kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বনশ্রীতে ভাই-বোনের মৃত্যু

আঘাতের চিহ্ন,হত্যার ইঙ্গিত চিকিৎসকদের

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আঘাতের চিহ্ন,হত্যার ইঙ্গিত চিকিৎসকদের

রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী এলাকায় রহস্যজনকভাবে মারা যাওয়া দুই ভাই-বোনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পেয়েছেন চিকিৎসকরা। গতকাল মঙ্গলবার ময়নাতদন্ত শেষে এ তথ্য জানান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস।

তাঁর ধারণা, এগুলো হত্যার আলামত। আঘাতের কারণেই দুই সহোদরের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে পরিবারের সদস্যরা এখনো দাবি করেছে, একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টের খাবারের বিষক্রিয়া থেকেই দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল পাঁচজনকে হেফাজতে নিয়েছে র‌্যাব-৩। আর সোমবার আটক তিনজনকে গতকাল কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গত সোমবার রাতে ওই দুই শিশু মারা যায়। তারা হলো ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বেইলি রোড শাখার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ইশরাত জাহান অরণী (১৪) ও তার ছোট ভাই হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের নার্সারির ছাত্র আলভী আমান (৬)। পোশাক ব্যবসায়ী বাবা আমান উল্লাহ ও মা মাহফুজা মালেক জেসমিনের সঙ্গে বনশ্রীর সি ব্লকের চার নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসায় থাকত তারা। তাদের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের রায়েরপাড়া গ্রামে। জানাজা শেষে দুই শিশুর লাশ গতকাল জামালপুর পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ডা. প্রদীপ বিশ্বাস গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, আলভীর পায়ে ও গলায় আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। অরণীর চোখে জমাট রক্ত এবং গলায় ও ডান হাতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ আঘাতের কারণেই তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। ঢাকা মেডিক্যালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেন, দুই শিশুর জিহ্বা দাঁত দিয়ে কামড় দেওয়া অবস্থায় ছিল। সাধারণত খাদ্যে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হলে এ রকম আলামত দেখা যায় না। তাদের ভিসেরা সংগ্রহ করে মহাখালীতে পাঠানো হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর সঠিক রহস্য জানা যাবে।

দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরিবারের অভিযোগ ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ধরেই তদন্ত চলছে। গতকাল ওই বাসায় গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেছেন পুলিশ, র‌্যাব ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তরা।

গতকাল দুপুরে ওই বাসা থেকে বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী পিন্টু মিয়া ও ফেরদৌস, দুই শিশুর চাচা ওবায়দুর, আরেক আত্মীয় শাহীন, গৃহশিক্ষিকা শিউলি আক্তারসহ পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব-৩-এর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

র‌্যাব-৩-এর পরিচালক গোলাম সরোয়ার বলেন, শিশু দুটিকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি তারা চায়নিজ খেয়ে বিষক্রিয়ায় মারা গেছে তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। তদন্তের স্বার্থে কয়েকজনের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। হাসপাতাল ও পরিবারের অভিযোগ ধরে তদন্ত চলছে।

রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, বনশ্রীর একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টের খাবার খেয়েই দুই শিশু মারা গেছে বলে সোমবার রাতে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। তবে ময়নাতদন্তে দুই শিশুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। অন্য কারণও থাকতে পারে। তদন্ত চলছে। পরিবারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার রাতেই বনশ্রীর ডি ব্লকের কেন্ট চায়নিজ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মাসুদুর রহমান, ওয়েটার রনি মিয়া ও আতোয়ার হোসেনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গতকাল তাদের আদালতে পাঠায় পুলিশ। আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।  

বনশ্রীর ওই বাসার পাঁচ তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকত অরণী ও আলভী। গতকাল দুপুরে ফ্ল্যাটে গেলে ওই শিশুদের গৃহশিক্ষক শিউলি আক্তার দাবি করেন, তিনি এক মাস ধরে অরণীকে প্রাইভেট পড়ান। সোমবার বিকেল ৩টার দিকে পড়াতে এসেছিলেন। ৪টা পর্যন্ত পড়ান। আলভীও কাছেই বসে ছিল। সে সময় বাসায় অরণীর মা ছাড়াও আরো দুই মহিলা ছিলেন। তিনি (শিউলি) বাসা থেকে বের হওয়ার সময় অরণীর মা ঘুমাচ্ছিলেন। তাঁকে বিদায় দিয়ে অরণী দরজা লাগিয়ে দেয়। আজ (মঙ্গলবার) ফের পড়াতে এসে তিনি মৃত্যুর খবর পান।

তবে শিউলি আক্তারের দাবির সঙ্গে পরিবারের দাবি মিলছে না। পারিবারিক সূত্র জানায়, বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে গত রবিবার অরণীর মা-বাবা দুই সন্তানসহ স্বজনদের নিয়ে কেন্ট চায়নিজ রেস্টুরেন্টে খেতে যান। খাওয়ার পর দুই সন্তানের আবদার রক্ষা করতে কিছু খাবার প্যাকেট করে বাসায় নিয়ে আসেন তাঁরা। সোমবার দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে মায়ের কাছে সেই খাবার চায় দুই ভাই-বোন। খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে তারা। অনেক চেষ্টার পরও ঘুম ভাঙাতে না পারায় স্বজনরা তাদের প্রথমে বনশ্রীর আলরাজি ইসলামিয়া হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে পরে তাদের ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাত ৮টার দিকে চিকিৎসকরা দুই সহোদরকে মৃত ঘোষণা করেন।

দুই শিশুকে আলরাজি ইসলামিয়া হাসপাতালে নেওয়ার পর সে সময় সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক ছিলেন ডা. আবদুল্লাহ আল মারুফ। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, দুই শিশুকে হাসপাতালে আনার পরপরই পরীক্ষা করে তাদের মৃত মনে হয়েছে। দুই শিশুর মুখেই রক্ত ছিল।

রামপুরা থানার পুলিশ জানায়, পরিবারের সদস্যরা একটু স্বাভাবিক হলে বিষয়টি সম্পর্কে আরো ভালো করে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কী কারণে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে তা জানতে তদন্ত চলছে।

আমাদের জামালপুর প্রতিনিধি জানান, ইসলামপুর ছাড়াও জামালপুর সদরের ইকবালপুরেও আমান উল্লাহর বাড়ি রয়েছে। সেই সূত্রে অরণী ও আলভীর লাশ গতকাল জামালপুর পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আচমকা দুই সন্তানের মৃত্যুতে মা মাহফুজা মালেক ও বাবা আমান উল্লাহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আমান উল্লাহ গতকাল জামালপুরে জানান, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য সূত্রে তিনি জেনেছেন, তাঁর দুই সন্তানকে শ্বাস রোধে হত্যা করা হয়েছে। তবে কারা, কী কারণে তাঁর সন্তানদের হত্যা করতে পারে—এ বিষয়ে তিনি কিছু ধারণা করতে পারছেন না। কারো সঙ্গে তাঁর কোনো শত্রুতা ছিল না।


মন্তব্য