kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মমতাজের কাছে মানুষ পরিচয়টাই বড় হয়ে ওঠে

কাজী হাফিজ   

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মমতাজের কাছে মানুষ পরিচয়টাই বড় হয়ে ওঠে

‘ওরা ১০ জন মেয়েকে ধরে এনেছিল ক্যাম্পে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর বাজারের পাকিস্তানি আর্মির ওই ক্যাম্পে ইনচার্জ ছিল নাজির খান নামের এক জুনিয়র অফিসার।

প্রায় ৫০ জন সেনার অবস্থান ছিল সেখানে। তবে আমি তাদের পাত্তা দিতাম না। কারণ, আমি পাঠান এবং আমার চাচাতো ভাই লে. কর্নেল ইশফাক খান তখন পাকিস্তান আর্মির ইন্টেলিজেন্স অফিসার। ক্যাম্পের সবাই আমার পরিচয় জানত। এক রাতে নাজির খান খবর পাঠিয়ে আমাকে ক্যাম্পে যেতে বলে। সেদিন আমার জন্যই ১০ জনের মধ্যে ৯ নারী বেঁচে গিয়েছিল। ’

কথাগুলো বলছিলেন মমতাজ খান (৭০)। তাঁর জন্ম পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী জেলা মর্দানের জেদা গ্রামে। ১৯৭১ সালে তিনি একজন অবাঙালি হয়েও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অংশ নিয়েছিলেন। অর্থসম্পদ ব্যয় করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনে। হানাদার বাহিনীর গোপন তথ্য সংগ্রহ করে পৌঁছে দিতেন ১১ নম্বর সেক্টরে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কাছে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহে নিজ খরচে করাচি পর্যন্ত ছুটতে হয়েছে মমতাজ খানকে। নিজের গাড়িতে করে সেই ওষুধ আবার পৌঁছে দিয়েছেন মুক্তাঞ্চলে। দুইবার ধরাও পড়েন হানাদার বাহিনীর হাতে। চরম নির্যাতনের শিকার হন। সেই ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭২ সালে মততাজ খানকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র  দেওয়া হয়। তাঁর বসবাসের জন্য অস্থায়ী একটি বাসাও বরাদ্দের ব্যবস্থা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মোহাম্মদপুরের কাজী নজরুল ইসলাম রোডের সেই বাসায় এখনো সপরিবারে তাঁর বসবাস। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারের কাছ থেকে মাসে ১৬ হাজার টাকা ভাতা পান। তাঁর কার্ড নম্বর ০২৫৩।

সম্প্রতি কথা হয় মমতাজ খানের সঙ্গে। একজন পাকিস্তানি পাঠান হয়েও কেন সেদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন—এ প্রশ্ন শুনে খানিকটা সময় নিলেন। তারপর দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘আমি তাদের (পাকিস্তানিদের) অন্যায় বরদাশত করতে পারিনি। ব্যবসার জন্য আমাকে তখন প্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল করতে হতো। পথে প্রতিদিন পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার ঘটনা দেখতে হতো। যারা পাকিস্তান থেকে এখানে এসেছিল তাদের কওম ভালো না। হাদিসে আছে, মানুষ অন্যায় করলে হাত দিয়ে জবাব দাও। হাতে না হলে মুখে জবাব দাও, মুখেও জবাব দিতে না পারলে তাকে ঘৃণা করো। এই হাদিস ও আমার ধর্মই সেদিন আমাকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয়। ’ 

কাদের সিদ্দিকী আজও এই অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মমতাজ খান সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, অবাঙালি পাঠান হয়েও মুক্তিযুদ্ধে মমতাজ খান যে ভূমিকা পালন করেছেন তা ভুলবার নয়। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বারবার ঢাকায় এসে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার সরঞ্জাম পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর সহযোগিতা না পেলে চার-পাঁচ শ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচানো সম্ভব হতো না। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় তাঁর লাখ লাখ টাকার ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যায়, পাকিস্তানেও কয়েক কোটি টাকার পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন।   

