kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মার্চের মধুর জয়ে ফাইনালে

নোমান মোহাম্মদ   

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মার্চের মধুর জয়ে ফাইনালে

পাকিস্তানকে হারিয়ে এশিয়া কাপের ফাইনাল নিশ্চিত করার পর মাশরাফিদের মুখে বিজয়ের হাসি। ছবি : মীর ফরিদ

আবার ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বনসাই হয়ে যায় শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের কংক্রিট-গোলক। আবার ১৬ কোটির ছবি আঁকা গ্যালারির ঠাসবুনটের ২৫ হাজার দর্শকের ক্যানভাসে।

আবার জীবনের মিনিয়েচার প্রতিফলিত ক্রিকেটের দর্পণে। আবারও যে কাল গর্জে ওঠে বাংলাদেশ ক্রিকেটের দামাল ছেলেরা!

এ গর্জন বিজয়ের। এ অর্জন এশিয়া কাপের ফাইনাল নিশ্চিত করার। কাল পাকিস্তানকে ৫ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাসের অমর পাতায় অক্ষয় কালিতে নিজেদের নাম লিখে ফেলে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। বাংলাদেশ ক্রিকেট রূপকথায় যোগ করে নতুন অধ্যায়। আর কী আশ্চর্য, মার্চের আরেক অন্ধকার রাতেই তো কাল বাংলার আকাশে আবার ফুটে ওঠে আলোর ফুল!

৪৫ বছর আগে এই মার্চে এসেছিল এমনই আরেক ঘোরলাগা সময়। আশ্চর্য সেই সময়ের হাত ধরে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে ব্যাকুল জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিসংগ্রামে। শুরু হয় অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা। শুরু পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের  স্বাধীনতাযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ওই মুক্তিযোদ্ধারাই যে প্রকৃত বীর, বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি সুযোগ পেলে মনে করিয়ে দেন তা। যদিও ক্রিকেটের গালিচায় যুদ্ধের ময়দানের সৈনিক তিনি এবং তাঁর দলও। রাইফেল-বেয়নেটের বদলে তাঁদের হাতে ব্যাট-বল, এই যা পার্থক্য!

সেই ব্যাট-বলের লড়াইয়ে কাল আরেক মার্চে আরো একবার পাকিস্তানকে হারায় বাংলাদেশ। তাতে নিশ্চিত হয় ৬ মার্চ ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপ ফাইনালে খেলা। যে আশ্চর্য অর্জনে গোটা মানচিত্রকে আনন্দ-গর্জনে মাতিয়ে তোলে মাশরাফি-ব্রিগেড।

মাশরাফি-ব্রিগেড? বদলে যাওয়া এই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তো আক্ষরিক অর্থেই অধিনায়কের সেনাদল! তাঁর জিয়নকাঠির স্পর্শে জেগে ওঠা স্বপ্নতাড়িত ১১ জন। ২০১৪ সালের গোধূলিতে জাতীয় দলের সীমিত ওভারের নেতৃত্বে ফেরার পর বারবার তা প্রমাণ করেছেন মাশরাফি। কাল প্রমাণ করলেন আবার। পাকিস্তানের বিপক্ষে যেভাবে দলকে জেতান, সেটি ওই মাশরাফি ছাড়া আর কে পারতেন!

