kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রামপুরায় ভাই-বোনের মৃত্যু

পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই হত্যা!

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই হত্যা!

রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী এলাকায় দুই ভাই-বোনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিষয়ে রহস্যের জট খোলেনি। তবে চিকিৎসকদের মতো পুলিশ ও র‌্যাবও ধারণা করছে, দুই সহোদরকে হত্যা করা হয়েছে।

কিন্তু কারা, কেন, কিভাবে তাদের হত্যা করেছে সে বিষয়ে গত দুই দিনের তদন্তে নিশ্চিত কোনো সূত্রের নাগাল পায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যদিও তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবারের কেউ না কেউ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। তাঁরা বলছেন, ঘটনার সময় দুই ভাই-বোনের মা মাহফুজা মালেক জেসমিন ও দাদি হাসনা বেগম বাসায় ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতিতেই দুই শিশু মারা গেছে। তাঁদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।

দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁদের মা-বাবা ও স্বজনরাও পুলিশের সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন। গতকাল বুধবার সকালে র‌্যাব-৩-এর একটি দল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাবা আমান উল্লাহ, মা মাহফুজা মালেক ও খালা আফরোজা মালেককে জামালপুর থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে। এর আগে এ ঘটনায় আটজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনকে ইতিমধ্যে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

দুই ভাই-বোনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় জব্দ করা আলামত (ভিসেরা), ডিএনএ প্রোফাইলিং ও রাসায়নিক পরীক্ষার অনুমতি চেয়ে গতকাল আদালতে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার এসআই সোমেন কুমার বড়ুয়া। আদালত অনুমতি দেওয়ায় পুলিশ আলামত পরীক্ষার জন্য মহাখালী রাসায়নিক গবেষণাগারে পাঠায়।

গত সোমবার রাতে ওই দুই শিশু মারা যায়। তারা হলো ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের (বেইলি রোড শাখা) সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ইশরাত জাহান অরণী (১৪) ও তার ছোট ভাই হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের নার্সারির ছাত্র আলভী আমান (৬)। মা-বাবার সঙ্গে তারা বনশ্রীর সি ব্লকের চার নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসায় থাকত। বাবা আমান উল্লাহ পোশাক ব্যবসায়ী। তাদের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার রায়েরপাড়া গ্রামে। জামালপুরের ইকবালপুর এলাকাতেও তাদের বাড়ি আছে। গত মঙ্গলবার দুই শিশুর লাশ জামালপুর পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

শুরু থেকেই পরিবারের সদস্যরা দাবি করছেন, খাদ্যে বিষক্রিয়া থেকে দুই শিশু মারা গেছে। স্থানীয় একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টের খাবার খাওয়ার পর তারা ঘুমিয়ে পড়ে। সে ঘুম আর ভাঙেনি। তবে ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকরা জানান, তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এগুলো হত্যার আলামত। প্রাথমিকভাবে তাঁরা ধারণা করছেন, দুই শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

গতকাল পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনা মামলা হয়নি। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ঘটনার সময় ওই বাসায় দুই শিশু, তাদের মা ও দাদি ছাড়া আর কেউ ছিলেন না, এ ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে। দাদির দেওয়া তথ্য মতে, সোমবার বিকেল ৫টার দিকে তিনি নামাজ পড়ে শিশুদের খোঁজ নিতে শিশুদের মায়ের রুমের সামনে যান। এ সময় দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা ছিল। তিনি বউমা বলে ডাক দেন। কোনো সাড়া না পেয়ে দরজার সামনে থেকে সরে এসে সোফায় গিয়ে বসেন। এরপর তাঁর বউমা দরজা খুলে চিৎকার করে ওঠেন, মা দেখে যান, ওরা কেমন যেন করছে। তিনি (দাদি) ওই রুমে গিয়ে দেখতে পান, নাতি বিছানায় আর নাতনি মেঝেতে নিথর অবস্থায় আছে। ওই সময় শিশু দুটির মা কান্নাকাটি করছিলেন।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, শিশুদের দাদি ও মা-ই এ ঘটনার প্রকৃত সাক্ষী। তাঁরা যেহেতু ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন, কাজেই তাঁরাই বলতে পারবেন কিভাবে কী হয়েছে।

গতকাল বনশ্রীর ওই বাসার গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। ঘটনার দিন ওই বাসায় কাজ করতে যাওয়া গৃহপরিচারিকা আমেনা বেগম বলেন, সোমবার সকাল ৯টার তিনি কাজ করতে যান। কাজ শেষ করে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ম্যাডাম অর্থাৎ শিশুদের মা ও দাদিকে বাসায় দেখেছেন। শিশুরা সে সময় স্কুলে ছিল। কয়েক মাস ধরে তিনি বাসাটিতে কাজ করছেন। তবে কখনো ওই পরিবারের লোকজনের মধ্যে খারাপ কিছু দেখেননি। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কখনো মনোমালিন্যও তাঁর চোখে পড়েনি।

র‌্যাব-৩-এর পরিচালক লে. কর্নেল খন্দকার গোলাম সারোয়ার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, দুই শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই তাঁদের। তবে খুনি কে বা কারা, কেন তারা হত্যা করল, এটাই ভাবনার বিষয়। এ পর্যন্ত মা-বাবা যে তথ্য দিয়েছেন তার সঙ্গে অন্যদের বক্তব্যের ব্যাপক অমিল পাওয়া যাচ্ছে। মা-বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় আনা হয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যায় দুই শিশুর মা, বাবা ও খালাকে ঢাকায় আনার পর র‌্যাব সদর দপ্তরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদে বাবা, মা, দাদি, খালাসহ অন্যরা শিশুদের মৃত্যুর বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্য দেননি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘অত্যন্ত স্পর্শকাতর এ ঘটনায় আগ বাড়িয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। মা-বাবা অনেক কিছু জানতে পারেন, এটা ধরেই নিয়ে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁদের হয়রানি করার কোনো উদ্দেশ্য নেই। ’

সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার দুপুরে বনশ্রীর ওই বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী পিন্টু মিয়া ও ফেরদৌস, দুই শিশুর চাচা ওবায়দুর, আরেক আত্মীয় শাহীন, গৃহশিক্ষিকা শিউলি আক্তারসহ পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব-৩-এর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার আগে তাঁরা কে, কখন ওই বাসায় গিয়েছিলেন এবং কী দেখেছেন ও শুনেছেন কেবল তা-ই জানিয়েছেন। এর বাইরে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তাঁরা। পরিবারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার রাতেই বনশ্রীর ডি ব্লকের কেন্ট চায়নিজ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মাসুদুর রহমান, ওয়েটার রনি মিয়া ও আতোয়ার হোসেনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মঙ্গলবার তাঁদের আদালতের মধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, রহস্য উদ্ঘাটনে সম্ভাব্য কারণগুলো মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। মা-বাবাসহ কেউ সন্দেহের বাইরে নেই। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট ‘ক্লু’ খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।

দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জব্দ করা ১৩ আলামতের মধ্যে রয়েছে বালিশ, বিছানার চাদর, বালিশের কভার, টিস্যু, কম্বল পেপার ও চুল। রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য চায়নিজ রেস্টুরেন্টের খাবার ও বোতলে সংরক্ষিত পানি সংগ্রহ করা হয়েছে।

দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুতে তাদের স্কুলের শিক্ষক, সহপাঠীরা শোকে কাতর। গতকাল উভয় স্কুলে দুই শিশুর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়।

 


মন্তব্য