এখন মমতাজ খানের সম্বল বলতে মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলোই। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর যৌথ বাহিনীর কমান্ডার ভারতীয় জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে সহযোদ্ধাদের নিয়ে তোলা নিজের একটি ফটোগ্রাফ সযত্নে রেখেছেন তিনি। সরকারি ভাতা বাদে তেমন কোনো আয় নেই তাঁর। মোহাম্মদপুরের বাড়িটি স্থায়ীভাবে বরাদ্দের জন্য অনেকের কাছে ধরনা দিয়েছেন; কিন্তু কাজ হয়নি। পাকিস্তানে ফেরার পথও বন্ধ। ১৯৮২ সালে একবার করাচি পর্যন্ত গিয়েছিলেন। তাঁর আপন ভাই পুলিশ সুপার বসির খান তখন করাচিতেই। তিনি মমতাজকে মর্দানে যেতে নিষেধ করেন। জানিয়ে দেন, পাকিস্তান তাঁর জন্য নিরাপদ নয়। এরপর আর জন্মভূমিতে ফেরার চেষ্টা করেননি মমতাজ। মর্দানে তাঁর প্রথম স্ত্রী অনেক আগেই মারা গেছেন। সেখানে প্রথম পক্ষের এক ছেলে রয়েছে, তবে যোগাযোগ নেই। একাত্তরের পর মমতাজ এ দেশে বিয়ে করেন। এই ঘরে তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলেটি বেকার, ছোটটি রোগে ভুগে মারা গেছে। মেয়ে দুটির বিয়ে হয়ে গেছে।

কথা প্রসঙ্গে ফের ফিরলেন সেই ১০ বাঙালি নারীকে ধরে আনার ঘটনায়। বললেন, “মির্জাপুরে তখন আমার পাটের গোডাউন ছিল। সেখানে থাকতে হতো আমাকে। কালিয়াকৈর বাজারের স্কুলসংলগ্ন ক্যাম্পে পৌঁছার পর নাজির আমাকে বলল, ‘আশপাশের এলাকা থেকে ১০ মেয়েকে ধরে আনা হয়েছে। আমাদের ১০ সিপাহি তাদের বিয়ে করতে চায়। ’ আমি জানতে চাই, মেয়েরা কি রাজি? নাজির হ্যাঁ জবাব দেয়। আমার বিশ্বাস হয় না। যে রুমে মেয়েদের রাখা হয়েছিল সেখানে গেলাম। মেয়েদের বললাম, আমি নাজিরের বস, মেজর মমতাজ আমার নাম। আমাকে নির্ভয়ে বলো, তোমরা সিপাহিদের বিয়ে করতে রাজি কি না। আমার কথায় মেয়েদের মধ্যে কান্নার রোল ওঠে। কয়েকজন আমার পা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘আপনি আমাদের ভাই। আমাদের বাঁচান। ’ আমি রুম থেকে বেরিয়ে আসি। পাকিস্তানি পরিচয় ভুলে মানুষ পরিচয়টাই তখন আমার কাছে বড় হয়ে ওঠে। নাজিরকে বললাম, ‘এখনই মেয়েদের ছেড়ে না দিলে আমি আমার ভাইয়ের (লে. কর্নেল ইশফাক খান) সাহায্য নেব। ’ হুমকিতে কাজ হয়। ৯ জনকে ওই রাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়। একটি মেয়ে রহস্যজনক কারণে থেকে যায় এবং এক সিপাহিকে বিয়ে করতে রাজি হয়। হতে পারে এ ছাড়া তার আর উপায় ছিল না। তবে কয়েক দিন পর ঢাকার আগামসি লেনে আমার বাসায় এসে ওই সিপাহি জানায়, মেয়েটি পালিয়ে গেছে। ”

আপনার পাঠান পরিচয় সাধারণ বাঙালিরা কিভাবে গ্রহণ করত—এ প্রশ্ন শুনে মমতাজ খান বলেন, “যাঁরা জানতেন না তাঁরা আমাকে শত্রুপক্ষেরই মনে করতেন। বিজয়ের দুদিন পর আগামসি লেনে আমার বাসা ঘেরাও করে স্থানীয়রা। তাদের সবার হাতে অস্ত্র। শেষ মুহূর্তে কাদের সিদ্দিকীর লোকজন সেখানে পৌঁছায় এবং আমার পরিচয় এলাকার লোকজনকে জানায়। পরে কাদের সিদ্দিকী তাঁর বাসায়ই আমার থাকার ব্যবস্থা করে দেন। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলে তাঁর কাছেও নিয়ে যান আমাকে। সব শুনে বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন, ‘জেলেও পাঠান রক্ষীরা আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেনি। ’ তিনি সেই সময় মোহাম্মদপুরের এই বাসাটি আমাকে বরাদ্দের নির্দেশ দেন। ”


মন্তব্য