আশার বাতিঘর হয়ে থাকা সাকিব আল হাসান কাল আউট হয়ে যান ১৮তম ওভারে। এরপর মোহাম্মদ মিঠুনের ক্রিজে যাওয়াই তো স্বাভাবিক। এশিয়া কাপের আগের তিন ম্যাচের ওপেনার তিনি। তামিম ইকবাল ফেরায় সে জায়গা হারান বটে। তবে সাকিবের আউটে সমীকরণ যখন ১৬ বলে ২৬ রানের প্রয়োজনীয়তা, তখন মিঠুনের ব্যাটে ভরসা করাই প্রত্যাশিত। কিন্তু শত্রুসেনার মুহুর্মুহু আক্রমণের সামনে সতীর্থকে ঠেলে দিয়ে নিরাপদ ছাউনিতে কী করে থাকেন সেনাপতি! বুকে বাঘের সাহস নিয়ে ক্রিজে নেমে যান তাই মাশরাফি। নেমেই প্রথম দুই বলে চার। হতে পারে দ্বিতীয়টি ভাগ্যপ্রসূত, কিন্তু সাহসীদের পক্ষে ভাগ্য থাকার আপ্তবাক্য কার না জানা!

ব্যস, মাশরাফির ব্যাটিং বীরত্বে ম্যাচ চলে আসে বাংলাদেশের দিকে। তার পরও দুই ওভারে ১৮ রানের প্রয়োজনীয়তার রোমাঞ্চ ছিল। মোহাম্মদ সামি ১৯তম ওভারে দুটো নো-বল করে বাংলাদেশের কাজটি করে দেন সহজ। এর মধ্যে শেষটিতে চার মেরে মাহমুদ উল্লাহ আরো সহজ করে তোলেন তা। ওই ওভারে ১৫ রান হয়ে যাওয়ায় স্বপ্নের সুবর্ণবন্দর চলে আসে স্বাগতিকদের দৃষ্টিসীমায়। তাতে রুপালি নোঙর পড়ে শেষ ওভারের প্রথম বলে মাহমুদের আরেক বাউন্ডারিতে। ১৪ বলে ১৮ রানের হীরের মতো অমূল্য ইনিংস খেলে অপরাজিত তিনি। আর চুনি-পান্নার উজ্জ্বলতায় জ্বলজ্বলে মাশরাফির ৭ বলে অপরাজিত ১২।

কাল পাকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামার সময় স্বাগতিকদের সমীকরণ ছিল সোজাসাপ্টা। জিতলেই ফাইনাল। তা সেই জয়ের পথে মূল কাজটি করে রাখেন বোলাররা। পাকিস্তানকে ৯ উইকেটে ১২৯ রানে আটকে রেখে। তবে ইনিংসের প্রথমার্ধ বিবেচনায় এই স্কোর বরং স্বাগতিক ড্রেসিংরুমে-গ্যালারিতে হাহাকার ছড়িয়েছে। আরো ঢের কমে যে আটকে রাখা যেত শহীদ আফ্রিদির দলকে!

পাকিস্তানের সেই ব্যাটিং ইনিংস যেন আলো-আঁধারির আশ্চর্য বসতি। বর্ষা-রোদ্দুরের অবাক সহাবস্থান। এক ইনিংসের মোড়কে এ যে দুই ইনিংস! যার প্রথম ভাগ সন্দেহাতীতভাবে বাংলাদেশের। আর নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের দ্বিতীয় ভাগ। ১০ ওভারে ৩৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে যেখানে কাঁপাকাঁপি অবস্থা ছিল, সেখানে কিনা পরের ১০ ওভারে ৯৫ রান তুলে নেয় আফ্রিদির দল!

অথচ শুরুটা কী অসাধারণই না হয়েছিল! তাসকিন আহমেদের করা প্রথম ওভার থেকে আসে মোটে এক রান। আল-আমিন হোসেন এসে তো প্রথম বলেই তুলে নেন খুররাম মনজুরের উইকেট। গুড লেংথ থেকে লাফিয়ে ওঠা দুর্দান্ত বলটিতে অসহায় পাকিস্তান ওপেনার। তাসকিনের পরের ওভার মেডেন। দুই পেসারের তাণ্ডবের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনকে হতভম্ব করে দেন অন্যরাও। আরাফাত সানি টুর্নামেন্টে প্রথম খেলতে নেমে প্রথম ওভারেই পান উইকেট। মাশরাফিও তাই। যদিও মোহাম্মদ হাফিজের এলবিডাব্লিউতে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের দায়টাই মুখ্য। আর দ্বিতীয় স্পেলে ফেরা তাসকিন যখন উমর আকমলকে বানান সাকিবের ক্যাচ, গ্যালারির গর্জনে তখন কান পাতা দায়। ৮.২ ওভারে ২৮ রানে ৪ উইকেট নেই তখন পাকিস্তানের। মুস্তাফিজুর রহমান নামের জাদুকর যে ইনজুরির কারণে ছিটকে গেছেন, সেটি তখন আর মনে রইল না কারো।

