতে হাত দেন সেই ছাই-ই সোনা হয়ে যায়। তাঁর ক্রিকেটের বাংলাদেশ হয়ে ওঠে সত্যিকারের সোনার বাংলাদেশ।

এশিয়া কাপটাকে আমরা খুব হাসাহাসি করছিলাম। বারবার বাংলাদেশে হয় বলে কেউ কেউ নাম বদলে ডাকছিল ‘বাংলাদেশ কাপ’। কিন্তু এটাও তো ঠিক বাংলাদেশ আয়োজন করছে বলেই টুর্নামেন্টটা নিয়মিত হচ্ছে। এই এশিয়া কাপকে বাংলাদেশই ভালোবাসার জ্বালানি দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাঁরও তো তাই বাংলাদেশের কাছে একটা দেনা তৈরি হয়েছে। সেই দেনা বুঝি শোধ হলো সুদ-আসলে।

কালকের মায়াবী রাতে ফাইনালের উচ্ছ্বাসে ভাসতে ভাসতে জীবনের সেই পুরনো শিক্ষাটাও যেন নতুন করে পেলাম। কিছু দিলে অবশ্যই ফিরতি কিছু মেলে। দিয়েছিলাম নিংড়ানো হৃদয়। পেলাম উপচানো বিজয়।

মন্তব্য