kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


১/১১ সম্পর্কে আনিসুল ইসলাম

গ্রেপ্তার এড়াতে এরশাদ সমঝোতা করেছিলেন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



গ্রেপ্তার এড়াতে এরশাদ সমঝোতা করেছিলেন

আনিসুল ইসলাম

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, এক-এগারোর সময় গ্রেপ্তার এড়াতে পার্টির চেয়ারম্যান নিজেই সমঝোতা করেছিলেন। তাঁর নির্দেশ ও সুবিধার্থেই আমি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়েছিলাম।

আমি এ দায়িত্ব নিয়েছিলাম বলেই মাইনাস থ্রি ফর্মুলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন এরশাদ। গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

এর আগে শেরপুরে জাতীয় পার্টির সম্মেলনে গত রবিবার জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বলেছেন, এক-এগারোর কুশীলব হিসেবে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বিচার হওয়া উচিত। এরশাদের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সচিবালয়ের নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমি এরশাদের বিরুদ্ধে কখনো কোনো পাবলিক স্টেটমেন্ট দেইনি। তার একটা কারণ হচ্ছে—রুচিবোধের একটা প্রশ্ন আছে। রাজনৈতিক রুচিবোধ যাকে বলা হয়। সাত বছর আমি তাঁর মন্ত্রী ছিলাম। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি আমাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এমনকি যেদিন ক্ষমতা হস্তান্তর করি আমরা, সেদিনও আমাদের দুজনের মধ্যেই সিদ্ধান্তটা হয়। ক্ষমতা ধরে রাখলে মানুষ মারা যাবে, সে কথা চিন্তা করেই ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলাম সেদিন। আমি  অকপটে তা স্বীকার করি। ’

আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘২০০৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর ব্রিগেডিয়ার বারী ২০ হাজার ডলার নিয়ে দেশত্যাগ করতে বলেছিলেন এরশাদ সাহেবকে। কিছুক্ষণ পর এরশাদ সাহেব আমাকে, জিয়া উদ্দিন বাবলু, গোলাম মসীহ ও গোলাম রেজাকে ডেকে নিলেন। প্রথম উনি নিজেই বলেছিলেন, আমি যেতে চাই না। আমরা বলেছিলাম, আপনার যাওয়ার কোনো দরকার হবে না। আমরা কিছু একটা করব। পরের সপ্তাহে উনাকে আমাদের পরিকল্পনামতো বাবলুর বাড়িতে অবস্থান করাই। এটা আমরা কজন এবং উনার পরিবার ছাড়া আর কেউ জানত না। ১৮ তারিখ আমি মহাজোট করার চুক্তি, এমপি-মন্ত্রিত্ব ভাগাভাগি ও এরশাদ সাহেবকে রাষ্ট্রপতি করার শর্ত নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা করি। এর মধ্যে মার্শাল ল হবে, এটা হবে, সেটা হবে এমন জল্পনা-কল্পনা চলছে। এরপর ১১ জানুয়ারি ইয়াজউদ্দিন সাহেব জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। বেশ কিছুদিন যাওয়ার পর মাইনাস টু, মাইনাস থ্রি কথাগুলো ওঠে। মূলত ওটা ছিল মাইনাস থ্রি। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন। এবং তার পরই এরশাদের গ্রেপ্তার হওয়ার কথা ছিল। তখন এরশাদ সাহেব সমঝোতা করেন। তিনি গ্রেপ্তার না হয়ে স্টেপ ডাউন করবেন। তিনি আরো বলেন, এই বোঝাপড়াগুলো তো এরশাদ নিজেই করেছেন। আমি তো করিনি। আমরা তাঁকে বলেছিলাম স্টেপ ডাউন করা উচিত হবে না আপনার। আপনি চেয়ারম্যানই থাকেন এবং একজনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেন। এরপর তিনি জি এম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য প্রথম অফার করেন। জি এম কাদের তখন রাজি হননি। তার কারণ হচ্ছে, তখন জেনারেল মইন উ আহমেদের যে সেমিনারগুলো হচ্ছিল, সেগুলোতে তিনি যোগদান করছিলেন। জি এম কাদেরের ইচ্ছা ছিল জেনারেল মইনরা যদি সরকার গঠন করেন এবং রাজনীতি করেন, তাহলে সেটার অংশ হতে। ’

