kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

আজ জিতলেই ফাইনাল

নোমান মোহাম্মদ   

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আজ জিতলেই ফাইনাল

শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের ইনডোরের সামনে এক চিলতে ছোট্ট জায়গা। অনুশীলনের আগে-পরে ঠিক সেখানটায় মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে যান দুজন।

মধ্যাহ্নের উত্তাপ গায়ে মেখে মাশরাফি বিন মর্তুজা। আর অপরাহ্নের সূর্যের তেছরা আলোয় চন্দিকা হাতুরাসিংহে। তবে সময়ের পার্থক্য ঘণ্টা দুয়েক হলে কী হবে, গত বছর পাকিস্তানের বিপক্ষে সীমিত ওভারের সিরিজে বাংলাদেশের সর্বজয়ী রূপের কথা মনে করিয়ে দিতেই অধিনায়ক-কোচের উত্তরে কী আশ্চর্য মিল!

‘আমার মনে হয় না, ওই সিরিজের ফল এবার কোনো সাহায্য করবে। কারণ এটি নতুন দিন, নতুন খেলা, নতুন টুর্নামেন্ট। আগে কী হয়েছে তা না ভেবে, কাল (আজ) কতটা ভালো করতে পারি, তা নিয়ে আমরা ভাবছি’—মাশরাফির চাঁছাছোলা জবাব। হাতুরাসিংহের উত্তর আরো ডাকাবুকো, ‘সেটি তো এক বছর আগের কথা, তাই না? আসলে অত দিন আগে আমরা কী করেছি না করেছি, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এখন আমরা কী করব। ’

তবে অধিনায়ক-কোচ স্বীকার করুন আর না করুন, পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই সিরিজটি কিন্তু আজকের দ্বৈরথের আবহে বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাসের জ্বালানি দেবে। দেবেই দেবে। আগের ১৬ বছর অজেয় ছিল যে দলটি, তাদের ওয়ানডে সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হারানোর পর একমাত্র টি-টোয়েন্টি জেতা তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়! গত বছরের ওই সুখস্মৃতি তাই উজ্জীবনী সৌরভ না ছড়িয়ে পারে!

আর আজ জিতলেই তো এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলবে বাংলাদেশ—তাতিয়ে দেওয়ার জন্য আর কী চাই!

মাশরাফি-হাতুরাসিংহে কাল যখন সংবাদমাধ্যমের সামনে, অদ্ভুত বাঁকবদলের মোড়ে দাঁড়িয়ে তখন এশিয়া কাপ। ফাইনাল খেলায় সম্ভাবনা জিইয়ে ছিল মহাদেশের চার ক্রিকেট পরাশক্তিরই। কাল সন্ধ্যার লড়াইয়ে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ভারত নিশ্চিত করে ৬ মার্চ ট্রফির দ্বৈরথে নিজেদের অংশগ্রহণ। তাতে বাংলাদেশের সমীকরণের ঘোরপ্যাঁচও যায় কেটে। আজ পাকিস্তানের বিপক্ষে জিতলেই তো ফাইনাল! হেরে গেলেও সুযোগ থাকবে। কিন্তু হারার আগে হারার কথা কেন ভাববে বাংলাদেশ। তাও যদি পাকিস্তান সেই আগের মতো অজেয়-অধরা থাকত, সেটি ভিন্ন কথা। গত বছরের সেই অদম্য পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতায় আজ তাই জয় ভিন্ন কিছু ভাবছে না মাশরাফির দল।

এমনিতে এশিয়া কাপের আগের ভাবনায় বাংলাদেশের ফাইনাল খেলার সম্ভাবনা উচ্চারিত হয়নি জোরেশোরে। ফরম্যাটটা টি-টোয়েন্টি যে! আর এতে বাংলাদেশের সীমিত সামর্থ্যের সূত্র ধরেই ওই নিরাশার হাওয়া। প্রথম ম্যাচে ভারতের কাছে যাচ্ছেতাই হার ওই নিরাশাকেই দেয় অনুমোদন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে মাত্র ১৩৩ রানে থেমে যাওয়াতেও। এরপরই যে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন মাশরাফি বিন মর্তুজার দলের! শুরুতে অল্প পুঁজি নিয়ে আমিরাতকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে। পরের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি জিতে। টগবগে আত্মবিশ্বাস নিয়েই তাই আজ পাকিস্তানের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ।