পাকিস্তানের ওই বিপর্যস্ত অবস্থায় জুটি বাঁধেন সরফরাজ আহমেদ ও শোয়েব মালিক। ৮.২ ওভারে ৭০ রানের সেতুবন্ধে দলকে ফেরান ম্যাচে। তবে বাংলাদেশও তাতে ছিটকে যায়নি। ৩০ বলে ৪১ রান করা মালিককে আউট করে ব্রেক থ্রু দেন আরাফাত সানি। সরফরাজ শেষ পর্যন্ত ৪২ বলে ৫৮ রানে অপরাজিত। তাতেও তো ওই ১২৯ পর্যন্ত যেতে পারে পাকিস্তান। ম্যাচের শুরুতে এমন সম্ভাবনায় নিশ্চিতভাবে উৎসবের ঢেউ বয়ে যেত স্বাগতিক ড্রেসিংরুমে।

প্রথম ইনিংস শেষেই তাই ম্যাচ অর্ধেক পকেটে পোরা সারা বাংলাদেশের। রোমাঞ্চ ছড়িয়ে বাকি দায়িত্বটুকু পালন করেন ব্যাটসম্যানরা। প্রত্যাবর্তনে তামিম ইকবাল বেশি কিছু করতে পারেন না; ৭ রান করে আউট। কিন্তু পুরনো ওপেনিং সঙ্গীকে পেয়ে অনেক দিন পর যেন পুরনো চেহারায় ফেরেন সৌম্য সরকার। সাব্বির রহমান ও মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ৩৩ ও ৩৭ রানের ছোট কিন্তু ভীষণ কার্যকর দুটি জুটিতে গড়ে দেন ম্যাচের গতিপথ।

৪৮ বলে ৪৮ রান করেছেন সৌম্য। খালি চোখে হয়তো অমন কিছু না। কিন্তু পাঁচটি চার ও এক ছক্কায় সাজানো ইনিংসটি বাংলাদেশের ক্রিকেট জাদুঘরে ঠাঁই পাবে পরম যত্নে। শুরুর নায়ক বোলাররা আর শেষের নায়ক মাশরাফি-মাহমুদ হলেও ম্যাচসেরা তাই সৌম্য। তাঁর আগে ফিরে যান সাব্বির (১৪); পরে মুশফিক (১২)। আর সাকিবও (৮) যখন আউট, বাংলাদেশের সম্ভাবনার আকাশে আবার এক ফালি কালো মেঘের ওড়াউড়ি। তবে সেটি বোধ করি জয়ের সূর্যস্নানে ভাসিয়ে নেওয়ার আনন্দ আরো শতগুণ বাড়িয়ে দিতেই। মাশরাফির বীরত্বের মঞ্চটা আরো ভালোভাবে সাজাতেই।

এভাবেই ক্রিকেট কখনো কী আশ্চর্যভাবেই না মিলে যায় জীবনের সঙ্গে! দেশের সঙ্গে। জাতির সঙ্গে। আরেক মার্চের আরেক গর্জনে কাল পাকিস্তানকে হারিয়ে যেমন ১৯৭১-কে ২০১৬-এর সঙ্গে মিলিয়ে-মিশিয়ে একাকার করে দিলেন মাশরাফি-ব্রিগেড!

 


মন্তব্য