kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মাশরাফিরা তখনই জানতেন...

মাসুদ পারভেজ   

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



গোলমাল একটা করবেনই মোহাম্মদ সামি আর সেই সূত্রে জয়টাও আসবেই। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে সেটি ভালো করেই জানতেন মাশরাফি বিন মর্তুজা।

আড়াই মাস আগে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) টি-টোয়েন্টির ফাইনালে তাঁর দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সও শেষ ওভারে এ পাকিস্তানি পেসারকে আসতে দেখে নিশ্চিত ছিল যে জয়ের তীরে পৌঁছানো যাবেই। অলক কাপালির ব্যাটে সেই জয় এসেছিলও।

সেবার সামির হাতে শেষ ওভারে বল তুলে দিয়ে ভুক্তভোগী বরিশাল বুলস অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহও এবার মাশরাফির সঙ্গে ফায়দা লোটার আশায় ছিলেন। আর সেটি পাকিস্তান অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি ১৯তম ওভারে সামিকে বোলিংয়ে পাঠাতেই। তাঁর ভাষায় ‘সেমিফাইনাল’-এ পরিণত ম্যাচ জিতে আসার পর বাংলাদেশ অধিনায়কও পূর্ব  অভিজ্ঞতা থেকে জেতার বিষয়ে আরো আত্মবিশ্বাসী হওয়ার ব্যাপারটি লুকালেন না, ‘স্লগ ওভারে এলোমেলো বোলিং করার জন্য কুখ্যাতি আছে সামির। তাই এটা বললে ভুল হবে যে ও আসতেই আমরা একটু বেশি আশাবাদী হয়ে উঠিনি। দেখুন, দুটি নো বল করে গোলমালটা ঠিক ঠিক করে বসলই। ’

তাতে শেষ ওভারের অনিশ্চয়তা বলেও কিছু আর থাকল না। পুরনো ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে ইতিহাসের দায়শোধ করতে পারলেন মাহমুদ উল্লাহও। পাকিস্তান যখন সামনে এবং ফাইনাল আর বাংলাদেশের মাঝখানে শেষ বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে, তখন তাঁর পক্ষে আবেগতাড়িত হয়ে পড়াটাও খুব স্বাভাবিক ছিল। ২০১২-র এশিয়া কাপ ফাইনালে শিরোপার চৌকাঠ থেকে ফেরার কান্না তো আর এত সহসাই ভুলে যাওয়ার নয়।

সেই ফাইনালে শেষ দুই ওভারে ১৯ রান দরকার ছিল বাংলাদেশের। আর গতকালকের টি-টোয়েন্টি ম্যাচে শেষ ২ ওভারে দরকার ১৮ রান। ২০১২-র ফাইনালে শেষ ওভারে ৯ রানের প্রয়োজন মেটাতে না পেরে মাত্র ২ রানে হারার সময় উইকেটে মাহমুদ উল্লাহও ছিলেন। আর গতকাল সামির গোলমেলে ওভারে ১৫ রান উঠে যাওয়ার পর শেষ ওভারে ৩ রান ওঠা নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তাই রইল না। মাত্র ১৫ বলে দুই বাউন্ডারি ও এক ছক্কায় সাজানো অপরাজিত ২২ রানের ম্যাচ ভাগ্য গড়ে দেওয়া ইনিংস খেলার পথে বারবার মাহমুদ উল্লাহর স্মৃতিতে সেই দুঃস্বপ্ন উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল।

আবেগতাড়িত হয়ে বলছিলেন, ‘ওই ফাইনালটির কথা খুব বেশি মনে পড়ছিল। এই জয় সেটি ভুলতে আমাদের সাহায্য করবে। ’ সেই বেদনা ভুলতে পারার আনন্দাশ্রু গড়িয়েছে এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চোখ থেকেও। বাংলাদেশের ছেলেদের ট্রফি উঁচিয়ে ধরা মুহূর্ত দেখতে এসে ২০১২-র এশিয়া কাপ ফাইনালের দিন স্টেডিয়াম থেকে হতাশা নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন তো তিনিই। এবার তাঁর আনন্দ নিয়েই ফিরতে যাওয়ার সাক্ষী বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে স্টেডিয়ামের প্রেসিডেন্ট বক্সে বসে খেলা দেখে এসে বলছিলেন, ‘জয়ের আনন্দে আমাদের প্রধান মন্ত্রীকেও চোখ মুছতে দেখলাম। ’

আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিও এলো মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটেই। পেসার আনোয়ার আলীর করা শেষ ওভারের প্রথম বলেই বিজয় ধরা দিল। ফুলটসে মিডউইকেট দিয়ে বাউন্ডারি মারা মুহূর্তটি মাহমুদের ব্যাটেই দেখতে চেয়েছিলেন মাশরাফিও, ‘২০১২-র ফাইনালে ৬ বলে ৮ রান (আসলে ৯ রান) লাগার ব্যাপারটি ওই সময়ে ওর মনে পড়ে যাচ্ছিল হয়তো। এবার শেষ ওভারে ও এসে আমাকে বলছিল কী করবে। আমি বলেছিলাম পেলে মেরে দিবি। আমি নিজেও চাচ্ছিলাম ওর থেকেই উইনিং শটটি আসুক। পরে ড্রেসিংরুমেও বলেছে উইনিং শটের অর্থ ওর কাছে কতটা ব্যাপক। ’

তবে মোহাম্মদ আমিরের বলে সাকিব আল হাসানের বিদায়ের পর মাশরাফি ব্যাট করতে নেমে যাওয়াটা কিছুতেই ব্যাপক কোনো পরিকল্পনার অংশ ছিল না। হুট করেই নাকি সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলেন কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে, ‘ওই সময়ে বল একটু রিভার্স করছিল। কোচ এসে বললেন ওভারে প্রথম দু-তিন বলের মধ্যে সাকিব আউট হলে যেন আমি নামি। আর শেষ বলে আউট হলে আমার নামার দরকার নেই। ও দ্বিতীয় বলেই আউট হয়ে যাওয়াতে কোচ আমাকে সুযোগটি নিতে বললেন। গিয়েই প্রথম বলটা সাধ্যের মধ্যে পেয়ে যাই। পরেরটা লেগে গেছে আর কী!’

ফাইনাল নিশ্চিত করায় সেই দুটি বাউন্ডারির ভূমিকাও কম নয়। যিনি নিজেও পুরো দলের মধ্যে এই বিশ্বাস ছড়াতে চেয়েছেন যে এই দলের পক্ষে ফাইনালে খেলা সম্ভব। এমনকি প্রথম ম্যাচে ভারতের কাছে হারার পরেও, ‘ছেলেদের বলে এসেছি আমরা কিন্তু চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে খেলতে আসিনি। কাজেই আমরা যা-ই করব, সেটিই অর্জন হয়ে থাকবে। ’ এবার সেই অর্জনের দিনে পুরনো বেদনা ভোলায় শেষ ছোঁয়াটা দিলেন সেই মাহমুদ উল্লাহই।


মন্তব্য