গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধে কাদেরিয়া-331556 | প্রথম পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনী

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনী

দেশমাতৃকার মুক্তিসংগ্রামে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধের জন্য টাঙ্গাইল অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল কাদেরিয়া বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধে এই গেরিলা বাহিনী টাঙ্গাইল অঞ্চলে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকিস্তানি সেনারা একাত্তরে বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি—এমন অঞ্চলগুলোর অন্যতম টাঙ্গাইল।

তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে এই বিশাল তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে এই বিশাল কাদেরিয়া বাহিনী। স্বাধীনতার ৯ মাসে দেশের ভেতরে থেকে বেসামরিক গেরিলাযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী গড়ে তোলেন ১৭ হাজার নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ও ৭০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে এই বিশাল বাহিনী। কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয় অসাধারণ গেরিলাযুদ্ধ এবং বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধ। টাঙ্গাইল ও পাশের তিনটি জেলা ঢাকা, ময়মনসিংহ ও পাবনার বিস্তীর্ণ এলাকায় কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা একের পর এক আঘাত হেনে হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন। এই বাহিনীর হেডকোয়ার্টার ছিল টাঙ্গাইলের সখীপুরের প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে। এখানে আন্ধি গ্রামে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এই কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন শওকত মোমেন শাহজাহান।

কাদেরিয়া বাহিনীর সামরিক শাখার পাশাপাশি বেসামরিক বিভাগও ছিল। এই বিভাগের প্রধান ছিলেন আনোয়ার উল আলম শহীদ। বিভিন্ন আঞ্চলিক বেসামরিক বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন আবু মোহাম্মদ এনায়েত করিম, মোয়াজ্জেম হোসেন খান ও খন্দকার নূরুল ইসলাম। জুন মাসের শেষের দিকে কাদেরিয়া বাহিনীর আন্ধি হেডকোয়ার্টার থেকে আবু মোহাম্মদ এনায়েত করিমকে প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়ে ভূঞাপুর, গোপালপুর ও টাঙ্গাইলের যমুনা নদীর চরাঞ্চলে যুদ্ধের জন্য অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

কাদেরিয়া বাহিনী পরিচালিত হতো সামরিক কায়দায়। এই বাহিনীর হেডকোয়ার্টার সন্নিহিত মুক্তাঞ্চলে হাসপাতালও স্থাপন করা হয়েছিল। সেখানে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দেওয়া হতো। বাহিনীর ছিল অর্থ বিভাগ, জনসংযোগ বিভাগ, বেতার-টেলিফোন-যোগাযোগ বিভাগ, খাদ্য বিভাগ এবং বিচার ও কারাগার বিভাগ। 

টাঙ্গাইলের মুক্তিযোদ্ধারা অসংখ্য গেরিলাযুদ্ধসহ বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। তাৎপর্যের বিষয় হলো, অধিকাংশ যুদ্ধেই তাঁরা সফল হন। কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অসংখ্য হানাদার সেনা ও তাদের দোসর নিহত ও আহত হয়। যুদ্ধ করতে গিয়ে শহীদ হন এই বাহিনীর অনেক মুক্তিযোদ্ধাও।

আবু মোহাম্মদ এনায়েত করিম জানান, ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৭০টি যুদ্ধে অংশ নেয় কাদেরিয়া বাহিনী। সম্মুখযুদ্ধগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—মাকড়াই, ধলাপাড়া, কামুটিয়া, বল্লা, ফুলতলা, বাথুলি, পাথরঘাটা ও ঘাটাইলের যুদ্ধ।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থানার মাটিকাটার যুদ্ধ কাদেরিয়া বাহিনীর সবচেয়ে বড় ও সফল যুদ্ধ। ‘জাহাজমারা’ যুদ্ধ নামে এর খ্যাতি রয়েছে। এই যুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অবিস্মরণীয় সাফল্যের ঘটনা। এটি ছিল মূলত হানাদারদের অস্ত্রবাহী জাহাজবহরের ওপর কাদেরিয়া বাহিনীর অভিযান। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের উদ্দেশে হানাদার বাহিনীর অস্ত্রবোঝাই সাতটি জাহাজের একটি বহর ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট টাঙ্গাইলে ধলেশ্বরী নদীর সিরাজকান্দি ঘাটে নোঙর করে। এই খবরে কাদেরিয়া বাহিনীর কমান্ডার হাবিবুর রহমান ও তাঁর দল ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। ১১ আগস্ট সেখান থেকে জাহাজগুলো আবার যাত্রা শুরু করলে হাবিবের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি সুযোগ খুঁজতে থাকে। হাবিবের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি অবস্থান নেয় মাটিকাটায় যমুনা নদীর তীরে। ১২ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে সেখান দিয়ে যাওয়ার পথে তিনটি ছোট জাহাজ বেশ কিছুদূর সামনে চলে যাওয়ার পর অস্ত্রবোঝাই দুটি জাহাজ কাছাকাছি এলেই গর্জে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের এলএমজি। এতে জাহাজ দুটির ওপরে বসে থাকা পাকিস্তানি সেনারা হকচকিত হয়ে পড়ে এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে তাদের কেউ জাহাজের ওপরই মারা যায়; কেউ বা গুলি খেয়ে নদীতে পড়ে। আর সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া জাহাজের আরোহী হানাদাররা ভয় পেয়ে আর পেছনে না ফিরে চলে যায়। এই যুদ্ধজয়ের পর মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা অস্ত্রবোঝাই জাহাজে উঠে বিপুল অস্ত্রের সম্ভার দ্রুত নামাতে শুরু করেন। এই কাজে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে মুক্তিকামী গ্রামবাসী। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা জাহাজ দুটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে উদ্ধারকৃত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিরাপদে সরে যান। জাহাজের লগবুক ও মুভমেন্ট অর্ডারের হিসাব অনুযায়ী, দখল করা জাহাজ দুটিতে ২১ কোটি টাকা মূল্যের নানা ধরনের চায়নিজ, ব্রিটিশ ও মার্কিন অস্ত্রশস্ত্র ছিল। এই অভিযানে সংগৃহীত অস্ত্রগুলো টাঙ্গাইলের মুক্তিযোদ্ধাদের পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে।

টাঙ্গাইলে কাদেরিয়া বাহিনী গড়ে ওঠার আগে টাঙ্গাইলের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের ২৬ মার্চের সভায় সশস্ত্র গণবাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সে অনুসারে শুরু হয়েছিল মুক্তিবাহিনী সংগঠনের কাজ ও সশস্ত্র প্রশিক্ষণ। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন আবু মোহাম্মদ এনায়েত করিম।

আবু মোহাম্মদ এনায়েত করিম জানান, ১৬ আগস্ট ঘাটাইলের মাকড়াই যুদ্ধে কাদের সিদ্দিকীর হাতে ও পায়ে গুলি লাগে। ১৮ নভেম্বর ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ সব সড়কের সেতু ভেঙে হানাদার বাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ১১ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয় টাঙ্গাইল। এরপর কাদেরিয়া বাহিনী সাভার হয়ে ঢাকার পথে রওনা হয়।

ডিসেম্বরে ঢাকা জয়েও বিশেষ ভূমিকা রাখে কাদেরিয়া বাহিনী? ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী? মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ অবদানের জন্য বীর-উত্তম উপাধি লাভ করেন কাদের সিদ্দিকী? ‘বঙ্গবীর’ নামেও বিশেষ পরিচিত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

মন্তব্য