এরশাদের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ আনিস বলেন, ‘আমি তখন এরশাদের নির্দেশে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদ গ্রহণ করি। আমি দুই বছরে উনাকে জানানো ছাড়া দলে কোনো পরিবর্তন আনিনি। সাধারণত আমাদের পার্টিতে দেখা যায়, আজ এ আছে তো কাল ও নেই। আমি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদ গ্রহণ করায় মাইনাস থ্রিটা হয়নি। এটা মাইনাস টুতে গিয়ে থেমেছে। তাই মাইনাস থ্রি বলাটা ঠিক হবে না। উনি উনার ছেলে এরিখ এরশাদের ব্যাংক আকাউন্টের লিগ্যাল গার্ডিয়ান আমাকে করেছেন। উনার ভাইকে তো করেননি। আমি যদি জোর করেই কিছু করতাম, তাহলে এখান থেকে লাভবান হতে পারতাম। আমি নিশ্চয়ই জোর করে লিগ্যাল গার্ডিয়ান হইনি। ’

৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রসঙ্গ টেনে এই জাপা নেতা বলেন, ‘এরশাদ সাহেবসহ আমরা সবাই বসে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মনোনয়নপত্র দাখিল করলাম। তার পরের দিনই তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বললেন। সেদিন জি এম কাদের ও রুহুল আমিন হাওলাদার এরশাদ সাহেবকে বুঝিয়েছেন। আর তাতেই হঠাৎ এরশাদ সাহেব নির্বাচন বর্জন করেন। অথচ হাওলাদার নিজেও নির্বাচনে ছিলেন। হাওলাদার ও তাঁর স্ত্রী এবং এরশাদ নিজেও এখন সংসদ সদস্য। ’ আনিস বলেন, ‘এখন মন্ত্রিসভা থেকে বের হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। পার্টির ভালোর জন্য যদি মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়, ছাড়ব। তবে আগে বোঝাতে হবে এর পেছনে যুক্তি কী। মন্ত্রিত্ব ছাড়ার কথা জি এম কাদের বলছেন। তিনি নির্বাচনকেও অবৈধ বলছেন। কিন্তু মানুষের ভণ্ডামির একটা সীমা আছে। তিনি নির্বাচনবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন অথচ কয়েকটা জায়গা থেকে উপনির্বাচনের মাধ্যমে এমপিও হতে চেয়েছেন। তিনি এরশাদ সাহেবকে দিয়ে মন্ত্রী হওয়ার জন্য চিঠি লিখিয়েছিলেন। মৌখিক তদবিরও করেছেন। ’

পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ‘জি এম কাদের সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। আরেকজন তাঁকে উত্তরাধিকার ঘোষণা করেছেন। এটা কি গণতন্ত্র? কো-চেয়ারম্যান পদটা আমাদের গঠনতন্ত্রে নেই। অথচ তাঁকে করা হলো। এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র? পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হলেই এই পার্টি তাঁর, এটা ঠিক না। তাঁর সন্তান পার্টির উত্তরাধিকার হবে, এটাও ঠিক না। এভাবে একটা রাজনৈতিক দল চলতে পারে না। ’ 

আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘জি এম কাদের এমন ব্যক্তি, যিনি এক আসন থেকে দুইবার নির্বাচন করতে পারেননি। যতবার এমপি হয়েছেন তাঁর ভাইয়ের পরিচয়ে এমপি হয়েছেন। এরশাদ সাহেব তাঁর এই ভাইয়ের জন্য পার্টি ধ্বংস করে দিচ্ছেন। এটা আমি চাই না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘হয়তো আমি পার্টি থেকে বহিষ্কারও হয়ে যেতে পারি। এটা নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ’ এরশাদের উদ্দেশে এই জাপা নেতা বলেন, ‘আপনি ব্যক্তিগত কারণে পার্টিকে ধ্বংস করে দিবেন না। পার্টির জন্য আপনি ছাড়াও অনেকের অবদান আছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যতটুকু সম্ভব বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছি। ৪০ জন এমপির মধ্যে ৩৫ জনই এরশাদ সাহেবের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন এখন। অগণতান্ত্রিক কিছু হলে প্রতিবাদ করা হচ্ছে এখন। এটা পার্টির জন্য ভালো। এরশাদ সাহেবের উচিত সবার সঙ্গে কথা বলা। ’


মন্তব্য