আত্মবিশ্বাসের সেই সৌরভে একটাই কাঁটা—ইনজুরির কারণে মুস্তাফিজুর রহমানের ছিটকে যাওয়া। আবার বাড়তি সৌরভ নিয়ে তামিম ইকবালেরও তো প্রত্যাবর্তন। ক্ষতি-লাভে সমানে সমান। মাশরাফি পরোক্ষে মেনে নেন তা, ‘তামিমের না থাকা ছিল আমাদের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর ব্যাপার। সব ফরম্যাটে সে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান। তামিম অনেক দিন ধরে খেলছে, সে অনেক অভিজ্ঞ। তবে মুস্তাফিজের না থাকা আমাদের জন্য বড় ক্ষতি। ও যেটা দলের জন্য দেয়, সেটা সব সময়ই দলের জন্য অসাধারণ কিছু। এটা প্রমাণিত বিষয়। ’ মুস্তাফিজ না থাকায় আজ হয়তো আর চার পেসার নিয়ে খেলবে না বাংলাদেশ। একাদশে ঢুকতে পারেন বাঁ হাতি স্পিনার আরাফাত সানি।

তবে উইনিং কম্বিনেশন ভাঙলে জয়েরর ধারাবাহিকতা ভাঙবে না বলেই আশাবাদ বাংলাদেশ। আমিরাত ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচ দুটির ধারাবাহিকতা দেখানোর প্রত্যয় মাশরাফির, ‘আমাদের সামনে আসলেই ফাইনাল খেলার খুব ভালো সুযোগ আছে। সর্বশেষ দুটি ম্যাচ যেভাবে খেলেছি, সেভাবে খেলতে পারলে অবশ্যই সুযোগ কাজে লাগানো যাবে। কিছু ভুলও অবশ্য ছিল। কিন্তু আমরা প্রয়োজনের সময় দরকারি কাজ করতে পেরেছি বলেই ম্যাচ দুটি জিততে পেরেছি। ’ পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের জন্য পরিকল্পনার ঠিকঠাক প্রয়োগের ওপর জোর দেন তিনি, ‘এই ম্যাচে যারা জিতবে তাদেরই ফাইনাল খেলার সুযোগ বেড়ে যাবে। সুতরাং এখানে আমাদের প্রতিটি জায়গায়ই সুযোগ আছে। প্রতিপক্ষেরও সুযোগ আছে। তারা একবার টি-টোয়েন্টির চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এ ছাড়া তাদের অনেক খেলোয়াড় বিভিন্ন জায়গায় টি-টোয়েন্টি খেলে। তবে আমরা যদি ওদের দিকে না তাকিয়ে আমাদের পরিকল্পনাগুলো ঠিকঠাক প্রয়োগ করি, আমার মনে হয় আমাদের সব সুযোগই আছে। ’

সুযোগের আরেকটি বড় জায়গা সম্ভবত উইকেট। এমনিতে এশিয়া কাপের উইকেট দেখে চমকে গেছেন অনেক ক্রিকেটবোদ্ধা। ঘাস-গতি-বাউন্সে যেন উপমহাদেশের ২২ গজ নয় এটি। টুর্নামেন্ট এগোতে থাকায় সপ্রাণ উইকেটের সতেজতা কমেছে অনেকটা। মোহাম্মদ আমিরের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের দুরন্ত পেস বোলিং সামলাতে তাই আর অতটা ঝামেলা হওয়ার কথা নয় বাংলাদেশের। মাশরাফি অবশ্য সরাসরি কিছু না বলে ওই নিজেদের কাজে মনোযোগ দেওয়া কথাই পুনর্ব্যক্ত করেন, ‘এখন উইকেটে খুব বেশি ঘাস থাকছে না। আর পাকিস্তানের বিপক্ষে কোন উইকেটে খেলা হবে, তা জানি না। তবে আমরা ওদিকে চিন্তা না করে নিজেদের কাজ গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। ’ কোচ হাতুরাসিংহেরও প্রায় অভিন্ন উচ্চারণ, ‘উইকেট ক্রমশ শক্ত হচ্ছে। এতগুলো ম্যাচ টানা খেলার পর সেটি সতেজ থাকার আশা করা যায় না। এটি আমাদের সাহায্য করবে কি না, জানি না। উইকেটে গতি থাকলে তাও কিন্তু আমাদের সাহায্য করে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজে যেমন দ্রুতগতির পিচে খেলেছি। আমাদের তাই অভিযোগ না করে উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। ’

পাকিস্তানের বিপক্ষে গত বছরের সিরিজ নিয়ে প্রশ্নে কোচ-অধিনায়কের একই উত্তর। উইকেট নিয়ে প্রশ্নেও উত্তরের অভিন্ন মোহনায় তাঁরা। এবার হাতুরাসিংহের পরিকল্পনার বাস্তবায়নটা আজ যদি মাশরাফির নেতৃত্বে ১১ ক্রিকেট সৈনিক করতে পারেন, তাহলেই কেল্লাফতে!

পাকিস্তানকে হারিয়ে এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠবে তখন বাংলাদেশ।


মন্তব্য